পথশিশুর ঠিকনা কি পথেই থেকে যাবে?

newsgarden24.com    ১২:১৭ পিএম, ২০১৯-১১-১৫    163


পথশিশুর ঠিকনা কি পথেই থেকে যাবে?

আজহার মাহমুদ, ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ইংরেজী, শুক্রবার: শিশু, শব্দটাই এক ধরনের ভালোবাসার। যার সাথে মিশে থাকে ভালোবাসা, আদর এবং মমতা। কিন্তু শিশুদের যখন পথশিশু, টোকাই, রাস্তার ছেলে ইত্যাদি নামে ডাকা হয় তখন আপনাদের কেমন লাগে জানি না, আমার বুকে লাগে। কেন একটা শিশুকে পথশিশু বলবো? সে রাস্তায় থাকে এজন্য? তাহলে আবার প্রশ্ন করছি, কেন একটা শিশু রাস্তায় থাকবে? জানি এর কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাবো না। এরপরও আমাদের দেশে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আসলে এর মূলে রয়েছে অজ্ঞতা, দারিদ্রতা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব। আমাদের দেশে

একশ্রেণীর অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষ অপরিকল্পিতভাবে সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর তাদেরকে পরিত্যাগ করে। এসব পিতামাতা অন্য কাউকে বিয়ে করে নতুন করে সংসার শুরু করে। এভাবেই বাড়তে থাকে অবহেলিত পথশিশুর সংখ্যা। এসব পিতামাতা সন্তানদের মারধর করে রোজগার করার জন্য। তখন থেকেই শুরু হয় তাদের অবহেলিত কষ্টের জীবন।
আসলে মানুষের মানবতা এবং মনুষ্যত্ব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার ফলাফলে পথশিশুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বিবেক কখনও কি নাড়া দেয় না? আজ যে ছোট ছোট বাচ্চার রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করে, ফুল বিক্রি করে কিংবা কিছু খাবে বলে টাকা চায় তাদের ভবিষ্যত কি! যে বয়সে তাদের হাতে থাকা উচিৎ বই-খাতা আজ তাদের হাতে প্লাস্টিকের বস্তা। রাস্তায় রাস্তায় তারা প্লাস্টিক খুঁজে। কি নির্মম বেদনাময় দৃশ্য।
২০১৫ সালের হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ছিলো ১০ লাখ। যার মধ্যে আড়াই লাখের বেশিই ছিলো রাজধানীতে। বর্তমানে বাংলাদেশে পথ শিশুর সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ আমি পাইনি। কেউ বলেন ২১ লাখ। আবার কেউ বলেন ২৪ লাখ। তবে এদের মধ্যে ৫০ হাজার শিশু আক্ষরিক অর্থেই রাস্তায় থাকে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পথশিশুদের ৫১ ভাগ ‘অশ্লীল কথার শিকার' হয়। শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ২০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয় মেয়েশিশু। ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। আর মেয়ে পথশিশুদের মধ্যে ৪৬ ভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার।
পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করছে লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (লিডো) নামের একটি এনজিও। সংস্থাটির তথ্যমতে, পথশিশুদের কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে রাস্তায়ই মারা যায়। কেউ কেউ বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে যায়। যারা পাচারের শিকার হয়, তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি হয়। নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় তারা। যারা মেয়ে, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। কোনো কোনো গ্যাং তাদের যৌনকর্মী হতে বাধ্য করে। এছাড়াও, অপরাধীচক্রগুলো এদের মাদকসহ নানা অবৈধ ব্যবসায় কাজে লাগায়। এরা আসলে অপরাধী নয়। এরা অপরাধের শিকার হয়। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নানা কাজে ব্যবহার করে।
সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপ) নামের একটি সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থ হলে ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না।
একই গবেষণায় বলা হয়, ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশ শিশু স্থান পরিবর্তন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারণে আর ৩৩ শতাংশ পাহারাদারের কারণে। খোলা আকাশের নীচে ঘুমানোর পরও তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ শিশুকে মাসিক ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মাস্তানদের দিতে হয়। তারা পুলিশি নির্যাতন এবং গ্রেপ্তারেরও শিকার হয়। জানা যায়, পথশিশুদের বড় একটি অংশ আসে দরিদ্র পরিবার থেকে। দারিদ্র্যই মূল কারণ।  বাবা-মায়ের বহু বিবাহও একটি কারণ। তার সাথে যুক্ত হয় নদী ভাঙন, ভূমিহীনতা, জলবায়ুর পরিবর্তন।
আমরা যদি একটু সুস্থ মস্তিষ্কে ভেবে দেখি, আসলে এই পথশিশুদের জীবন যাপন অনেক জটিল। নিজেদের চেয়ে অনেক বেশি বয়সের লোকজনের সাথে থাকতে হয় এদের। ভিক্ষাবৃত্তিও করতে হয়। আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ থেকে তারা নানা জিনিস সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য। তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। পথশিশুদের ২৫-৩০ ভাগ মেয়ে। তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পথশিশুদের ৮২ শতাংশই নানা ধরনের পেটের অসুখে আক্রান্ত। এই অসুখের পেছনে যে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি নোংরা পরিবেশে থাকার কারণে এদের মধ্যে চর্মরোগের হারও অনেক বেশি, চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় । ভাসমান এই শিশুদের ৬১ শতাংশই কোনো না কোনো চর্মরোগে আক্রান্ত। পথশিশুদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার হারও তুলনামূলক বেশি।
ঢাকাসহ সারাদেশে পথশিশুদের নিয়ে অনেক বেসরকারি সংগঠন কাজ করে। কেউ খাবার দেয়। কেউ পোশাক দেয়। কেউ দেয় শিক্ষা। কেউ আবার তাদের বিনোদনের ব্যবস্থাও করে। তবে দিনশেষে তাদের পথেই ফিরে যেতে হয়। তাদের পুরোপুরি পুনর্বাসনের জন্য খুব বেশি উদ্যোগ নেই। শহরে অনেক কেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ আছে এই পথশিশুদের জন্য। সরকারি কিছু উদ্যোগও আছে। কিন্তু এর কোনো উদ্যোগই টেকসই নয়। এটা ঘায়ে মলম দেয়ার মতো। আসলে তাদের দরকার স্থায়ী পুনর্বাসন। ফ্যামিলি অ্যাটাচমেন্ট। সেটা কিভাবে করা যায় তা সরকারকে ভাবতে হবে। তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনাই হলো আসল কাজ। তাদের শিক্ষা, থাকার স্থায়ী জায়গা এবং খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যদি যেখানে আছে, সেখানেই থাকে, তাহলে কোনো লাভ নেই। কারণ পথ থেকে তাদের ঘরে তুলতে হবে। তারা এখন পথকেই তাদের ঘর বানিয়ে ফেলছে। কিন্তু আমাদের যে বিষয়টি সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, সেটা হচ্ছে থাকার ব্যবস্থা। এসব বাচ্চারা যদি কোনো গাইড লাইনের ভেতর দিয়ে না যায় তবে তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত অন্ধকারে। এখন দেখাযায় পরিবারের সাথে থেকেও ছেলে-মেয়েরা বিপথে চলে যায়। সেখানে রাস্তায় থাকা এসব ছেলে-মেয়েদের বিপথে নিয়ে যাওয়া কোনো ব্যপার বলে আমার মনে হয় না। তাই তাদের সরকারের সহয়তায় হোক আর বেসরকারি সহয়তায় হোক থাকা-খাওয়া এবং পড়াশুনার মাধ্যমে অন্যান্য বাচ্চাদের মতো জীবন-যাপন করার সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই পথশিশু নামক কোনো নাম শিশুর সাথে যুক্ত হবে না। দেশ থেকে মুছে যাবে টোকাই নামক শব্দটি। শিশু থাকবে শিশুর মতোই।  কিন্তু পথশিশুর ঠিকানা যদি পথই রয়ে যায় তবে এসব শিশুদের জন্য লোক দেখানো ভালোবাসায় কিছুই হবে না। আপনি একশটা শিশুকে লোক দেখানো সেবা না দিয়ে একটা শিশুর দায়িত্ব নিন। যেন সেই শিশুটা বড় হয়ে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উঠে। এভাবে প্রতিটা সংগঠন যদি পথশিশুদের সাময়িক সেবা এবং খাবার না দিয়ে তাদের পুরো দায়িত্ব নেয়, তাহলে অন্তত কিছু শিশু হলেও দেশের সম্পদ হিসেবে রুপান্তরিত হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আমরা চাইলেই সব পারি। কিন্তু আমরা সেভাবে চিন্তা করি না। আমরা জন্মদিনে পথশিশুদের সাথে সময় কাটিয়ে মানুষকে ফেসবুকে দেখাই। কিন্তু কয়েকটা পথশিশুকে শিশুতে রুপাস্তর করি না। চাইলেই কিন্ত পারি। তাই আসুন লোক দেখানো ভালোবাসা ছেড়ে এসব শিশুদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবুন। তবেই এসব শিশুরা টোকাই না হয়ে মন্ত্রী এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে। লেখক: প্রাবন্ধিক এবং কলাম লেখক।

 

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল


রিটেলেড নিউজ

শিকলবাহায় আঁধারভরা দুর্যোগে মানবিক ডাঃ ফারহানা মমতাজ

শিকলবাহায় আঁধারভরা দুর্যোগে মানবিক ডাঃ ফারহানা মমতাজ

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: করোনার কারণে এক অভাবিত বিপর্যয়ের সম্মুখীন বিশ্ব। করোনা এমন অদৃশ্য এক শত্রু হয়... বিস্তারিত

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের রোগমুক্তি কামনায় হাটহাজারী ছাত্রলীগ নেতার দোয়া মাহফিল

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের রোগমুক্তি কামনায় হাটহাজারী ছাত্রলীগ নেতার দোয়া মাহফিল

newsgarden24.com

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চ... বিস্তারিত

 চসিক আইসোলেশন সেন্টার থেকে করোনামুক্ত হয়ে প্রথমবারের বাড়ী ফিরলেন ৫ জন

চসিক আইসোলেশন সেন্টার থেকে করোনামুক্ত হয়ে প্রথমবারের বাড়ী ফিরলেন ৫ জন

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সিটি কনভেনশন হল ... বিস্তারিত

চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হত্যার মূল আসামী গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হত্যার মূল আসামী গ্রেপ্তার

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানাধীন পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও ডবলমু... বিস্তারিত

করোনা নমুনা পরীক্ষার ফি বাতিল করে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করুন: আবুল হাশেম বক্কর

করোনা নমুনা পরীক্ষার ফি বাতিল করে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করুন: আবুল হাশেম বক্কর

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: করোনা সংক্রমণ একটি বৈশ্বিক মহামারি। এ মহামারীতে মানুষ এখন দিশেহারা, কর্মহীন হ... বিস্তারিত

ঠিক সময়ে কাজ শেষ না হলে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে: মেয়র

ঠিক সময়ে কাজ শেষ না হলে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে: মেয়র

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ... বিস্তারিত

সর্বশেষ

শিকলবাহায় আঁধারভরা দুর্যোগে মানবিক ডাঃ ফারহানা মমতাজ

শিকলবাহায় আঁধারভরা দুর্যোগে মানবিক ডাঃ ফারহানা মমতাজ

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: করোনার কারণে এক অভাবিত বিপর্যয়ের সম্মুখীন বিশ্ব। করোনা এমন অদৃশ্য এক শত্রু হয়... বিস্তারিত

আল্লামা আবদুল হাই নদভী সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত

আল্লামা আবদুল হাই নদভী সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক শরীয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: বায়তুশ শরফের পীর সাহেব আল্লামা মোহাম্মদ আবদুল হাই নদভী সোস্যাল ইসলামি ব্যাংক ... বিস্তারিত

গাউসিয়া কমিটিকে করোনায় মৃতদের কাফন-দাফনের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়াল রেড ক্রিসেন্ট

গাউসিয়া কমিটিকে করোনায় মৃতদের কাফন-দাফনের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়াল রেড ক্রিসেন্ট

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: মহামারী করোনাকালে রোগীসেবা ও মৃতদেহ কাফন-দাফনে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন... বিস্তারিত

অধিকমূল্যে পণ্য বিক্রি, ২৩ হাজার টাকা অর্থদন্ড

অধিকমূল্যে পণ্য বিক্রি, ২৩ হাজার টাকা অর্থদন্ড

newsgarden24.com

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: চট্টগ্রাম মহানগরীর কাজীর দেউড়ি বাজারে আজ সকাল ১০ টায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযা... বিস্তারিত