৮৮ বছরে চট্টগ্রামের কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা

কামরুল হুদা, ১১ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার: চট্টগ্রামের কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সমাজের অসহায় ও পিতৃ-মাতৃহীন শিশু-কিশোরদের আশ্রয়, ভরণ-পোষণ ও শিক্ষা-দীক্ষাসহ যাবতীয় গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালন করে আসছে। জানা যায়, বাল্যকাল থেকেই আভিজাত্যের প্রাচীর ডিঙিয়ে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশতেন। পিতা মুন্সি মোঃ মতিউল্লাহ’র মৃত্যুর পর এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
সমাজের নিঃস্ব, বিপন্ন, অসহায়, সহায়-সম্বলহীন এতিম বালকদের যাবতীয় ভরণ-পোষণের মাধ্যমে যুগোপোযোগী শিক্ষা-দীক্ষায় শিক্ষিত করে আদর্শ নাগরিকরূপে গড়ে তুলছে। তা ছাড়া নির্ধারিত বয়সসীমা পর্যন্ত শুধু ছেলেমেয়েদের ভরণ-পোষণ ও শিক্ষা দিয়েই ছেড়ে দেয়া হয় না। বরং তাদের পুনর্বাসনে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়ে থাকে। সমাজের বিত্তশালী ও সহৃদয়বান ব্যক্তিদের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি এতিমদের ভরণ-পোষণ ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানায় প্রাইমারী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত অনাথ ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে। রয়েছে নাজেরা বিভাগ, হিফজুল কুরআন, এবতেদায়ী, ফোরকানিয়া মাদরাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, দাখিল হতে আলিম পর্যন্ত আরবী শিক্ষা, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধা। ফ্রান্সের এনজিও সলিনফো এতিমখানায় ৬ টি কম্পিউটার আইটি সহায়তার জন্য প্রদান করেন। এ সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ করে এখানকার শিক্ষার্থীরা এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কর্মরত আছেন। যে কেউ এতিম শিশুদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক, দু:স্থ, অসহায়, ছিন্নমূল, এতিমদের নয়নমনি, মরহুম মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী অসহায় এতিমদের সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মানসে ও ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে পাক ভারত উপমহাদেশে মুসলিমদের ক্রান্তিলগ্নে প্রতিষ্ঠা করেন কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা। এটিই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এতিমখানা। গড়ে উঠেছে কদম মোবারক উচ্চ বিদ্যালয় ও ইসলামাবাদী স্মৃতি মিলনায়তন। স্কুলের শিক্ষক আছেন ৩০ জন, হল দেখভালে রয়েছে ২০ জন হল সুপার।
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী মৃত্যুর পর এতিমখানাটি অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। তখন চট্টগ্রামের অনেকেই আর্থিক সহযোগিতা করেন। অদ্যাবধি এ এডহক কমিটির পরিচালনায় এতিমখানা এগিয়ে যাচ্ছে। মোমিন রোডে অবস্থিত এতিমখানার মোট ভূমি ১ একর। সমাজকল্যাণ থেকে সামান্য অনুদান পেয়ে থাকে এতিমখানাটি। বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক এতিমখানাটি দেখভাল করছেন। কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানাটিই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এতিমখানা।
দ্বীনের প্রচার, মানবসেবা ও এতিমদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করাই এতিমখানারটির মূখ্য উদ্দেশ্য। কালের বিবর্তনে ও ঘটনাবহুল বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নানা রকম সমস্যা সংকটের মধ্যেও বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠান ৫০০ জন এতিম নিবাসীর ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে চলেছে। ৫০০ জন এতিম থাকলেও সরকারী অনুদান পেয়ে থাকে ১৩৪ জনের জন্য। আপমর জনসাধারণ ও দানশীল ব্যক্তিবর্গ অকুণ্ঠ চিত্তে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। বর্তমান পরিচালনা কমিটি অত্র প্রতিষ্ঠানকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর, স্বনির্ভরশীল করার মানসে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আপনাদের দান অনুদানে লালিত হাজার হাজার এতিম সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এ এতিমখানা থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, উকিল, ব্যারিষ্টার, শিক্ষাবিদ, হাফেজ, ব্যবসায়ী, সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমিচীন। তারা আজ দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বেশ কয়েকজন বিসিএস ক্যাডার সরকারের উচ্চমহলে কাজ করছেন। এতিমখানার বেশ কিছু ছাত্র ডাক্তারী ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা করছে। তারাও ভবিষ্যতে জাতি গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন এতিমখানার ব্যবস্থাপনা কমিটি।
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সুযোগ্য নাতী গাজী ইসলামাবাদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সহায়তায় বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সুযোগ্য মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের বলিষ্ঠ পরিচালনায় ও তত্ত্বাবধানে এতিমখানা উন্নয়নে অভূতপূর্ব একটি উল্লেখ্যযোগ্য অবস্থান সৃষ্টি করে। এতিমখানা এখন তার নিজস্ব স্বকীয়তা ফিরে পায়। পুরনো ভবনের সংস্কার ও পুন:নির্মাণ করা হয়। নতুনভাবে এতিমখানার জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এতিমখানা এখন আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং এতিমদের ভরণ পোষণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বর্তমান কমিটির সুযোগ্য পরিচালনায় এগিয়ে চলছে কদম মোবারক এতিমখানা। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

%d bloggers like this: