বেরিয়ে এল চীনের অন্ধকার জগত!

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৯ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার: চীনের গর্ব ছিলেন আন্তর্জাতিক পুলিশ ইন্টারপোলের প্রধান মেং হোংউই। এক বছর আগেই তার সামনে গর্ব করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইন্টারপোলকে বলেছিলেন, ‘বিশ্বে আইন প্রয়োগে চীন অগ্রগামী ভূমিকা পালন করবে। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর মধ্যেই আছে চীন। এদেশ আন্তর্জাতিক আইনও মেনে চলে।’ ইন্টারপোলের সাধারণ সভায় অন্তত ১ হাজার উপস্থিত প্রতিনিধির সামনে কথাগুলো বলেছিলেন শি। এরপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।
মেং উধাও রহস্য : চীনের গর্ব মেং এর সদ্য পতন হয়েছে এক রহস্যের ঘেরাটোপে। তাও আবার সেই চীনেই, যেখানে আইনি ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে রাজনীতি। নিন্দুকেরা ইন্টারপোলে মেং এর নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে সমালোচনা করছেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়াসহ অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ করেছে চীন। গত ২৫ সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সে ইন্টারপোলের সদরদপ্তর লিওঁ থেকে চীনে যাওয়ার পর মেং নিখোঁজ হন। পরে এ নিখোঁজ সংবাদ জানান তার স্ত্রী। মেং এর কোনো অপকর্ম ছিল কিনা কিংবা ২০১৬ সালে তিনি ইন্টারপোলের প্রধান নির্বাচিত হওয়ার আগে পরে কিছু করেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে চীন কখনো কিছু জানায়নি। তবে যাই ঘটুক, মেং এর মত একজন গুরুত্বপূর্ণ কেউ উধাও হওয়া ভয়াবহ ব্যাপার। কারণ, এতে তার মত চীনা কর্মকর্তারাদের পাশাপাশি যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের মতো কর্মকর্তাদের নেতৃস্থানীয় পদে নিয়োগ করে তাদেরকেও অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনা নেতৃত্বে ধাক্কা : প্রেসিডেন্ট শি চীনের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দাবি করলেও আদতে দেশটি যে সেই নিয়ম-নীতি মেনে কাজ করার ধার ধারছে না মেং এর ঘটনাটিই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চীনের নেতৃত্ব প্রমাণের চেষ্টাও এতে ধাক্কা খেয়েছে। ধাপে ধাপে উপরে উঠে যে নেতৃত্বকে এগিয়ে নিয়েছিলেন মেং। বিশ্বে চীনের পুলিশি ব্যবস্থাকে যিনি দাঁড় করিয়েছিলেন একটা সম্মানজনক অবস্থায়।
মেং উধাওয়ের ঘটনায় চীন একেবারেই নিশ্চুপ ছিল। ইন্টারপোল তার সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পরও চীন কিছু বলেনি এমনকি তার নিখোঁজ সংবাদে উদ্বেগ জানিয়ে সরকারি বিবৃতিও দেয়নি, যেটা করা উচিত ছিল। কয়েকদিনের নীরবতার পর চীন তাদের হাতে মেং আটক থাকার কথা স্বীকার করে।
অস্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা: বিশ্লেষকরা বলছেন, মেং কে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় পদে বসানো একজনের পতন ঘটাল কেন শি সরকার? তার বিরুদ্ধে স্বচ্ছভাবেই আইনি পন্থা নেওয়া সম্ভব ছিল। যেমনটি ঘটেছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডোমিনিক স্ট্রস কানের ক্ষেত্রে।
এক হোটেল পরিচারিকার যৌন হয়রানির মামলায় পড়ে তার পতন ঘটে। কানকে প্রকাশ্যেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু চীনের বিচার এ ব্যবস্থায় তা নেই, বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে তো নয়ই। ন্যায়ের পথে চলার কথা বলে চীন কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন করছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে মেং কে যেভাবে আটকে রাখা হয়েছে সেটি তাকে দোষী সাব্যস্ত করারই সামিল বলে মত বিশ্লেষকদের।
রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: মেং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে চীনের ক্ষমতাধর নতুন দুর্নীতিদমন কমিশন। এ কমিশন ছপিয়ে গেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কমিটিকেও। তারা বেছে বেছে রাজনৈতিক দুর্নীতিরই মামলা করছে বেশি। এর মধ্য দিয়ে তারা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাছাড়া, চীনে সরকার বিরোধী ও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে দুর্নীতিদমন অভিযানকে কাজে লাগানো হয় বলেও অভিযোগ করেন অনেকেই। মেং ইন্টারপোলের প্রধান হিসাবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় চীনের অবদানে সহায়ক ভূমিকা পালন করা ছাড়াও ‘অপারেশন ফক্স হান্ট’ এ নিয়োজিত ছিলেন। এ অভিযানে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বহু চীনা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলে। যারা দুর্নীতিতে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়।
মেং এর পতনের পর আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থায় চীন তাদের প্রতিশ্রুত ভূমিকাই পালন করে যাবে বলে জানিয়েছে। সেইসঙ্গে মেং এর এ পরিণতির জন্য চীন তাকেই দায়ী করে বলেছে, তিনি যে পথে চলেছেন তেমনই ফল ভোগ করেছেন।
অনিরাপত্তা: ক্ষমতা সুসংহত করা এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে প্রেসিডেন্ট শি’র শুরু করা কঠোর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে কর্মকর্তারা এমনকি আন্তর্জাতিক সংগঠনের উচ্চ পর্যায়ের কর্তারাও যে নিরাপদ নন- মেং এর ঘটনাটি সে দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছে। ইন্টারপোলে মেং এর নিয়োগে যেমন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এর সম্মতি ছিল ঠিক তেমনি তাকে আটকের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই সায় দিয়েছেন শি। নিখোঁজ হওয়ার আগে মেং তার স্ত্রী গ্রেস এর কাছে ছুরির ছবি দিয়ে একটি টেক্সট করেছিলেন। এটি বিপদে পড়ারই প্রতীক, তিনি বিপদের কথা জানানোর চেষ্টা করেছিলেন, বলছেন গ্রেস। তিনি জানান, এ ছবিটি পাঠানোর ৪ মিনিট আগে মেং তাকে মেসেজ দিয়ে বলেছিলেন, “আমার ফোনের অপেক্ষায় থেকো।” কিন্তু সে ফোন আর আসেনি। গ্রেসের এ কথার পরপরই ফরাসি পুলিশ মেং এর খোঁজ শুরু করে। ইন্টারপোলও চীনের কাছে তার সম্পর্কে তথ্য চায়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: