অঢেল সম্পদের মালিক কে এই রশীদ খুলু!

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শনিবার: দিনমজুর থেকে দিনে দিনে পাহাড় সমান অর্থ ও সম্পত্তির মালিক বনে যান রশীদ খুলু। দিন যত গড়িয়েছে ব্যবসার পরিধি ও সম্পদ তত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় তার নিজস্ব এজেন্ট আছে। তাদের মাধ্যমেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে ইয়াবা সরবরাহ হয়। ইয়াবা বিক্রি করে দেশের যুব ও তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো, আর তারা হলো শত থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক। যার একটি অংশ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। মাসোহারা দিয়ে নিরাপদ জীবনযাপন ও ইয়াবার ব্যবসা চলছে রমরমা। ফলে ২০১২ সালে একবার গ্রেপ্তার হলেও এরপর থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রশীদ খুলু ও তার পরিবার। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এর নামে শত কোটি টাকার জায়গা-সম্পত্তি আছে। বিলাশ বহুল সম্পত্তি সবার দৃষ্টিগোচর হলেও দুদক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলো যেন কিছুই দেখছেন না! জন্মসূত্রে মায়ানমার নাগরিক হলেও কোন এক সময় সীমান্ত পার হয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়নের বাজার পাড়া এলাকায় বসবাস শুরু করেন এই আব্দুর রশীদ ওরফে রশীদ খুলু। প্রথমে টেকনাফের ফসলি জমিতে ও পরে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এলাকায় দিন মজুর হিসেবেও কাজ করেছেন। কিন্তু হালে বদলে যায় এই চিত্র ! হঠাৎ তার আত্মপ্রকাশ ঘটে ইয়াবা গডফাদার হিসেবে। বলা হয় ইয়াবার রাজা এই রশীদ খুলু। ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশ থেকে মায়ানমারে সার পাঁচার চক্রের হোতা ছিল এই রশীদ খুলু। বাংলাদেশে ২০০০ সালের পর প্রথম ইয়াবা ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। সাথে টেকনাফের আরো অনেকে ছিল। ২০০৬ সালের দিকে ঢাকায় মাদকের একটি চালান আটকের পর ইয়াবা নামক এই মাদক সম্পর্কে অবগত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চট্টগ্রামকে ট্রানজিট করে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

?????????????????????????????????????????????????????????

২০১২ সালে দেশের সর্বপ্রথম ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালান নিয়ে গ্রেপ্তার হন রশীদ খুলু। সেসময় টনকনাড়া দিয়ে উঠেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। ভাবিয়ে তুলে সরকারকে। র‌্যাব-১ ঢাকা এবং র‌্যাব-৭ চট্টগ্রাম এর দু’টি দল যৌথভাবে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন আসাদগঞ্জের জনৈক মালেক চেয়ারম্যানের গুদামে মাল আনলোড করার সময় ২,৭০,০০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ইয়াবা চালানের মূল হোতা রশীদ আহমেদ খুলু (৫০), পিতা-মৃত হাজী আলী আহমদসহ এ ঘটনায় র‌্যাব ৫ জনকে আসামী করে কোতোয়ালী থানায় ১৮ মে শুক্রবার মামলা দায়ের করে। তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত হন এই রশীদ-ই বাংলাদেশে ইয়াবার জনক। কিন্তু চাঞ্চল্যকর এই মামলায় মাত্র দুই মাসের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসে রশীদ খুলু ও তার অন্যান্য সহযোগীরা। এরপর থেকে রশীদ খুলু ধরাছোঁয়ার বাইরে। আরো বড় আকারে গড়ে তুলে দেশব্যাপী ইয়াবার নেটওয়ার্ক। এদিকে, ২০১৫ সালের ২৬ আগস্ট রশীদ খুলু’র সিণ্ডিকেটের চট্টগ্রাম প্রধান জাহিদুল ইসলাম ওরফে আলো নগরীর হালিশহর এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে ২০ হাজার পিস ইয়াবা, একটি পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। আলো’র মৃত্যুর পর তার ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব অ্যাকাউন্টে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢুকেছে ১১১ কোটি টাকা। রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা থেকে এসব ব্যাংক হিসাবে শুধুই টাকা ঢুকেছে, কিন্তু কখনো উত্তোলন করা হয়নি। তাহলে অনুমান করা যায় এই সিণ্ডিকেট কত হাজার কোটি টাকার মালিক!আলো মারা যাবার আগে ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর হালিশহর এলাকায় আলোর বাসায় অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা ও ইয়াবা বিক্রির ১৯ লাখ টাকাসহ আলোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন সে জামিনে বেরিয়ে যায় অল্প দিনে। এর কিছুদিন পরই ইয়াবার চালান খালাসের সময় র‌্যাবের সাথে বন্ধুক যুদ্ধে নিহত হয় আলো। চট্টগ্রামের হালিশহর থানাধীন কর্ণফুলী আবাসিক এলাকার ৩নং সড়কের ৩৬ নম্বর বাড়ীটি রশীদ খুলুর। পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস করেন। বাড়ীটি তার স্ত্রীর নামে। হালিশহর শ্যামলী আবাসিক এলাকায় ‘একতা বিল্ডিং’ এর পাশে আরো একটি বিলাশ বহুল ভবন আছে তার। এই বাড়ীটি তার পুত্র ফয়সাল রশীদের নামে। ২০১৫ সালে আলো ক্রসফায়ারে মারা যাবার পর চট্টগ্রামের সব অফিস বন্ধ করে ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও অফিস গড়ে তুলেন রশীদ খুলু। আর.এফ.এফ ব্রাদার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর শহরের সিটি ব্যাংক টাওয়ারের ৩৭ তলায় অফিস খুলে বসেন তিনি। এরপর থেকে ইয়াবার বড় লেনদেন গুলো হয় সেখানে বসেই। পিতার পাশাপাশি পুত্র ফয়সাল রশীদ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো সিণ্ডিকেট। ফয়সাল চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার তিনটি মামলার এজাহার নামীয় আসামী। চলতি মাসে নগরীর বায়েজিদ থানার আরো একটি মামলায় তাকে আসামী করা হয়েছে। বলা হয় পিতাপুত্র অনেক উপরতলার লোক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা সরকারের হাত সেই পর্যন্ত পৌঁছাবে কিনা তা অনিশ্চিত। বিগত রমজান মাসে মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হলে পিতা ও পুত্র বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোন দেশে যাওয়ার জন্য তাদের পাসপোর্ট-এ ভিসা লাগানো থাকে সবসময়। পরিস্থিতি খারাপ দেখলেই বিদেশে চলে যান দিনে দিনে। বিমান বন্দরে তাদের বিদেশ যাওয়া নিয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ হতে। ফলে তারা নিরাপদেই আসা যাওয়া করছে দেশ-বিদেশে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক চলমান বিশেষ অভিযান নিষ্ক্রিয় হয়ে ওঠায় রশীদ খুলু ও তার পুত্র দেশে ফিরে এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকায় শীর্ষে পর্যায়ে নাম আছে রশীদ খুলু (৫০) ও তার পুত্র ফয়সাল রশীদের (৩৩)। তালিকায় রশীদ খুলুকে বিপদজনক ইয়াবা কারবারি উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১২ সালে ইয়াবার সর্ববৃহৎ চালান নিয়ে প্রথম গ্রেপ্তার হলেও সেই থেকে আজ পর্যন্ত অধরা রশীদ খুলু। প্রকাশ্যে দিবালোকে চট্টগ্রাম শহরে ঘুরে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত তাদের পর্যন্ত যায় না রহস্যজনক কারণে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: