চকবাজার এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২২ জুলাই ২০১৮, রবিবার: চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার অপরাধের স্বর্গরাজ্য। এই এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হয় মাদক। মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, জুয়া খেলা, পতিতাবৃত্তি থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ কর্মকান্ড এখানে অবাধে পরিচালিত হয়। ফেনসিডীলকে পিছনে ঠেলে বাংলাদেশের নেশার জগতে এক ভয়াবহ উন্মাদনা এনেছে অনাগ্রা ও ইয়াবা। মাদক সেবনের মূল ভূমিকায় সচ্ছল ঘরের শিক্ষার্থী, তরুণ, যুবা ও মধ্যবয়সী। মোবাইল ফোন ভিত্তিক সুলভ বাজারজাতকরণ, হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা, নারী ও শিশু শ্রম কেন্দ্রিক বিতরণ ব্যবস্থায় ইয়াবার আগ্রাসন দেশের শহর ও গ্রামের সর্বত্র। ছিনতাইও যেন নিত্য ঘটনা। জুয়ার আসরসহ চলে নানা অপরাধ। অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের কিছু সদস্যের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ এলাকায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে অপরাধী চক্রগুলো। তাই স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করলেও কার্যত থামানো যাচ্ছে না অপরাধী চক্রের সদস্যদের। চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, মাদক ব্যবসা করে এ রকম আমার কাছে এ মুহূর্তে কোন তথ্য নেই। যদি আপনার থাকে তাহলে আমাদের দিয়ে যাবেন। আমরা সাথে সাথে অভিযান চালাবো। যেহেতু মাদকের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ব্যাপক তথ্য। চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, গভ:হাই স্কুল, কাজেম আলী স্কুল, মহসিন স্কুল ও কোচিং সেন্টার টার্গেট করে তৎপর অপরাধী চক্র। চকবাজার এলাকা জুড়ে বসে শতাধিক ভাসমান দোকান। দোকানগুলোর আড়ালে মাদক বিক্রি হচ্ছে রমরমা। হাত বাড়ালে পাওয়া যাচ্ছে মরণঘাতী ইয়াবা। অধিকাংশ গ্রাহক স্কুল কলেজ শিক্ষার্থী। সবার কাছে সব জানা, তবুও রহস্যজনক কারণে কিছুই দেখছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী!
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাসমান দোকান গুলো নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ ও কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী। চকবাজার এলাকা জুড়ে এই নিত্যদিনের দৃশ্য। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় গাজার স্পট চকবাজার থানা থেকে ১০০ গজ দূরত্বে। চক সুপার মার্কেটের নীচে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি হয় রাত দিন ২৪ ঘন্টা, তবে বর্তমানে নতুন একটি সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। থানার পূর্ব পাশের মার্কেট আলিফ প্লাজা-২ তে বসে বিশাল জুয়ার আসর।
কেয়ারি ইলিশিয়াম, গুলজার মার্কেট, হোটেল জামান ও হোটেল সবুজে বসে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আখড়া। অভাব নেই আলো আঁধারি রেস্টুরেন্ট। আবাসিক হোটেল গুলোতে চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ। যত জমজমাট আড্ডা এই এলাকা ঘিরে, তত ভয়ংকর মাত্রায় ঘটছে ছাত্রীদের ইভটিজিং, ব্ল্যাকমেইলিং এর মত ঘটনা। কদিন আগেও এক ছাত্রীর ঘরে ডুকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে পাঁচ বখাটে। এক কথায় বলা যায়, এই এলাকার অবস্থা এতই ঝুঁকিপূর্ণ যে, কোন ছাত্রী বা নারীই নিরাপদ নন। ভাসমান দোকানপাট ছাড়াও ফুটপাত ও সড়ক জুড়ে বিভিন্ন অনুমতি বিহীন গাড়ীর স্ট্যান্ড। কেয়ারি ইলিশিয়াম মার্কেটের সামনে মাহিন্দ্রা ও বড় তাকিয়া নামক দুইটি অবৈধ গাড়ীর স্ট্যান্ড চলছে।
চক সুপার মার্কেটের সামনে থেকে চলে দুইটি টমটম গাড়ীর স্ট্যান্ড। অলি খাঁ মসজিদের সামনে থেকে চলে দুইটি টেম্পু স্ট্যান্ড। সিরাজদৌল্লা সড়ক জুড়ে ফুটপাত ও রাস্তার একপাশ ইট বালু ব্যবসায়ীর দখলে। মাস শেষে থানা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ পাচ্ছে মোটা অংকের টাকা। আর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে আছে সন্ত্রাসী চক্র। কিন্তু পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
চকবাজারে মাদকের হাট নিয়ন্ত্রণে করছে র‌্যাবের সোর্স হত্যা মামলার আসামী দুই সহোদর। খোরশেদ আলম ও মোর্শেদ আলম। পিতা মৃত শামসুল আলম। তাদের বাড়ী চকবাজার থানাধীন কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকায়। চকবাজার এলাকায় যেসব চক্র মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে তাদের মধ্যে এই দুই ভাই অন্যতম। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র বিভিন্ন ধারায় একাধিক মামলার আসামী এরা।
মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুন হয়েছিল র‌্যাবের সোর্স এরশাদ। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বাকলিয়া থানা বজ্রঘোনা এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে এরশাদের লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। পরের দিন এরশাদের পরিবার বাকলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিল। চার্জশিটে প্রধান আসামী হয়েছিল খোরশেদ আলম। আর হত্যাকান্ডের নেপথ্যে বেরিয়ে আসে চকবাজারের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ।
আর মোর্শেদ আলম কাঁচাবাজার সংলগ্ন খালপাড়ে অফিস নিয়ে বসে সুদী ব্যবসা চালান। অফিস নয়, যেন টর্চার সেল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুদী ব্যবসার আড়ালে মূলত মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে এখানে বসেই। দুই ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে আছে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন কেটাগরির সন্ত্রাসী। তাদের দিয়েই অপরাধ সাম্রাজ্য চালাচ্ছে প্রায় এক যুগ।
এদিকে, চকবাজার জুড়ে ছিনতাইকারী চক্র দাপিয়ে বেড়ায় প্রকাশ্যে। ভুক্তভোগী অনেকে মামলা না করায়, প্রশ্রয় পেয়ে যায় এসব ছিনতাইকারী চক্র। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কি দায়িত্ব নেই, এলাকার অপরাধীদের সনাক্ত করে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করা? বারবার এমন প্রশ্ন উঠে আসছে।
কিন্তু কিছুতেই লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না সন্ত্রাসীদের। মানিব্যাগ থেকে লাখ টাকা ভর্তি ব্যাগ, কিছু বাদ যাচ্ছে না। ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছে শিক্ষার্থী থেকে ব্যবসায়ী জনসাধারণ। ভাসমান দোকান হোক বা বিলাশ বহুল ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান। চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করা অসম্ভব চকবাজার এলাকায়। তাহলে কি থানা পুলিশ কিছুই জানে না? মাসব্যাপী চাঁদাবাজির একটি অংশ চলে যায় থানার ছোট বড় অসাধু কর্মকর্তা পর্যন্ত।
কাঁচাবাজার ও ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করা হয় প্রতিদিন। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত করা থাকে টাকার পরিমাণ। পরিবহন খাত থেকে আদায় করা হয় সাপ্তাহিক চাঁদা। মার্কেটের দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও কোচিং সেন্টার গুলো থেকে মাসিক হারে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। আর নির্মাণাধীন ভবন থেকে আদায় করা হয় এককালীন মোটা অংকের টাকা। নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে দখল বেদখল এর ঘটনাও ঘটছে।
আধিপত্য বিস্তার করতে বা জনসাধারণের মনে ভীতি বাঁচিয়ে রাখতে রীতিমত হামলা, শোডাউন, মহড়া, অস্ত্রবাজি ইত্যাদি ঘটছেই। তবে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই চক্রের পেছনে আছে শক্তিশালী সিণ্ডিকেট। আছে রাজনৈতিক আশীর্বাদও। ফলে আজ পর্যন্ত থানা পুলিশ ব্যবস্থা নিতে আন্তরিকতা দেখা যায়নি। বলা হয়, সন্ত্রাসীদের বাঁচিয়ে রাখে প্রশাসন। অপরাধীদের দিয়েই চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন পথ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: