রাউজানের একটি বৌদ্ধ অনাথালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১১ জুলাই ২০১৮, বুধবার: চট্টগ্রামের রাউজানে একটি বৌদ্ধ অনাথালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। সম্প্রতি উপজেলার ডাবুয়া ইউনিয়নের হিংগলা এলকার ওয়ারা পুঞঞা বৌদ্ধ অনাথালয়ের এক ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে আসার পর একের পর এক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসছে। মঙ্গলবার (১০ জুলাই) সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধি দল ও মানবিক কল্যাণ কেন্দ্রীয় কমিটির একটি দল ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান। সকাল থেকে সারাদিন তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। দুটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা মনে করছেন অনাথালয়ের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী অংমেচিং মারমা (১৫) কে ধর্ষণের পর হত্যা করে পুকুর থেকে ডুবিয়ে রান্নাঘরের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধি দলও রাউজানে সরেজমিন পরিদর্শনে আসেন। অনাথালয়ের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ।
আবাসন: ওয়ারা পুঞ্ঞা বৌদ্ধ অনাথলয়ে আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও পরিত্যাক্ত আবাসনে ছাত্র-ছাত্রীদের এক সাথে রাখা হয়। ছাত্রীদের রুমের পাশেই রয়েছে পরিচালকের বিশ্রামাগার। ছাত্রীদের জন্য নেই কোন তত্ত্ববধায়ক।
খাবার সুবিধা: ওয়ারা বৌদ্ধ অনাথালয়ে খবারের সুযোগ সুবিধাও তেমন নেই। রাখা হয়নি কোন বাবুর্চিও। অনাথলয়ের শিশুদের রান্নাবান্না করে খেতে হয়। এছাড়াও নিত্য প্রয়োজনীয় গ্লাস, জগও নেই। পরিত্যক্ত ঘরে বসে খবার খেতে হয় শিশুদের। তাদের সকালে দেয়া হয় লবন দিয়ে পান্তাভাত, দুপুরে ও রাতে সবজি দিয়ে ভাত দেয়া হয়। মাসে একবার ডিম দেয়া হয়।
আয়-ব্যয় হিসাবের তথ্য: মঙ্গলবার (১০ জুলাই) সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দল ও মানবিক কল্যাণ কমিটির প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে গেলে তারা রাউজান উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনকে খবর দেন। তিনি সেখানে গিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। আয়-ব্যয় হিসাবের তথ্য গড়মিল রয়েছে। আয়-ব্যয়ে দেখানো হয়েছে শিক্ষক কর্মচারীর বেতন। অথচ কাগজে কলমে শিক্ষক ও কর্মচারীর থাকলেও বাস্তবে কোন শিক্ষক ও কর্মচারি নেই। শুধুমাত্র একজন বয়স্ক তত্ত্ববধায়ক রয়েছেন। তিনিও বয়সের ভারে নুহ্য ও অসুস্থ।
শিক্ষক শূন্য: এ প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষক নেই। শুধুমাত্র অনাথালয়ের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রনজু চাকমাকে দিয়ে চলছে পাঠদান।
তালিজোড়া পতাকা: দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে বাঙ্গালী যাতি যে পতাকা অর্জন করেছিল সে লাল সবুজের পতাকাটি তালিজোড়া। প্রতিষ্ঠানের সামনে লাগানো লাল-সবুজের পতাকার রং বদলে ভিন্ন রংয়ের হয়েছে। ছেড়া পতাকা সেলাই করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ড প্রাপ্তদের তথ্যে গড়মিল: উপজেলা সমাজ সেবা বিভাগ থেকে ক্যাপিটেশন পান অনাথলয়ের ৩৭ শিক্ষার্থী। ক্যাপিটেশন প্রাপ্তদের তালিকার সঙ্গে অনাথালয়ে থাকা ৩ শিক্ষার্থী ছাড়া বাকী শিক্ষার্থীদের নাম ও পিতার নাম মিল নেই। ভূয়া ক্যাটিটেশন গ্রান্ড সুবিধা নিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন পরিচালক সুলাল বড়–য়া।
অনাথালয় কমিটি শুধুমাত্র কাগজে-কলমে: অনাথালয়ে যে পরিচালনা কমিটি রয়েছে সেখানে সবাই বড়–য়া। সবাই কাগজে-কলমে আছে। বাস্তবে কেউ সম্পৃক্ত নয়। এমনকি কমিটিতে যারা রয়েছেন তাদের অনেকে নিজেই জানেন না।
পুলিশ ক্যাম্প: জ্ঞান জ্যোতি ভিক্ষু হত্যাকান্ডের ঘটনার পর ঐ এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প দেয়া হয় ।
অনাথালয়ে পাশে রয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। সেটিও পুলিশ শুণ্য। জানা গেছে, পুলিশ প্রত্যাহার করে নেয়ায় পুলিশ ক্যাম্পটি পুলিশ শুন্য রয়েছে। এটি বর্তমানে তালাবদ্ধ রয়েছে।
অনাথ শিশুদের সঠিক তথ্য নেই: অনাথলয়ে ৭৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে দাবি করলেও বাস্তবে রয়েছে শুধুমাত্র ২৬ জন। তৎমধ্যে শুধুমাত্র ৩ জন অনাথ। তারা হলেন, হ্লামংনু মার্মা, হ্রাচিং মং মার্মা, ম্যানুং মার্মা।
চিকিৎসা সেবা: অনাথালয়ে কোন প্রকার চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়না। অসুস্থ শিশুদের জন্য ফার্মেসী থেকে ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়।
পুষ্টিকর খাবার: অনাথালয়ে পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়না। শুধুমাত্র শাক-সবজি দিয়ে খাওয়ানো হয়। মাছ-মাংস কখনো চোখে দেখিনি শিশুরা।
যৌন হয়রানির অভিযোগ: অনাথালয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগের শেষ নেই। সেখানে প্রায় এক ডজন যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। অনাথালয়ের নারী
শিক্ষার্থীরা কখনো পরিচালকের ভাই বাচ্চু দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার, আবার কখনো তত্ত্ববধায়কের পুত্র দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে বলে নারী শিশুদের অভিযোগ রয়েছে। ২০০২ সালে একটি মেয়েকে যৌন হয়রানির চেষ্টকালে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যু: অনাথালয়ে চিকিৎসা অবহেলায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ও মানাবিক কল্যাণ কমিটি।
হত্যা: এ প্রতিষ্ঠানে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩ জন। তৎমধ্যে গত ২০০২ সালের ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে হিংগলা ওয়ারা পুঞঞা বৌদ্ধ অনাথালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জ্ঞানজ্যোতি ভিক্ষুকে অনাথালয়ের মধ্যে তার শয়ন কক্ষের জবাই করে হত্যা করা হয়। যৌন হয়রানির চেষ্টকালে এক ছাত্রীর মৃত্যর অভিযোগ থাকলেও কখন এ ঘটনাটি ঘটেছে তার সঠিক কোন তথ্য নেই। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (০৫ জুলাই) অংমেচিং মারমার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে ধর্ষণের পর হত্যা করে পুকুর থেকে ডুবিয়ে রান্নাঘরের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আজাদ হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে লাশ দেখতে পেলেও আমাকে জানানো হয় দুপুরে। পরে আমি থানা পুলিশকে খবর দিয়ে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। এ ঘটনায় আমি খুবই মর্মাহত। আমি চাই, ধর্ষণের পর হত্যা করে থাকলে তার উপযুক্ত শাস্তি হোক। যদি আত্মহত্যা করে থাকে তাহলে কেন আত্মহত্যা করেছে তার রহস্য বের করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের বান্দরবন জেলার সভাপতি দাওনায় প্রু নেলি বলেন, অংমেচিং মারমা হত্যার শিকার। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ হত্যাকান্ডের বিচার চাই। বোনের ঝুলন্ত লাশ রেখে তার বোনকে সবজি কাটতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সার্ক মানবাধিকার সভাপতি আরো বলেন, অনাথলয়ে কোন শিশু নিরাপদ নয়। এটি একটি ব্যবসা। পাহাড়ী শিশুদের এনে এখানে ব্যবসা করা হচ্ছে। আর কোন শিশুর প্রাণ যেন না যায় সেজন্য অনাথলয়টি বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। বাংলাদেশ রাখাইন মারমা সংঘ কাউন্সিল (বিআরএমএসসি)’র সাধারণ সম্পাদক জয়তিসারা ভিক্ষু বলেন, একটি মেয়েকে ধর্ষনের পর হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি একটি হত্যাকান্ড, এটি শেষ না দেখে আমি ছাড়ব না। আমরা ঘটনাস্থলে এসে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। এখনো মামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। রাউজান উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, ঘটনার ৫দিন গড়িয়ে গেলেও আমি জানিনা। অনাথালয়ে মিস ম্যানেজমেন্ট দেখে আমি অবাক হয়েছি। শিশুদের জন্য দুপুরের খবারগুলো আমি খেয়ে দেখেছি। এতই নি¤œমানের খবার আপনাদের বলে বুঝানো যাবে না। আগামী ৩ মাসের মধ্যে এটির একটি ফলাফল সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ও মানবিক কল্যাণ কমিটিকে জানানোর আশ্বাস দেন তিনি।
রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আমাকে কেউ জানায়নি। আমার সাথে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ও একজন ভিক্ষু সাক্ষাত করেছেন। আমি তাদের বলেছি, অনালয়ে গিয়ে আমি যেসব শিশু রয়েছে তাদের নিরাপত্তা ও সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থ গ্রহণ করব। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য সামজ সেবার মাধ্যমে আমি এতিমদের জন্য ক্যাপিটেশন গ্রান্ড দিয়ে আসছি। এটি আমার প্রতিষ্ঠান অথচ ওই প্রতিষ্ঠানের এক ছাত্রীর মৃত্যুর খবর আমি জানিনা।
হিংগলা ওয়ারা পুঞঞা বৌদ্ধ অনাথালয়ের রান্নাঘর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধারকৃত অংমেচিং মারমা (১৫) বান্দর বান জেলার রুমা উপজেলার শামাশাল এলাকার উখাইজ্যা মারমার কন্যা।এদিকে মঙ্গলবার (১০ জুলাই) ওয়ারা পুঞঞা বৌদ্ধ অনাথলয় পরিদর্শনে আসেন সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের বান্দরবন জেলার সভাপতি দাওনায় প্রু নেলি, বাংলাদেশ রাখাইন মারমা সংঘ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক জয়তিসারা ভিক্ষু, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির বান্দরবন জেলার সভাপতি অংচং মং, ছাত্র ইউনিয়নের রাঙ্গামাটি শহর সংসদের সভাপতি নোভেল বড়–য়া, সদস্য অয়ন চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম মারামা যুব সমাজ সদস্য সাচিং মারমা। তারা চলে যাওয়ার সময় অনাথলয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা কান্নাকাটি করেন।

Leave a Reply