নাটকের চেয়ে নাটকীয় লুকাকুর জীবন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : ৯ জুলাই ২০১৮
রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন রেড ডেভিলরা। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তারা জানান দিচ্ছেন আমরা এসেছি বিশ্বকাপ নিতেই। খেলেছেনও তেমন। আর তাই তো বিশ্বকাপের শক্ত দাবিদার এখন বেলজিয়াম। অসাধারণ খেলে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছেন। অব্যাহত এ জয়যাত্রায় পানামা, তিউনিসিয়া, ইংল্যান্ড, জাপান এমনকি ব্রাজিলের মতো বড় দলকেও পেছনে ফেলেছেন তারা।

বেলজিয়ামের এ জয়যাত্রার অন্যতম কারিগর রোমেলু লুকাকু। তিনি রয়েছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে।

২৫ বছর বয়সী দীর্ঘদেহী লুকাকু আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বেলজিয়াম নাগরিক। ২০১৭ সাল থেকে খেলছেন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। এর আগে খেলেছেন এভারটন, চেলসির মতো স্বনামখ্যাত ক্লাবে। বেলজিয়ামের এই পোস্টার বয় বর্তমানে দর্শক জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কিন্তু এই লুকাকু তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে নির্মম বাস্তবতা। নাটকের থেকেও অধিক নাটকীয় জীবনের গল্প বলেছেন তিনি ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ।

তার নিজ মুখে বলা জীবনের গল্পটা এরকম- তখন তার বয়স মাত্র ৬ বছর। মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতিতে লুকাকু স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরতেন। সামান্য রুটি এবং দুধ বরাদ্দ থাকতো তার জন্য। এর বাইরে অন্য কিছু চিন্তা পর্যন্ত করতেন না। একদিন তার মাকে দেখলেন দুধের সঙ্গে পানি মেশাচ্ছেন। তখন তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, তারা শুধু দরিদ্রই নয় তাদের পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পথে। তবে তার মায়ের মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকতো। যেন সবকিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলছে। মা এক সময় পাড়ার দোকান থেকে রুটি বাকিতে কেনা শুরু করলেন। দোকানদার হয়তো আমাকে এবং ছোট ভাইকে দেখেই ৩ দিন পরে টাকা দেয়ার শর্তে রাজি হয়ে যেতেন।

তার বাবা একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। তার ক্যারিয়ার ছিল শেষের পথে। ঠিক তেমনটাই ছিল অর্থের অবস্থাও। অর্থের অভাবে কেটে দেয়া হলো ক্যাবল কানেকশন। আর তখন থেকে ফুটবল খেলা দেখাটাও বন্ধ। শুধু তাই নয়, রাতে বাসায় ফিরে দেখতেন বিদ্যুৎ নাই। এভাবে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অন্ধকারে থাকতে হতো লুকাকুদের। সব থেকে বেশি কষ্ট হতো গোসল করার সময়, কারণ গরম পানি থাকতো না। লুকাকু বলেন, আমাদের সংসারটাকে এত হতদরিদ্র অবস্থায় কখনোই দেখিনি। তখনই আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে, আমাকে কিছু করতে হবে।

ফুটবল খেলোয়াড়ের মানসিক শক্তি প্রবল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুকাকু মনে করেন, তার থেকে প্রবল মানসিক শক্তি আর কোনো খেলোয়াড়ের হয়তো নেই। একদিন স্কুল থেকে এসে দেখেন তার মা কাঁদছেন। মাকে লুকাকু বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। অতি দ্রুতই আমি আন্দেরলেখট ক্লাবে খেলবো। কিন্তু পেশাদার ফুটবলার হওয়ার জন্য বয়স প্রয়োজন ১৬। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৬। এই সময়টাতে আমি নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি। প্রতিটি ম্যাচ আমি ফাইনাল ম্যাচ হিসেবে নিতাম। পার্কের খেলা থেকে শুরু করে স্কুলের ম্যাচ সব আমার কাছে ফাইনাল ম্যাচ। আমি বলে কিক নিতাম শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে। কারণ আমি জানতাম এটা বাস্তব জীবনের খেলা, ভিডিও গেমস নয়।

১১ বছর বয়সে তখন তিনি খেলতেন লিয়ার্সা ইয়ুথ টিমে। তার শরীরের রং এবং দীর্ঘ দেহের কারণে বিপক্ষ দলের অভিভাবকরা লুকাকুকে মাঠে নামতে বাধা দিচ্ছিলেন। তারা প্রশ্ন করেন, বয়স কতো? কোথা থেকে এসেছি? পরিচয়পত্র কোথায়? এসব শুনে ভীষণ রাগ হতো তার। লুকাকু বলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি মানে। আমার জন্ম এন্টর্পে, আমি বেলজিয়ান।

অন্য খেলোয়াড়দের মতো আমার বাবা-মা আসতেন না। কারণ আমাদের নিজস্ব যানবাহন ছিল না। তাই আমি দূরে খেলা হলে একাই যেতাম। আমার পরিচয়পত্র দেখালে তারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করলো। তা দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হতো।

আমি সব সময়ই বেলজিয়ান ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হতে চেয়েছি। এটাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। খেলার সময় ভাবতাম সারা ঘরে ইঁদুর ছোটাছুটি করছে আর টেলিভিশনের অভাবে চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখতে পারছি না। অনেক অভিভাবক আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। এসব কারণে আমি প্রচণ্ড রাগ নিয়ে মাঠে নামতাম।

নিজের জন্য এক জোড়া জুতা কেনার সামর্থ্য ছিল না লুকাকুর। বাবার জুতা পায়ে ১২ বছর বয়সে ৩৪ ম্যাচে করেছিলেন ৭৬ গোল। একদিন লুকাকুর নানা ফোন করলেন কঙ্গো থেকে। তিনি খেলাধুলার খোঁজখবর নিলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, প্রতীজ্ঞা কর তুমি আমার মেয়ের খেয়াল রাখবে। লুকাকু সেদিনই প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন তার মায়ের খেয়াল রাখার ব্যাপারে। তার পাঁচ দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন লুকাকুর নানা।

লুকাকু তার মাকে বলেছিলেন, চিন্তা করো না, ১৬ বছর বয়সেই তোমার ছেলে লীগে খেলে দেখাবে। সত্যিই লুকাকু লীগে যোগ দেন ১৬ বছর ১১ দিন বয়সে। ২০০৯ সালের ২৪শে মে। প্লে অফের খেলা, খেলছে আন্দেরলেখট বনাম স্ট্যান্ডার্ড লীগ। অনূর্ধ্ব-১৯ টিম বেঞ্চে বসে খেলা দেখছেন আর ভাবছেন এখনো যদি দলভুক্ত না হই তবে লীগ খেলবো কবে? একদিন কোচের সঙ্গে বাজি ধরে বসলাম। আমাকে মাঠে নামান, বাজি ধরছি ডিসেম্বরের মধ্যেই ২৫ গোল করবো। প্রথমে হাসির ছলে উড়িয়ে দিলেও কোচের সঙ্গে লেগে থাকার কারণে রাজি হয়ে যান বাজিতে। কোচ বলেন, হেরে গেলে আবারো সাইট বেঞ্চে যেতে হবে। লুকাকু আবার পাল্টা বলে বসেন, বাজি জিতলে আমাদের আসা-যাওয়ার পরিবহন ব্যয় দিতে হবে এবং আমাদের প্রতিদিন প্যান কেক দিতে হবে। লুকাকু নভেম্বরেই দিলেন ২৫ গোল। আর ক্রিস্টমাসের আগেই তারা প্যান কেক খেতে লাগলেন।

লুকাকু বলেন, এই ঘটনা থেকে একটাই শিক্ষা নেয়া যায় যে, ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে কখনোই কোনো বাজি নয়।

১৩ই মে নিজের জন্মদিনে আন্দেরলেখটের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন লুকাকু। খুশির সংবাদ নিয়ে বাসায় ফিরে ক্যাবল সংযোগ নেন। টেলিভিশনে বসে দেখছিলেন, সমান সমান পয়েন্ট নিয়ে আন্দেরলেখট এবং স্ট্যান্ডার্ড লীগ মুখোমুখি। শিরোপা নির্ধারণের জন্য দুই দলকেই দুইটি প্লে অফ ম্যাচ খেলতে হবে। প্রথম খেলার পর দ্বিতীয় খেলার আগের দিন রিজার্ভ বেঞ্চের কোচ লুকাকুকে ফোন দিলেন। তাৎক্ষণিক তাকে ব্যাগ গুছিয়ে ডাকলেন স্টেডিয়ামে এবং জানালেন সে আছে মূল একাদশে।

লুকাকু বলেন, আমি স্টেডিয়ামে পৌঁছে দৌড়ে গেলাম ড্রেসিং রুমে। বাচ্চা বলেই সম্বোধন করে আমাকে কিটম্যান বললেন, জার্সি নম্বর কতো চাও? আমি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বললাম ১০ নম্বর জার্সি চাই। কিটম্যান জানান, একাডেমির খেলোয়াড়দের ৩০ নম্বরের পর থেকে জার্সি পছন্দ করতে হয়। সেবার লুকাকু খেলেছিল ৩৬ নম্বর জার্সিতে।

ম্যাচের দিন খেলোয়াড়দের বাস স্টেডিয়ামে গিয়ে থামলো। সিনিয়রদের প্রত্যেকের পরনে ছিল স্যুট। শুধু তার গায়ে ছিল পাড়ার মাঠে খেলা ট্রাক স্যুট। ক্যামেরাগুলো যেন আমাকেই খুঁজে নিচ্ছিলো বারবার। আমি মুখ লুকাতে তখন ব্যস্ত। আমার ফোন বেজেই চলছে। পরিচিতজনরা আমাকে টিভিতে দেখে মাত্র ৩ মিনিটে প্রায় ২৫টি এসএমএস পাঠায়। লুকাকু শুধু তার এক বন্ধুকে রিপ্লে দেয়, আমি আসলে জানি না, কী ঘটতে চলেছে। আমি আজ খেলতেও পারি, নাও পারি। তুমি শুধু টিভিতে চোখ রাখো। খেলার ৬৩ মিনিটে লুকাকু পেলেন সেই স্বপ্নের মুহূর্ত। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামলেন ১৬ বছর ১১ দিন বয়সী লুকাকু। সে ম্যাচে হারলেও স্বর্গের সুখ অনুভব করেছিলেন লুকাকু। পরের বছরেই লুকাকু খেলেন ইউরোপা লীগে। লীগ শিরোপা ঘরে তুুলে তার দল। আবার ওই বছরেই নির্বাচিত হন সেরা খেলোয়াড়।

লুকাকুর সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলছিল। পত্রিকাগুলোও তাকে নিয়ে প্রচার করা শুরু করলো। তবে সব ভালো হলেও জাতীয় দলে ততটা সুনাম ধরে খেলতে পারছিলেন না লুকাকু। ২০১০ সালে জাতীয় দলে নাম লেখান এই ক্ষুরধার স্ট্রাইকার। একদিন তিনি পত্রিকায় লক্ষ্য করেন লেখা, ‘রোমেলু লুকাকু, বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’! কিন্তু এতদিন আমাকে লেখা হতো ‘রোমেলু লুকাকু, কঙ্গো বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান স্ট্রাইকার’।

লুকাকুর ক্ষোভের জায়গা এই কঙ্গো বংশোদ্ভূত শব্দতে। তিনি বলেন, আমি এন্টর্প, লিজ আর ব্রাসেলসে বেড়ে উঠেছি। আন্দেরলেখটে খেলা ছিল স্বপ্ন। আমি ভিন্সেন্ট কোম্পানির মতো হতে চেয়েছি। আমার প্রথম ভাষা ফ্রেঞ্চ, পরে ডাচ্‌ শিখেছি। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ বা লিঙ্গালা বলা হয়নি বললেই চলে। তারপরেও আমি কেন আফ্রিকান? আমি একজন বেলজিয়ান। তিনি আরো বলেন, আমার দেশের কিছু মানুষ আমাকে সবসময় পরাজিত হিসেবে দেখতে চায়। আবার অনেকে আমাকে দেখে অকারণেই হাসে। সাইট বেঞ্চে বসে থাকতে দেখলেই সে হাসি যেন অন্য মাত্রা পায়। চেলসি এবং ওয়েস্ট ব্রুমেও সহ্য করতে হয়েছে সেই হাসি।

ছেলেবেলায় আবার ফিরে যান লুকাকু। বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দশ বছর চ্যাম্পিয়ন লীগ ফুটবল দেখতেই পারিনি। আমি স্কুলে যেয়ে সহপাঠীদের কাছে খেলার গল্প শুনতাম। মাঝে মাঝে সুযোগ হতো কম্পিউটার ল্যাবে গিয়ে হাইলাইটস দেখা। ২০০২ সালে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে বন্ধুর বাড়িতে গেলাম। সেবারই প্রথম রোনাল্ডোকে দেখা। আমার মনে আছে সে বছর আমার জুতায় একটা বড় ছিদ্র ছিল। আর ঠিক ১২ বছর পর আমি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলছি।

লুকাকু বলেন, ছোটবেলায় টিভিতে থিয়েরি অরিকে দেখতে পাইনি। তবে এখন প্রতিদিন তার সঙ্গে বসে গল্প করি। শিখি কীভাবে শূন্যে দৌড়াতে হয়। এর থেকে উপভোগ্য আর কী হতে পারে।

সাক্ষাৎকারের শেষে তার স্বর্গবাসী নানাকে স্মরণ করে লুকাকু বলেন, আমি তোমার কথা রেখেছি নানা। আমি তোমার মেয়েকে সুখে রেখেছি। আমাদের রুমে আর কোনো ইঁদুর নেই। আমরা এখন আর ফ্লোরে ঘুমাই না। এখন আর কেউ পরিচয়পত্র দেখতে চায় না। কারণ এখন আমাকে সবাই চেনে।

Leave a Reply