বছরের শ্রেষ্ঠ রাত লাইলাতুল কদর

অধ্যক্ষ এম, সোলাইমান কাসেমী, ৯ জুন ২০১৮ ইংরেজী, শনিবার: পবিত্র মাহে রমযানের অধিক ফযিলতের প্রধান কারণ হলো এমাসের মধ্যেই রয়েছে সারা বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ ফযিলতের রাত কদর। কদর অর্থ সম্মান বা মরতবা। এ রাত যে কত বেশি মরতবা ও ফযিলত তা কেউ ভাষায় বর্ণনা করে শেষ করতে পারবে না। স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা এ রাতটির মরতবা পবিত্র কুরআন শরীফে সুরা কদরের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহপাক বলেছেন, হে মুহাম্মদ (স:) নিশ্চয়ই আমি শবে কদরে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছি। আর আপনি কি জানেন সে শবে কদর কি? এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত হতেও উত্তম ও অধিক ফযিলতপূর্ণ। মহান আল্লাহর আদেশে এ রাতে ফেরেশতা জিব্রাইল এবং আরো অনেক ফেরেশতা দুনিয়াতে অবতীর্ণ হয় এবং রাত থেকে ফজর পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে। (সুরা কদর) এমনিভাবে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর বহু হাদীসে শবে কদর সম্পর্কে বহু ফযিলতের কথা বর্ণনা করেছেন। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, যাবতীয় রাত্রির মধ্যে শবে কদরই সর্বশ্রেষ্ঠ রাত। অর্থাৎ ফযিলতের দিক থেকে এ রাত অন্যান্য রাত অপেক্ষা অধিক উত্তম। আর শবে কদর কোন তারিখ তা নির্দিষ্ট নেই। এ ব্যাপারে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) বলেছেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমযানের শেষ সাত রাতের মধ্যে তা খোঁজে (বুখারী ২০১৫, মুসলিম ১১৬৫) রাসুলুল্লাহ (স:) অপর হাদীসে বলেছেন তোমরা রমযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদর খোঁজ কর। (বুখারী ২০১৭)। হযরত উবাই ইবনে কাব (রা:) বলেন যে, আল্লাহর শপথ করে বলছি। আমি যতদূর জানি রাসুলুল্লাহ (স:) আমাদেরকে যে রজনীতে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হলো ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯। মহিমান্বিত এ রজনীটি পরিবর্তনশীল। আর লাইলাতুল কদর বুঝার কিছু নিদর্শন রয়েছে তা হলো- ১. রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না। ২. নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না। ৩. মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে। ৪. সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তুপ্তিবোধ করবে। ৫. কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন। ৬. ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে। ৭. সকালের হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে, যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ ২১৯০, বুখারী ২০২১, মুসলিম ৭৬২)। লাইলাতুল কদরে রাসূলুল্লাহ (স:) যেভাবে এ রাত কাটাতেন এর পূর্ণ অনুসরণ করাই হবে আমাদের প্রধান টার্গেট। এ লক্ষ্যে আমাদের নিম্নবর্ণিত কাজগুলো করা আবশ্যক: ১. নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, পরিবার-পরিজনসহ নিজের অধীনস্থ এবং অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে ইবাদতে উদ্বুব্ধ করা। ২. লম্বা সময় নিয়ে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়া। এসব সালাতে কিরাআত ও রুকূ-সিজদা লম্বা করা। রুকূ থেকে উঠে এবং দুই সিজদার মধ্যে আরো একটু বেশি সময় অতিবাহিত করা, এ সময় কিছু দু’আ আছে সেগুলো পড়া। ৩. সিজদার মধ্যে তাসবীহ পাঠ শেষে দু’আ করা। কেননা সিজদাবনত অবস্থায় মানুষ তার রবের নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দু’আ কবুল হয়। ৪. বেশি বেশি তাওবা করবে, আস্তাগফিরুল্লাহ পড়বে। ছগীরা কবীরা গোনাহ থেকে মাফ চাইবে। বেশি করে শিরকী গোনাহ থেকে খালেছভাবে তাওবা করবে। কারণ ইতঃপূর্বে কোনো শিরক করে থাকলে নেক আমল তো কবুল হবেই না বরং অর্জিত অন্য ভালো আমলও বরবাদ হয়ে যাবে। ফলে হয়ে যাবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। ৫. কুরআন তিলাওয়াত করবে। অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কুরআন অধ্যয়নও করতে পারেন। তাসবীহ তাহলীল ও যিকির আযকার করবেন। তবে যিকর করবেন চুপিসারে, নীরবে ও একাকী এবং কোনো প্রকার জোরে আওয়াজ করা ছাড়া। এভাবে যিকর করার জন্যই আল্লাহ কুরাআনে বলেছেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার রবের যিকর কর মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়ভীতি সহকারে এবং জোরে আওয়াজ না করে। আর কখনো তোমরা আল্লাহর যিকর ও স্মরণ থেকে উদাসীন হয়ো না।’ (সূরা আরাফ: ২০৫) অতএব, দলবেঁধে সমস্বরে জোরে জোরে উচ্চস্বরে যিকর করা বৈধ নয়। এভাবে সম্মিলিত কোনো যিকর করা কুরআনেও নিষেধ আছে, নবীজি (স:)ও তা করেননি। যিকরের শব্দগুলো হলো সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবর ইত্যাদি। ৬. একাগ্রচিত্তে দু’আ করা। বেশি বেশি ও বারবার দু’আ করা। আর এসব দু’আ হবে একাকী ও বিনম্রচিত্তে কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। দু’আ করবেন নিজের ও আপনজনদের জন্য, জীবিত ও মৃতদের জন্য, পাপমোচন ও রহমত লাভের জন্য, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য। তাছাড়া নবী করীম (স:) এ রাতে নিম্নের এ দু’আটি বেশি বেশি করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওবুন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী’। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ, তুমি তো ক্ষমার আধার, আর ক্ষমা করাকে তুমি ভালোবাসো। কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।’ (তিরমিযী ৩৫১৩) আর এমন কতেক বান্দা রয়েছে যাদের অপরাধ এ মহিমান্বিত রজনীতে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা হবে। যাদের উপর মহান প্রভুর দয়ার পরশ পড়বে না। তারা হলো ১. অনিষ্টকারী যাদুকর ও গণক, ২. মাতা পিতার প্রতি অবাধ্য সন্তান, ৩. যার অন্তর হিংসা বিদ্বেষ ও কৃপণতায় পরিপূর্ণ, ৪. ব্যভিচারী, ৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি, ৬. চোগলখোর/ পরনিন্দাকারী এবং ৭. বান্দার হক আত্মসাৎকারী। অতএব, মহান আল্লাহ্ পাক লায়লাতুল ক্বদর বা মহিমান্বিত রজনীর সমুদয় ফয়েজ বরকত ও ফজীলত আমাদের প্রত্যেককে দান করুক। আমীন। লেখক: এম.ফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply