দানের নামে মানুষ হত্যা বন্ধ হোক

আজহার মাহমুদ, ৭ জুন ২০১৮ ইংরেজী, বৃহস্পতিবার: আত্মশুদ্ধির মাস পবিত্র রমজান মাস। রমাজান মাস মানে দান করার মাস। রমজান মাস মানে জাকাত দেওয়ার মাস। রমজান মাস মানে ফিতরা দেওয়ার মাস। রমজান মাস মানে গরীব মানুষদের হক আদায়ের মাস। কিন্তু এই হক আদায়ের পরিবর্তে যেনো মৃত্যুর হক আদায় করে ফেলছে গরীব নিরীহ মানুষরা। প্রতি বছরই রমজান মাস এলেইে এই হ্রদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। মাহে রমজান মাসে প্রতি বছর জাকাত, ফিতরা, ইফতার সামগ্রী, টাকা বিতরণ সহ শাড়ি-লুঙ্গি বিতরনের নামে গরীব এবং নিরীহ মানুষদের প্রাণ কেড়ে নেয়া হচ্ছে। দান করার নামে প্রতি বছর বীভৎস ভাবে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা আমরা নিজেরাই প্রত্যক্ষ করছি। জাকাত সামগ্রী সহ নানান দান সামগ্রী নিতে এসে প্রতি বছর লাশ হয়ে ঘরে ফিরে অনেক গরীব অসহায় মানুষ। প্রতি বছরই এই ঘটনা ঘটার পরও এই মারাত্বক একটি সমস্যার সমাধানে আমাদের দেশের বিত্তবানরা সচেতন হচ্ছে না। এটি একটি মারাত্বক অপরাধ বলে আমার কাছে মনে হয়। যে দান লোক দেখানোর জন্য দেওয়া হয় সে দান ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। প্রকাশ্যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে দান যারা করে তারা আসলে দান করার মনোভাব নিয়ে দান করে না। তাদের লক্ষ্য দান করে দেশ সমাজ এবং জাতিকে দেখানো, সেই সাথে মানুষের মাঝে জনপ্রিয় এবং সৎ ব্যাক্তি হিসেবে রূপ নেওয়া। ইসলামে স্পষ্ট ভাবে বলা আছে, তুমি এমন ভাবে দান করো সেই দানের বিষয়টি যেনো কোনো তৃতীয় পক্ষ না জানে। আমরা যদি ইসলাম এবং শরীয়ত মানার চেষ্টা করতাম তাহলে কখনোই ঢাক ঢোল পিটিয়ে দান করার মনোভাব নিজেদের ভেতর আনতাম না। এইতো বেশ কিছুদিন হলো না, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এমনি দানের বলি হলো ১০ গরীব নিরীহ মানুষ। এভাবে আরো অনেক দৃশ্য আমাদের সামনে অকপটে ঘটে যাচ্ছে যা আমাদের অজানা কিছু নয়। যদি সত্যিই দান করার ইচ্ছা থাকে তবে সেটা হতে হবে রাতের অন্ধকারে গোপন ভাবে নিজে গিয়ে দান সামগ্রী দিয়ে আসা। সঠিক ভাবে ব্যবস্থা না করে দান সামগ্রী দেওয়ার নামই হচ্ছে মানুষ হত্যা। আর বাংলাদেশের বিত্তবান প্রভাবশালীরা কখন নিয়ম মেনেছেন সেটাও আমার মনে পড়ে না। আর সে কারণেই পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মরছেন অহরহ গরীব দুঃখী। তবু দেশ, সমাজ এবং আমরা থেমে নেই, চলছি আর চলছি। কিন্তু কিভাবে চলছি তা একবারও ভেবে দেখছি না। এসকল কাজে আইনশৃংখলা বাহিনীরও সজাগ থাকতে হবে। জাকাত যেহেতু বিত্তবানদের ওপর ফরজ। তাই তাদের নিজ দায়িত্বে গরিবের দুয়ারে গিয়ে এই জাকাত বন্টনের মাধ্যমে দায় মুক্ত হওয়া। অনেক বিত্তবান মনে করেন দায়মুক্ত হওয়ার জন্য গরীবে দুয়ারে কেনো যেতে হবে, একবার মাইক নিয়ে বলে দিলেই তারা প্রাণের বাজি নিয়ে ছুটে আসবে তাদের দুয়ারে। আর তখনি তারা চরম ভুল করে। দায় মুক্ত হওয়ার চেয়ে তখন দায়ের ভারটা অতিরিক্ত হয়ে যায় তাদের উপর। কারণ প্রথম ভুল হচ্ছে প্রকাশ্যে দান কোনো দান নয়। সেই সাথে একজন গরীবের প্রাণ হারানো মানে দায়ের ভার আরো বেড়ে যাওয়া। সুতারাং দায়মুক্ত হওয়াতো দূরের কথা উল্টা দায়ের ভার বাড়িয়ে নেওয়ার কাজ বলে আমার মনে হয় এটি। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসছে, জাকাত পাওয়া তো দূরের কথা অনেক সময় লাঠিপেটাও খেতে হয় এসব গরীব মানুষদের। শরীরের আঘাত নিয়ে খালি হাতে ঘরে ফিরে আসতে হয় অনেক নিরীহ মানুষদের। জাকাতের টাকা কিংবা দানের সামগ্রী নিতে গিয়ে যখন পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ঘরে লাশ হয়ে ফিরে কিছু গরীব নিরীহ মানুষ, তখন অন্যান্য গরীব নিরীহ মানুষরা এমনিতেই চোখের জল নিয়ে খালি হাতে ঘরে ফিরে যায়। এভাবেই গরীব অসহায় মানুষদের উপর নির্যাতন হয় সবসময়। ক্ষমতাবানরাই এসকল অপকর্মের যোগানদাতা। যদি দান সামগ্রী দিতে হয় তবে সঠিক ভাবে ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনকে জানিয়ে এর ব্যবস্থাপনা করে তারপর করতে হবে। অন্যথায় নিজে অথবা কারো মাধ্যমে গরীবের ঘরে ঘরে দানসামগ্রী এবং জাকত পৌছে দিতে হবে। দানসামগ্রীর জন্য যেনো আর কোনো গরীব রাস্তায় না নামে সেই দিখে খেয়াল রাখা জরুরী। তাই সকল প্রভাবশালী, বিত্তবান এবং ক্ষমতাবান মানুষদের বলবো সঠিক ব্যবস্থাপনা না করে দানসামগ্রী কিংবা জাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই সোনার বাংলায় আর কোনো নিরীহ মানুষের মরণ দেখতে চাই না। প্রশাসন সহ সকলের প্রতি আহবান এসকল বিষয়ে সকলকে সচেতন এবং সঠিকভাবে পরামর্শ দেওয়া। প্রয়োজনে আইনের সহয়তা নিয়ে হলেও এই মরণ খেলা থামাতে হবে। আসুন সকলে এক হয়ে এইধরনের দানের বিরোদ্ধে রুখে দাড়ায় এবং নিরীহ মানুষদের বাচাঁয়। লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট ও শিক্ষার্থী, বিবিএ (অনার্স), হিসাববিজ্ঞান বিভাগ (প্রথম বর্ষ), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওমরগনি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম। ০১৮৩০১৩৬৮৩৪

Leave a Reply