মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ-আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট পাকাতান হারাপান ক্ষমতায়

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৮ মে ২০১৮ ইংরেজী, শুক্রবার: মালয়েশিয়ার ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনালকে হারিয়ে ক্ষমতায় বসে মাহাথির মোহাম্মদ-আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট পাকাতান হারাপান। নির্বাচনের আগে মাহাথিরের দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষমতায় আসার পরই কারামুক্ত হন মাহাথিরের প্রাক্তন সহযোগী আনোয়ার ইব্রাহিম। তার মুক্তির ঘটনাকে দেশটির নতুন সূচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে আনোয়ারকে বরখাস্ত করেন। পরে তাকে এক পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে অবৈধ যৌন সম্পর্কের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০১৬ সালে সদ্য প্রাক্তন হওয়া প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দল বারিসান ন্যাশনাল ছাড়েন মাহাথির। পরে তিনি আনোয়ারের রাজনৈতিক জোটে যোগ দেন। এরপরই মাহাথির ঘোষণা করেছিলেন, তিনি জয় পেলে দুই বছর পরে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবেন। তারপর আনোয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
মাহাথিরের ঘোষণা অনুযায়ী রাজা কর্তৃক ক্ষমা পাওয়ার পর কারামুক্ত হন আনোয়ার ইব্রাহীম। এছাড়া তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগও পাচ্ছেন। মাহাথিরের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুই বছর পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও হতে যাচ্ছেন আনোয়ার।
সদ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পর্কের গল্পটি এতোটাই নাটকীয় যে একে শেক্সপিয়ারের নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে কাহিনীর মধ্যে আনুগত্য, বেঈমানি, ট্রাজেডি এবং বিদ্রূপ একের অপরের সঙ্গে মিশে থাকা। মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন রোমের জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ব্রিজেট ওয়েলশ।
৯২ বছর বয়সী মাহাথিরের ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৯৯৯ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমকে দুর্নীতি এবং সমকামিতার অভিযোগে জেলে পাঠিয়েছিলেন। জেলে বসে আনোয়ার শেক্সপিয়ারের প্রতিটি গ্রন্থ পড়ে শেষ করেন। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি এই নাটকের আবির্ভাব হবে তার রাজনৈতিক জীবনে। যেখানে কাহিনীর মধ্যে আনুগত্য, বেইমানি, ট্রাজেডি এবং বিদ্রূপ একের অপরের সঙ্গে মিশে আছে।
ড. মাহাথির জয়লাভের পর তিনি আনোয়ারের মুক্তি ও ক্ষমা নিশ্চিত করলে দুইজনের সম্পর্ক একই বৃত্তে আসে। শত্রু হয়ে পড়েন বন্ধু, ঠিক শেক্সপিয়ারের নাটকের মতই যেখানে গল্পের এক পর্যায়ে খলনায়ক, নায়ক হয়ে ওঠেন। এই দুইজনের সম্পর্ক উন্নয়নের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং একে অপরের ঢাল হওয়া।
মাহাথির ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আনোয়ারকে তার প্রশাসনে জায়গা দেন। আনোয়ার একজন দৃঢ়চেতা, উদ্যমী ছাত্র নেতা ছিলেন। যিনি সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রভাবশালী দল ইউনাইটেড মালায়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন-ইউএনএমও এর বিরুদ্ধে একটি দল গঠন করতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন দেশটির স্থানীয় প্রবক্তা, যিনি ওই শক্তিশালী দলটির বিরোধিতা করতে পেরেছেন।
রাজনীতিতে ইসলামের ব্যবহারের সময়কালে আনোয়ারও একই স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর বহু দেশে মুসলিম ক্ষমতায়নের যে জোয়ার উঠেছিলো সে সময় মালয়েশিয়ার ধর্মকেন্দ্রীক রাজনীতির শূন্যস্থান দখল করে নেন আনোয়ার। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে যে কয়েকটি পালাবদল হয়েছে তার একটি ছিল আনোয়ারকে ইউএনএমও জোটে অন্তর্ভুক্ত করা। তারপর আনোয়ার খুব দ্রুত উপরে উঠতে থাকেন। তার ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতার কারণে তার সমর্থকরা এমনভাবে কাজ করেছে যেন বিরোধীরা একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে চলে আসে।
আশির দশক এবং নব্বইয়ের শুরুটা ছিল মালয়েশিয়ায় জন্য সুবর্ণ সময়, যখন দেশটিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটে। বিশ্বে যখন এশিয়ার প্রভাব বাড়ছি ঠিক তখনই মাহাথির তার নেতৃত্বে মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন।
১৯৯৩ সালে ইউএনএমও এর অধীনে বড় ধরণের জয়লাভের মধ্যে দিয়ে আনোয়ার মাহাথিরের বিরুদ্ধে একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে আবির্ভূত হন। সে সময় আনোয়ার ‘এশিয়ার রেনেসাঁ’ শীর্ষক একটি বই লেখেন। এভাবে তিনি মালয়েশিয়ার প্রেরণা ও আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়ে নিজেকে এশিয়ার একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আলাদা পরিচিতি দেন।
তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা শুরু করেন, দুটি পক্ষের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন, যেখানে এক পক্ষ শুধুই ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় এবং অপরদিকে যারা সংস্কারের মাধ্যমে জয় অর্জন করতে চায়।
১৯৯৭ সালে এশিয়ার আর্থিক সংকটের পরে মালয়েশিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পরের বছরই আনোয়ার দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে মাহাথিরকে চ্যালেঞ্জ করেন। ওই চ্যালেঞ্জ জুড়ে রাজনৈতিক বিভেদ বা মতাদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণ। তবে ক্ষমতার সিঁড়িতে মাহাথির তার দক্ষতা প্রমাণ করায় জনাব আনোয়ার সেই চ্যালেঞ্জ জয়ে ব্যর্থ হন। এরপর আনোয়ারকে মারধর করা হয় এবং এমন ঘটনার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় যা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নাড়িয়ে দেয়।
যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিদ্রোহকে কঠোরভাবে দমন করেন মাহাথির। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৯৮-৯৯ সালে এমন একটি প্যাটার্ন তৈরি করা হয় যা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি আকৃতি দেয়।
এরপর আবদুল্লাহ বাদাউই ২০০৪ সালে এবং পরবর্তীতে রাজাক ২০১৩ সালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেগুলো তাদেরকে সংস্কারপন্থী হিসেবেই পরিচিতি দিয়েছে। ২০০৩ সালে ড. মাহাথির পদত্যাগের পর আবদুল্লাহ বাদাউই ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তিনি আনোয়ারকে মুক্তি দেন। প্রথম দিকে আবদুল্লাহ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তিনি তার পার্টির অংশীদার এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান।
আব্দুল্লাহর পতনকে কাজে লাগিয়ে পুনরায় রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসেন মাহাথির। যিনি আনোয়ারকে মুক্তি দিয়েছিলেন পরবর্তীতে তিনিও মাহাথিরের রাজনৈতিক ক্রোধের শিকার হন। মাহাথিরের আরেকটি সফল পদক্ষেপ ছিল ২০০৯ সালে নাজিবকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। আনোয়ার তখন বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। যিনি সফলভাবে বিভিন্ন দলকে ২০০৮ সালে একই ছাতার নীচে নিয়ে আসেন।
নাজিব রাজাক সে সময় মাহাথিরের ভূমিকার পুনরাবৃত্তি করেন। আনোয়ারের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ এনে তাকে একটি বিতর্কিত বিচারের মুখোমুখি করেন। তবে শেষপর্যন্ত নাজিব রাজাক আবদুল্লাহর মতো একই ভুল করেন। ব্যর্থ হন জাতীয় নেতৃত্ব ধরে রাখতে। সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply