পাস্তুরিত দুধে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৮ মে ২০১৮ ইংরেজী, শুক্রবার: বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যায় এমন পাস্তুরিত দুধের শতকরা ৭৫ ভাগেই নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে৷ এরমধ্যে ৪০ ভাগ দুধে পাওয়া গেছে ই-কোলাই৷ ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবি’র বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
কেয়ার বাংলাদেশের সহায়তায় ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য ডেইরি ভ্যালু চেইন (এসডিভিসি)’ প্রকল্পের এই গবেষণা পরিচালিত হয়৷ ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ফুড মাইক্রোবায়োলজি-তে গবেষণা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়, দুগ্ধ শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দুধের অণুজীববিজ্ঞানগত মান যাচাই করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ১৮টি উপজেলার দুধ উৎপাদনকারী, হিমাগার এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে কাঁচা দুধের ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়৷ এছাড়াও ঢাকা এবং বগুড়ার বিভিন্ন দোকান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়৷ গবেষণাগারে এ সব নমুনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে প্রাথমিক দুধ উৎপাদনকারী পর্যায়ে ৭২ শতাংশ ও ৫৭ শতাংশ নমুনা যথাক্রমে কলিফর্ম এবং ফিকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া রয়েছে৷ নমুনার ১১ শতাংশ উচ্চসংখ্যক ই-কোলাই জীবাণু দ্বারা দূষিত৷
বলা বাহুল্য, ফিকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ৷ দুধে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির ফলে বোঝা যায় যে দুধ জীবাণু বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা দূষিত, যা উষ্ণ রক্তের প্রাণীর মলে থাকতে পারে বা দুধ দোয়ানোর সময় দুধে মিশে যাতে পারে৷
উৎপাদনকারীদের থেকে সংগ্রহ করা দুধের নমুনায় ৯১ শতাংশ কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া এবং ৯১ শতাংশ মল দ্বারা দূষিত বলে জানা গেছে৷ এর মধ্যে ৪০ শতাংশ নমুনায় উচ্চসংখ্যক ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়৷
স্থানীয় বাজারের পাওয়া যায় এমন পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত৷ এ সব ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে মলের জীবাণু ই-কোলাইও রয়েছে৷ তাই এ সব প্যাকেটজাত দুধ সরাসরি বা কাঁচা অবস্থায় পানের জন্য নিরাপদ নয়৷ তবে প্যাকেটজাত ইউএইচটি দুধে এই ধরনের দূষণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা৷
গবেষকদের মতে, দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে বিক্রির দোকান পর্যন্ত– প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত থাকে, যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়৷
হিমাগারগুলো থেকে সংগ্রহ করা নমুনাগুলোতে দূষণের যে হার পাওয়া গেছে, তা দুধ সংগ্রহের স্থানের নমুনাগুলোর চেয়েও পরিমাণে বেশি৷ পাঁচটি জেলার ১৫টি হিমাগারে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে বিপুল পরিমাণ কলিফর্ম ও মলবাহিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু পাওয়া যায়৷ হিমাগার থেকে সংগ্রহ করা সবগুলো নমুনাতেই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে৷ এর মধ্যে ৬৭ শতাংশ নমুনা ই-কোলাই দ্বারা উচ্চমাত্রায় দূষিত৷ এছাড়াও বি. সেরেয়াস এবং স্ট্যাফাইলোকক্কি-র মতো আরও কিছু ব্যাকটেরিয়া এ সব নমুনায় পাওয়া গেছে৷ তবে এগুলির মাত্রা ছিল স্বাভাবিক৷
গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, পরীক্ষা করা পাস্তুরিত দুধের নমুনার প্রায় ৭৭ শতাংশে মোট ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর মানকে ছাড়িয়ে গেছে৷
দুধের প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়গুলো সম্পর্কে গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখে এটি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দুধের মূল গুণ, অর্থাৎ এর পুষ্টিগত গুণাগুণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত৷ আমাদের গবেষণা থেকে দেখা গেছে, দুধের প্রাথমিক উৎপাদনকারী পর্যায়ে এর দূষণের সঙ্গে গরুর প্রজনন প্রক্রিয়া, গরুর দ্বারা উৎপাদিত দুধের পরিমাণ, দুধ দোয়ানোর সময় এবং যিনি দুধ দোয়ান, তার হাত ধোয়ার অভ্যাসের মতো বিভিন্ন বিষয় জড়িত৷ সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাস্থ্যকরভাবে দুধ দোয়ানো, সংগ্রহ ও সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং পাস্তুরিত করার বিষয়ে যতœবান হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি৷ এছাড়াও পানের জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে দুধ উৎপাদনের স্থান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত– প্রতিটি পর্যায়ে পাস্তুরিত দুধকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল রখার পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি৷’
ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ সামিরা খালেদ সুকৃতি জানান, ‘এই ধরনের দুধ যেই পান করুক না কেন, প্রাথমিক অবস্থায় তার ডায়রিয়া হতে পারে৷ বমিবমি ভাব হতে পারে৷ কিছু বিছু ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু যেমন ই-কোলাই শরীরে শেষ পর্যন্ত থেকে যায়৷ বের হয় না৷ এর ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে৷ ফলে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে৷ এছাড়া যারা প্রাপ্তবয়স্ক, তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে৷ আর সেটা ধীরে ধীরে ক্যানসারের দিকে যেতে পারে৷ শিশুদের বার বার ডায়রিয়া, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হওয়া, হঠাৎ করে শকে চলে যাওয়া, ডিহাইড্রেট হয়ে যাওয়া– এ সব হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷’
সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের নারী ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা পাস্তুরিত দুধ পানের পরমর্শ দেই৷ কারণ কাউ-টিবি, এনথ্রাক্স বা তড়কা রোগের মতো গরুর আরো যে রোগ আছে, তা যাতে মানবদেহে ছড়াতে না পারে৷ কিন্তু এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে পাস্তুরিত দুধ আসলে মান বজায় রেখে পাস্তুরিত করা হয় না৷ ফলে এটা মানবদেহের জন্য আরো বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে৷ এই দুধ পানে যক্ষা ও এনথ্রাক্স থেকে শুরু পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে।’
তিনি আরেক প্রশ্নে জবাবে বলেন, ‘দুধ গরম করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়৷ কিন্তু কিছু করার নেই৷ আমাদের এখন পাস্তুরিত দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করতে হবে৷ আর বাজারের ওপর নির্ভর না করে উপায় থাকলে নিজেরাই পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ উৎপাদন করে, পরে ফুটিয়ে তা পান করতে পারি৷’
বাংলাদেশে সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে বাংলাদেশে অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন একটা বড় সমস্যা। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক বলেন, গাভী দোয়ানোর সময় থেকে শুরু করে প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ খদ্দেরদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি ধাপে সংক্রমণ ঘটছে।
তিনি বলছেন বিষয়টিতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন এবং দুধ দোয়ানো থেকে শুরু করে দুধ কালেকশান কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া, সেন্টারে প্যাকটজাত করা, বাজারে নেয়া অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত গোটা সরবরাহ চেইন তারা পরীক্ষা করে দেখছেন।
দুধ পাস্তুরিত করার প্রক্রিয়া কী?
দুধকে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সুনির্দিষ্ট সময় ধরে উষ্ণ করার পর তা দ্রুত ঠাণ্ডা করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় পাস্তুরায়ন। সাধারণত দুধ গরম করা হয় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপাঙ্কে- তবে ৭০ ডিগ্রি তাপাঙ্কের উপরে। ৩০ সেকেণ্ডের কম দুধকে এই তাপমাত্রায় রাখার পর ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তা দ্রুত ঠাণ্ডা করে ফেলা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পাস্তুরিত দুধকে সবসময় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা।
ফরাসী বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮৮০র দশকে তরল খাদ্যকে জীবাণুমুক্ত করার এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। কাঁচা দুধে খুব দ্রুত জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। দুধ একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপরে পৌঁছলে নানাধরনের অণুজীবাণু তাতে দ্রুত বিস্তারলাভ করে। পাস্তুরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অণুজীবাণুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। সূত্র: বিবিসি ও ডয়চে ভেলে

Leave a Reply