গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রচারণা জমে উঠেছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৪ এপ্রিল ২০১৮, শনিবার: আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর প্রচারণা জমে উঠেছে। নির্বাচনী মাঠে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। নগর জুড়ে এখনো রয়ে গেছে প্রার্থীদের বিলবোর্ড আর রঙিন পোস্টার। সবচেয়ে বেশি ও আকর্ষণীয় বিলবোর্ড ঝুলছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের। নৌকা প্রতীক ও ছবি সম্বলিত রঙিন পোস্টারও দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে। অনেক প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক ও ভক্তরা নির্বাচনী আচরণ বিধির তোয়াক্কা না করে ঢাকঢোল পিটিয়ে, বাদ্য বাজিয়ে, প্রতীক সম্বলিত ব্যানার, ফ্যাস্টুনসহ মিছিল করছেন।
বিশেষ করে নৌকার মিছিলে-মিছিলে উৎসবের নগরে পরিণত হচ্ছে গাজীপুর। আওয়ামী লীগ থেকে নগরের ৫৭টি ওয়ার্ডে কাউন্সিল পদে ও ১৯টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন দেয়ার খবরে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা অসন্তুষ্ট। যদিও সরকারি দলের মনোনয়ন প্রাপ্ত বিজয় সুনিশ্চিত বলে মনে করছেন। এদিকে দলীয় মনোনীত মেয়র প্রার্থীরা এখনো পুরোদমে সাধারণ ভোটারদের কাছে ছুটতে শুরু করেননি। দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা মতবিনিময়, নির্বাচনী ক্যাম্প উদ্বোধন এসব কাজেই ব্যস্ত। এখন মূলত নির্বাচনী পরিকল্পনা আর কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশনা দিয়ে নানা ছক করছেন তারা। তবে জাসদের মেয়র প্রার্থী রাশেদুল হাসান রানা শুক্রবার বিকালে নগরের ভোগড়া এলাকায় জনসংযোগ করেন।
নগরের ৫৭টি ওয়ার্ডে কাউন্সিল পদে ও ১৯টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেয়ার খবর নানাভাবে প্রকাশ হয়েছে। এতে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। কাউন্সিলর হিসেবে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও নগরের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের জাতীয় শ্রমিক লীগ সভাপতি নাছির উদ্দীন স্বতন্ত্র পার্থী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে তিনি জানান, কাউন্সিলর পদে কেউ কেউ মনোনয়ন পেয়েছেন বলে দাবি করলেও দলের উপর থেকে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা আসে নি। তাই আমি কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছি। অন্য একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বলেছেন, দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আমি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম-কাকে ও কিভাবে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন দিলেন। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, এটা গোয়েন্দার রিপোর্টে হয়েছে। আবার প্রাণনাশসহ নানা হুমকির কারণেও প্রার্থী হতে পারেন নি কেউ কেউ। নগরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ হোসেন গত নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছিলেন। এবারো তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার আগ্রহে প্রচারে নেমে, পোস্টার ছাপিয়ে নানা ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একাধিক গণমাধ্যমেও ছাপা হয় তার সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়ে। জাহিদ হোসেন জানান, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিনের তিনদিন আগে থেকে প্রথমে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। জমা দেয়ার আগের দিন তার স্ত্রী-সন্তানদেরও প্রাণনাশ করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়। এ অবস্থায় পারিবারিক সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেননি। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ নগর জুড়ে উৎসবের নগরে পরিণত করে। আচরণবিধি ভঙ্গের মহোৎসবে রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন অনেকটা নীরব, চুপচাপ। দুপুরের পরে সংবাদ কর্মীদের নানা প্রশ্নের মুখে অবশ্য পরে কিছুটা তৎপরতা চালাতে দেখা যায় তার অফিসের সামনে।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় ব্যাপক লোকের সমাগম ঘটিয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে। আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কর্মী ও সমর্থকদের হাজির হন জেলা শহরের রথখোলার বঙ্গতাজ অডিটোরিয়ামে। এ সময় তাদের প্রার্থীদের ব্যানার, পোস্টার ও বড় একটি নৌকা নিয়ে মিছিল, শোডাউন করতে দেখা যায়। অথচ প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো মিছিল, মিটিং, কোথাও পোস্টার, লিফলেট ও ব্যানার স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু বৃহস্পতিবারই নয়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও এলাকায় নৌকার পক্ষে প্রায় প্রতিদিনই শো-ডাউন হচ্ছে। গাড়ির বহর নিয়ে, ফ্যাস্টুন তুলে, মাইক বাজিয়ে শোডাউন হয়েছে ইসলামি ঐক্য জোট প্রার্থী মাওলানা ফজলুর রহমানের পক্ষে। জাসদ প্রার্থী রাশেদুল হাসান রানার পক্ষেও মিছিল হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, সড়ক-মহাসড়কের পাশে, অলি-গলিতে রঙিন বিল বোর্ড ঝুলছে। নগর জুড়ে সবচেয়ে বেশি ও আকর্ষণীয় বিলবোর্ড রয়েছে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের। দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে তফসিল ঘোষণা করার আগে লাগানো পোস্টার। জাহাঙ্গীর আলম ছাড়াও রয়েছে জাসদের প্রার্থী রাশেদুল হাসান রানার বিলবোর্ড ও পোস্টার। একই ভাবে রয়েছে ইসলামি ঐক্যজোট প্রার্থী মাওলানা ফজলুর রহমানের রঙিন পোস্টার। অবশ্য বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দীন সরকারের বিলবোর্ড ও রঙিন পোস্টার দেখা যায়নি নগরের কোথাও। যদিও গত ৮ই এপ্রিলের মধ্যে এসব নির্বাচনী প্রচার সামগ্রী সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনার বেশির ভাগ কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।
নির্বাচনী আচরণ বিধির বিষয়ে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, সরকার দলীয় প্রার্থী যেভাবে আচরণ বিধি লঙ্ঘন করছে, তাতে এ নির্বাচন জনগণকে হতাশ করবে। নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই যেভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবনার বিষয়। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচন কমিশনকে আরো সক্রিয় হতে হবে।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. রকিব উদ্দিন মণ্ডল বলেন, আচরণবিধি যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেজন্য আমি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারপরও পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন, লঙ্ঘন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরো জানান, আচরণ বিধি যাতে লঙ্ঘন না হয় এ জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আচরণ বিধি বিলি করছি, মাইকে ঘোষণা দিচ্ছি, প্রশাসনও চেষ্টা করছে। আমাদের প্রচেষ্টা কিন্তু অব্যাহত আছে। কিছু অতি উৎসাহী মানুষ আচরণ বিধি লঙ্ঘনের চেষ্টা করে। আইনবিধি অনুযায়ী আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এদিকে, নির্বাচনী উৎসবের আমেজে যাতে কোনো অঘটন না ঘটে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন বেশ তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। তিনি বলছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন থেকে যখন যা বলা হবে পুলিশ বিভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে তা করে যাবে।
এ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ১০ জন, ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৯৪ জন এবং ১৯টি সংরক্ষিত (নারী) কাউন্সিলর পদে ৮৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। সূত্র : মানবজমিন

Leave a Reply