বাংলায় তৈরি হয়েছে ইন্টারনেটের নতুন দুনিয়া

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

অনলাইন দুনিয়ায় বেশিরভাগই ইংরেজি, তবে সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য ভাষাও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। আর সেই তালিকায় পিছিয়ে নেই আমাদের বাংলা ভাষাও। শুরুতে ইন্টারনেটে বাংলাকে ছড়িয়ে দেয়া এবং বাংলা ভাষার উপকরণ বৃদ্ধির কাজটি সহজ ছিল না। বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষায় ইন্টারনেটভিত্তিক নিউজ পোর্টালের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলায় তৈরি হয়েছে ইন্টারনেটের নতুন দুনিয়া। ওয়েবপোর্টাল ছাড়াও বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের স্থানীয় জনপ্রিয়তার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাংলা ভাষাভাষীদের নিজের ভাষায় মতো ও অনুভূতি প্রকাশের সক্ষমতা। লিখেছেন নাজমুল হোসেন

প্রতিনিয়তই জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হচ্ছে অনলাইন মাধ্যম। বাংলার প্রসারে অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমের আলাপচারিতা অনেক সহজ হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন কোনো অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলতে গেলে বাংলা ফন্টে বাংলা লিখছেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াটা কঠিন ছিল। তখন হঠাৎ ইংরেজি ফন্টের ভিড়ে বাংলা ফন্ট অনেকটাই বেমানান লাগলেও সময়ের পরিক্রমায় এখন দৃশ্যপট পুরোপুরি উল্টো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল এমনও চোখে পড়ে যে, কোনো গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে এসে একজন যখন কোনো কারণে তার মন্তব্যটি বাংলা ফন্টে লিখতে পারছেন না, তখন তিনি মন্তব্যের শুরুতে সেজন্য দুঃখপ্রকাশ করছেন! অনলাইনে বাংলা ফন্টে লেখার এই যে বিপ্লব, এর অনেকটা কৃতিত্বই পায় বিজয়-অভ্র-রিদমিক।

ইন্টারনেটে এখন সহজেই বাংলা হরফ লেখা যায়। কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ট্যাব সব ডিভাইসেই এখন বাংলা ব্যবহার করা যায়। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে বয়স্ক বাঙালি যারা ডিজিটাল মাধ্যমে কমবেশি সক্রিয়, তাদের বেশির ভাগই বাংলা হরফেই লিখছেন বাংলা। এর ফলে মনের ভাবটা ঠিকঠাক প্রকাশিত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। তবে কম্পিউটার যন্ত্রে বা ইন্টারনেটের মতো সর্বজনীন মাধ্যমে বাংলা লেখাটা কিন্তু কাগজ-কলমের মতো সহজ নয়। কম্পিউটার বোঝে যন্ত্রভাষ। সেই ভাষার সাথে মায়ের মুখের ভাষাটির খাপ খাওয়ানো খুব একটা সহজ ছিল না। আজ ব্লগে, ফেসবুকে, ই-মেইলে অনেকটা সহজে যে লিখতে পারছি বাংলা, তার শুরুটা বেশি দিনেরও নয়। কম্পিউটারের বাংলার চর্চা গত শতকের আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু। প্রয়োজনের তাগিদেই তার অগ্রযাত্রা হয়েছে। বাংলাদেশে অনলাইন ইন্টারনেটের সূচনা ১৯৯৬ সালে। তখন থেকেই ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে দেয়ার নানা চেষ্টা দেখা গেল। পিডিএফ ফাইল করে, লেখাকে ছবি বানিয়ে ভারী ভারী ফাইল বানিয়ে এক-দুই ফর্দ বাংলা লেখা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা অনেকেরই মনে আছে।

বাংলায় লেখা ফাইল ই-মেইলে সংযুক্ত করে পাঠানো হতো। অন্য কম্পিউটারে সেই লেখা খুলবে কিনা সেই আশঙ্কায় বাংলা ফন্টটাও পাঠিয়ে দিতে হতো। অনলাইনে বাংলা লেখার জোয়ার এসেছে একুশ শতকের গোড়ার দিক থেকে। তত দিনে কম্পিউটার বা ডিজিটাল যন্ত্রে যেকোনো ভাষা লেখার কারিগরি নীতি ‘ইউনিকোড’ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বাংলাও ঢুকে গেল ইউনিকোডে। আর এর ফলে এখন শুধু যোগাযোগমাধ্যমই নয়, যেকোনো প্রয়োজনেই আমরা আজকাল বাংলা ফন্ট ব্যবহার করছি অনলাইন মাধ্যমে। এতে করে আমাদের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি মায়ের ভাষার জন্য মমত্ববোধটাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে ভাষায় কথা বলার জন্য এত ত্যাগ, এত বীরত্বগাথা রচিত হয়েছে, তার বহুল ব্যবহার নিশ্চিতভাবেই বাংলা ভাষাকে আরো দীর্ঘায়ু দেবে।

বাংলার ব্লগাররা ক্রমাগত নতুন নতুন লেখার মাধ্যমে তিল তিল করে ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার উপকরণ যুক্ত করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। আর এর ফলেই তৈরি হয়েছে বাংলা ভাষায় উইকি (অনলাইন বিশ্বকোষ)। ইউনিকোড বাংলা লেখা প্রচলনের মাধ্যমে ওয়েবে বাংলা লেখা ও পড়া সহজতর হয়েছে এবং খুলে গেছে মাতৃভাষায় যোগাযোগের নতুন দুয়ার। ব্লগ পরিমণ্ডল এখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। বিকল্প গণমাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে এটি বিকশিত করে চলেছে নাগরিক সাংবাদিকতা, মানবকল্যাণে যূথবদ্ধতা, অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের উর্বর ক্ষেত্র।

অনলাইন মাধ্যমে নিজের কথাগুলো সবাইকে জানানোর উৎকৃষ্ট উপায় হলো লেখালেখি। আর আমরা বাঙালি, মনের কথা আমাদের বাংলাতেই লিখতে হবে। ফোনে, ফেসবুকে আগেও আমরা বাংলা লিখতাম। তবে তা ইংরেজিতে।
ভার্চুয়াল জগতে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে সবার প্রথমে যে নামটি মনে পড়ে, তা বিজয় বাংলা কি-বোর্ড। ১৯৮৮ সাল থেকে, অভ্র কি-বোর্ড আসার আগে পর্যন্ত বাংলা লেখার কাজে বিজয় ছিল একচেটিয়া। অভ্রর পর মোবাইলের জন্যও এলো রিদমিক, যা বেশি দিন আগের কথা না। যেহেতু এতে লেখা সহজ, তাই আমরাও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি সহজেই। আমরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে বলেই আজ আমরা নিজের ভাষায় সাইবার জগতে বিচরণ করতে পারছি। তবে কিছু ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে।
বাংলা টাইপিংয়ে ইংরেজির মতো শুধু বর্ণের পিঠে বর্ণ বসালেই হয় না, আ-কার, ই-কার, কারক-বিভক্তি তো আছেই, আবার আছে যুক্তবর্ণের মতো কঠিন ব্যাপারস্যাপারও। এখনো অনেকে রপ্ত করে উঠতে পারেননি এই জটিল দিকগুলো। তাই অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখতে গিয়ে দৃষ্টিকটু ভুল করেন। একটু সচেতন হলেই আমরা অনলাইন জগতে বাংলা লিখতে পারব পরম মমতায়, কোনো বিকৃতি ছাড়া।

Leave a Reply