জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের ১/১১

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮, বুধবার: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সারাদিনই ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ একদল সেনা কর্মকর্তা দুপুরের দিকে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। সে সময়ের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ একটি বই লিখেছেন।
‘শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ’ নামে সে বইতে বর্ণনা করেছেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সাথে বৈঠকে কিভাবে জরুরী অবস্থা জারীর বিষয়টি উঠে এসেছিল।
সে বইতে মঈন ইউ আহমেদ বর্ণনা করেন, ” আমি প্রেসিডেন্টকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের আল্টিমেটাম এবং বিদেশী রাষ্ট্র সমূহের অবস্থান, বিশেষ করে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানালাম। জাতিসংঘ মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হলে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে তা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হলো।” সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী।
২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশে যে ধরনের সহিংস পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে সে বিষয়টি গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে বুঝিয়েছেন। সার্বিক বিবেচনায় সামরিক কর্মকর্তারা জরুরী অবস্থান জারীর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেন।
দেশে জরুরী অবস্থা জারী করা হতে পারে – এমন ধারণা পেলেও বিষয়টি নিয়ে ১১ই জানুয়ারি সারাদিনই নিশ্চিত হতে পারছিল না আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র নেতারা।
সেদিন দুপুরে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের সাথে বৈঠক হয়েছিল আওয়ামীলীগ নেতাদের। সে বৈঠকটি হয়েছিল ঢাকাস্থ কানাডীয় হাই কমিশনারের বাসায়।
সেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাশাপাশি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের হাই কমিশনার উপস্থিত ছিলেন।
সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
সে বৈঠকের বর্ণনা দিতে গিয়ে মি: সেলিম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ” বিভিন্ন কথার এক পর্যায়ে তারা বললো এভাবে হলে তো দেশ চলতে পারে না। এভাবে হলে তো বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা বাড়বে। আপনার দুই দল যদি সমঝোতায় না আসেন তাহলে অন্যরকম ঘটনা ঘটতে পারে। ওনাদের কথায় মনে হলো কী যেন একটা হচ্ছে। কারণ ওনারা পজিটিভ কিছু বললেন না।”
একদিকে রাস্তায় আওয়ামীলীগের আন্দোলন এবং অন্যদিকে বঙ্গভবনে সেনা কর্মকর্তাদের তৎপরতা চলছে।
একই সাথে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাস্থ বিদেশী কূটনীতিকরা।
পর্দার অন্তরালে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে অনেকটা অন্ধকারে ছিল সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়া দল বিএনপি। দলটি তখন ২২শে জানুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ১০ই জানুয়ারি গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লায় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন।
তখন খালেদা জিয়ার সাথে ছিলেন বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশারফ হোসেন।
মি: হোসেন বলছিলেন, “কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে রাত নয় থেকে ১১টা পর্যন্ত জনসভা করেছেন। আমরা রাত একটার সময় ঢাকায় ফিরে আসি। ১১ তারিখ বিকেলের দিকে জানতে পারলাম যে সেনাবাহিনী থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়েছেন এবং সেখানে কিছু একটা হচ্ছে। জাতিসংঘের কিছু একটা চিঠি নিয়ে সেনাপ্রধান এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বঙ্গভবনে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে জরুরী আইন ঘোষণা করাচ্ছেন।”
সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র বিরোধের কারণে সহিংস পরিবেশ ছিল অনেকটা সময় ধরে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হবার অনেক আগে থেকেই সে সময় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট রাস্তায় আন্দোলন করছিল।
একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার লেখা বইতে জরুরী অবস্থা জারীর পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেছেন।
সে বইতে মি: আহমেদের বর্ণনা ছিল এ রকম, ” একসময় ক্ষমতাধর কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে জানাল, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের জন্য তারা জাতিসংঘকে অনুরোধ করবে। প্রচ্ছন্ন এ হুমকির পরিণতি অনুধাবন করতে আমার অসুবিধা হলো না। জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক এসব দেশের অনুরোধ ও মতামত যে জাতিসংঘ অগ্রাহ্য করতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি এর পরিণাম চিন্তা করে শিউরে উঠলাম। তারপরেও আমার একমাত্র চিন্তা ছিল কিভাবে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্র যন্ত্রের কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা যায়।”
সে সময় ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন ড: সোয়েব আহমেদ। ২
২রা জানুয়ারির নির্বাচনে যখন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন ‘ভিন্ন কিছু’ আঁচ করছিলেন মি: আহমেদ।
সেদিন সব উপদেষ্টাদের বঙ্গভবনে যাবার জন্য অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
ড: সোয়েব আহমেদ বঙ্গভবনে গিয়ে জানতে পারেন যে তিন বাহিনীর প্রধান রাস্ট্রপতির সাথে বৈঠক করছেন।
তখন উপদেষ্টা পরিষদের সবাই জানতে পারলেন যে রাষ্ট্রপতি জরুরী অবস্থা ঘোষণা করবেন। কিন্তু বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো তাদের জানানো হয়নি।
মি: আহমেদ বলেন, “এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আমাদের সাথে চা চক্রে মিলিত হলেন। সেখানে তিনি জানালেন যে পরিস্থিতির জটিলতার কারণেই তত্বাবধায়ক সরকার ভেঙ্গে দিতে হচ্ছে। আমরা সবাই রেজিগনেশন দিয়ে চলে গিয়েছি।”
সে রাতেই শুরু হয়েছিল আরেকটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া।
প্রথমে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনুসকে সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি তাতে রাজী হননি।
তখন ড: ফখরুদ্দিন আহমদ প্রস্তাব পেয়ে এগিয়ে আসেন। সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সে প্রক্রিয়া চালিয়েছিলেন।

Leave a Reply