শরিকদের আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১০ জানুয়ারী ২০১৮, বুধবার: মহাজোটের শরিকদের আসনে জোরেশোরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের অনেকে দলীয় মনোনয়ন পেলেও দলের নির্দেশে জোটের শরিককে আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা শরিকদের আসন ছেড়ে দিতে চান না। নির্বাচন বঞ্চিতদের দাবি নির্বাচনী জোট হতে পারে তবে আসন রদবদল করা হোক এবং বিতর্কিত এমপিদের আসনে শরিকদের মনোনয়ন দেয়া হোক। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারাও এ শেষ সুযোগ চান।
পঞ্চগড়-১ আসনে মহাজোটের আশীর্বাদে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের নাজমুল হক প্রধান। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাবেক এমপি মজাহারুল হক প্রধান। এ আসনে জাতীয় পার্টির শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন আবু সালেক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন কোনোভাবে হাতছাড়া করতে চান না মজাহারুল হক। মঙ্গলবার তিনি বলেন, আসনটি আওয়ামী লীগের। জোটের কারণে গতবার ছাড় দিয়েছি। এবার নির্বাচনী জোট হলেও এ আসনে নির্বাচন করতে চাই। প্রয়োজনে আসন রদবদল করা হোক। এছাড়া দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা গত নির্বাচনের আগে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় বলেছিলেন যারা শক্তিশালী প্রার্থী তাদের আসনগুলো আগামী নির্বাচনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখবেন। আশা করি এবার জোট কিংবা একক নির্বাচনে আমি মনোনয়ন পাব এবং নির্বাচন করব।
বরিশাল-৩ আসনে মহাজোটের এমপি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতান। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে দলের নির্দেশে প্রত্যাহার করেছিলেন সিরাজউদ্দীন আহমদ। জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সাবেক অতিরিক্ত সচিব সিরাজউদ্দীন এবার দলীয় মনোনয়ন চান। এ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার।
৩০০ আসনের মধ্যে ৫০টি আসনে মহাজোটের শরিকদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। দশম জাতীয় সংসদে জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির ৩৪ জন প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টি ৬, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ ৫, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ২, জাতীয় পার্টি জেপি ২ ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনএফ) একটি আসন রয়েছে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৩২ জন। এর বাইরে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ১৮ জন। এছাড়া গাইবান্ধা-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন ২টি শূন্য রয়েছে। ১৩ মার্চ এ দুটি আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
কুড়িগ্রাম-৩ আসন বরাবরই জাতীয় পার্টির। গত নির্বাচনে আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলের উপজেলা সভাপতি মতি শিউলি। মহাজোটগত নির্বাচন হওয়ায় মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন তিনি। এবার আসনটিতে জোর প্রস্তুতি তার। মঙ্গলবার তিনি বলেন, জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে যেন আসন রদবদল করা হয়। আসনটিতে দীর্ঘদিন ধরে আমি কাজ করছি। এবার একক কিংবা জোটগত নির্বাচন হলেও মনোনয়ন আমি পাব বলে আশা করছি। একই আসনে এবার মনোনয়ন চান চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীরবিক্রম শওকত আলী সরকার। প্রবীণ রাজনীতিবিদ শওকত আলী ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এবার শেষ সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বগুড়া-২ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ। একই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন মো. আকরাম হোসেন। দলের নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন তিনি। নবম সংসদেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন করতে পারেননি। তাই এবার তিনি জোরেশোরে প্রস্তুতি শুরু করেছেন। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি মোহাম্মদ নোমান। আসনটিতে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী কাজ করছে। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন আবদুল মজিদ।
ঢাকা ৪-আসনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জাপার সভাপতি আবু হোসেন বাবলা। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন সানজিদা খানম। এ আসনে আওয়ামী লীগের অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ড. আওলাদ হোসেন। দশম জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৭ আসনে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনএফ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি বনে যান আজাদ। তবে নবম সংসদে এ আসনের এমপি ছিলেন এরশাদ। আসনটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ড. আলাউদ্দিন আহমেদ। তার সঙ্গে এবার নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুুল কাদের খান। এবার এ আসনে এরশাদ নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মহাজোটগত নির্বাচন হলে আর কোনো প্রার্থী না থাকার সম্ভাবনা বেশি। তবে আওয়ামী লীগ নেতা কাদের খান বলেন, রাজধানী ঢাকার প্রাণ হল ঢাকা-১৭ আসন (গুলশান-ক্যান্টনমেন্ট)। এটি হাতছাড়া হওয়া কোনো দলের কাম্য নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা এবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আমি সবার মত নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছি। আশা করি মনোনয়ন পাব।
দশম জাতীয় সংসদে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি মহাজোটের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মো. ইয়াসিন আলী। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন ইমদাদুল হক। নড়াইল-২ আসনের এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ হাফিজুর রহমান। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন এসএম আশিকুর রহমান। সাতক্ষীরা-১ আসনের এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবিএম নজরুল ইসলাম। ঢাকা-৮ আসনে রাশেদ খান মেনন প্রার্থী হওয়ায় দলীয় প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। এবার আসনটিতে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েক প্রভাবশালী নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। উল্লিখিত আসনগুলোতেও ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা করছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের এমএ আউয়াল। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন মো. শাহজাহান। কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি জাতীয় পার্টির (জেপি) মো. রুহুল আমিন। আসনটিতে রুহুল আমিন জোটের প্রার্থী হলেও নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে হেরে যান মো. জাকির হোসেন। এবার জাকির হোসেন জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আসনটিতে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। রৌমারী উপজেলা চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বঙ্গবাসীও আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
দশম জাতীয় সংসদে নীলফামারী-৪ আসন থেকে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির মো. শওকত চৌধুরী। এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন কর্নেল (অব) মারুফ সাকলাইন। এবার মারুফ ছাড়াও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আকতার হোসেন বাদল। জাসদের পাঁচ এমপির মধ্যে তিনজন নতুন। তারা হলেন- নাজমুল হক প্রধান (পঞ্চগড়-১), একেএম রেজাউল করিম তানসেন (বগুড়া-৪) এবং শিরীন আখতার (ফেনী-১)। জাসদের পাঁচটি আসনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও গতবারের মনোনয়নপ্রাপ্তরা কাজ করছেন। কুড়িগ্রাম-১ আসনের এমপি জাতীয় পার্টির একেএম মোস্তাফিজুর রহমান। মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন আসলাম হোসেন সওদাগর। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে শিল্পপতি গোলাম মোস্তফা ও যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মাহফুজুর রহমান উজ্জ্বল প্রত্যাশা করছেন।
একই অবস্থা মহাজোটের অন্য আসনগুলোতেও। নিজের আসনে এবার নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগের বঞ্চিত নেতারা আগেভাগেই গণসংযোগ শুরু করেছেন। কীভাবে নির্বাচন করবেন সেই ছকও আঁকছেন অনেকে। তবে প্রচার-প্রচারণা যাই হোক, জোটগত নির্বাচনের দিকে ঝুঁকছে বড় দলগুলো। দশম জাতীয় সংসদের মতো এবারও কপাল পুড়তে পারে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও আওয়ামী লীগ নেতাদের। এমন আভাস দিয়েছেন মহাজোটের শীর্ষ নেতারা।
জোটের কারণে গত নির্বাচন থেকে সরে আসা দলীয় প্রার্থীদের জন্য আওয়ামী লীগ কী ভাবছে জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, এখনই তাদের বিষয়ে কোনো আশার বাণী বলতে পারছি না।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীও ঠিক করা হয়েছে। প্রতিটি আসনে তিনজন করে প্রার্থীর নাম নেয়া হয়েছে। আসন সমঝোতার বিষয়টি নির্ভর করবে আগামী দিনে আমরা জোটবদ্ধ হচ্ছি কি-না। এ নিয়ে নির্বাচনের আগে আলোচনা হতে পারে। তখন বোঝা যাবে জাতীয় পার্টি কোথায় কতগুলো আসন প্রস্তাব করবে। সূত্র : যুগান্তর

Leave a Reply