মাগুরা জেলার সুলতানের ৪০ বছর বিনা বেতনে শিক্ষকতা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১০ জানুয়ারী ২০১৮, বুধবার: সুলতান ১৯৭৩ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন নাগরা কাদেরিয়া সিরাজিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায়। ৪০ বছর শিক্ষকতার পর ২০১৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ এই ৪০ বছরের শিক্ষকতার জীবনে কোনো বেতনভাতা পাননি তিনি।
শেষ বয়সে সুলতানের এখন একটাই আশা, মাদরাসাটি জাতীয়করণ দেখে কবরে যেতে চান তিনি। নিজে বেতনভাতা না পেলেও এখন যারা সেখানে শিক্ষকতা করছেন তারা যদি বেতন পান তাতেই আনন্দ সুলতানের। কারণ মাদরাসাটি তিনি নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিজের হাতে গড়া প্রিয় মাদরাসা যাতে জাতীয়করণ হয় সে জন্য রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন সুলতান। খবর নয়াদিগন্ত’র।
সুলতানের মাদরাসটি মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানায় অবস্থিত। সুলতান বলেন, সওয়াবের আশায় একদিন নিজেই প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষকতা শুরু করলাম মাদরাসায়। মানুষ ইসলাম শিখবে, ভালো মানুষ হবে এই ছিল আশা। সেই আশা এক সময় নেশায় পরিণত হয়। তাই বিনা বেতনে ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছি। আমাদের মাদরাসায় অনেক ভালো মানুষ তৈরি হয়েছে। সুলতান বলেন, তবে তিনি তার ছেলেমেয়েদের বেশি লেখাপড়া করাতে পারেননি অভাবের কারণে। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে শুধু ছোট ছেলে ফাজিল পাস করেছে। অন্যরা সামান্য লেখাপড়া শিখে উপার্জনে নামতে বাধ্য হয় সংসারের টানাটানিতে। বিনা বেতনে শিক্ষকতার কারণে কৃষিকাজ করে কোনোমতে জীবিকার ব্যবস্থা করতেন সুলতান।
তিনি বলেন, বর্তমানে মাদরাসায় পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক কামেল পাস। তারাও সবই বিনা বেতনে চাকরি করছেন। সুলতানের দাবি আমরা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সব বই পড়াই। এর সাথে পড়াই মাদরাসার বই। সরকার ২৬ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করেছে। আমাদের মাদরাসা জাতীয়করণ হবে না কেন? আমাদের কী দোষ?
আমরণ অনশনে আরেক বৃদ্ধ আনোয়ার হোসেন মিয়া এসেছেন ঝিনাইদহ সদর থেকে। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন হরিশঙ্করপুর মিয়াপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে শিক্ষকতা শুরু করেন আনোয়ার হোসেন। বিনা বেতনে ২৮ বছর চাকরি করার পর অবসরে যান তিনি।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৯৫ সালে তিনি এবং মাদরাসার অপর দুই শিক্ষক মাসে ৫ শ’ টাকা করে ভাতা পেতে শুরু করেন। কিন্তু ছয় মাস পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। কেন বন্ধ হলো আজ অবধি তিনি জানেন না।
বেতনভাতা ছাড়া কেন এত দিন পড়ে ছিলেন মাদরাসায় জানতে চাইলে আনোয়ার বলেন, মানুষ দ্বীনি এলেম শিখবে এই নিয়তে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম মাদরাসা। এরপর আজ হবে কাল হবে এই আশায় জীবন শেষ হয়ে গেল, এমপিওভুক্তি বা জাতীয়করণ আর হলো না। এবার অনেক আশা নিয়ে এসেছি দেশের সব স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ হবে। আমাদের জীবন তো শেষ হয়েই গেল। এবার তাই আর দাবি পূরণ না হলে বাড়ি ফিরতে চাই না।
সুলতান ও আনোয়ারের মতো আরো হাজার হাজার শিক্ষক স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় সারা জীবন বিনা বেতনে চাকরি করে অবসরে চলে গেছেন। তারা আশায় ছিলেন একদিন হয়তো তাদের মাদরাসা এমপিওর আওতায় আসবে অথবা জাতীয়করণ হবে, অথবা কমপক্ষে সরকার থেকে মানসম্মত পরিমাণ ভাতা পাবেন। এ আশা নিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এক সময় তারা চলে গেছেন জীবনের শেষ প্রান্তে। অনেকে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। এভাবে সরকারের অবহেলা আর উদাসীনতার কারণে স্বাধীনতার পর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে হাজার হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা। ১৯৮৪ সালে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ১৮ হাজার ১৯৪টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা রেজিস্ট্রেশন দিলেও বন্ধ বন্ধ হতে হতে ২০১৬ সালে মাত্র ছয় হাজার মাদরাসা টিকে ছিল। জাতীয়করণের আশায় গত এক বছরে অবশ্য অনেক পুরনো মাদরাসা আবার চালু হয়েছে বলে জানান শিক্ষক নেতৃবৃন্দ।
রফিকুল ইসলাম গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বানিহালি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে আসছেন। তিনি বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, কিন্তু আমাদের দিকে ফিরে তাকায় না। আমরা শিক্ষকতা করেও ভাতা পাই না।
মোসলেহউদ্দিন মাহমুদ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইসলামকি স্টাডিজে মাস্টার্স পাস করে বিনা বেতনে চাকরি করছেন এ রব এমলিতোলা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায়। লক্ষ্মীপুর সদরে অবস্থিত এ মাদরাসার প্রধান শিক্ষক তিনি। ছোট ব্যবসা এবং ইমামতি করে সংসার চালান মাহমুদ।
শওকত আলী বরগুনা সদরের ছোট গৌরিচন্না স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক। নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় ১৯৮৪ সাল থেকে বিনা বেতনে চাকরি করে আসছেন তিনি। শওকত আলী বলেন, সর্বশেষ সমাপনী পরীক্ষায় তার মাদরাসাটি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। দুই ছেলে তিন মেয়ের বাবা শওকত আলী দুঃখ করে বলেন, আমরা মানুষকে লেখাপড়া করাই কিন্তু অর্থের কারণে আমার ছেলেমেয়েদের বেশি লেখাপড়া করাতে পারি নাই। এ কষ্ট কোথায় রাখি।
মোসলেম আলী এসেছেন গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুরের দুর্গাপুর কাদেরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা থেকে। মোসলেম আলী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক। ১৯৯৮ সাল থেকে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে আসছেন তিনি। তার মাদরসায় ১৬৫ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে এবং এবার সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ পাস করেছে বলে জানান তিনি।
পদ্মা ইসলামিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন ১৯৮৪ সাল থেকে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে আসছেন। বরগুনা সদরে অবস্থিত এ মাদরাসাটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন।
১৯৮৪ সালে মাদরাসা বোর্ড ১৮ হাজার ১৯৪টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার রেজিস্ট্রেশন দেয়। সরকারের অবহেলা আর বেতনভাতা না দেয়ার কারণে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে হাজার হাজার মাদরাসা। অথচ অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীনতার পরপরই। বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা চালু রয়েছে। ১৯৯৪ সালে সরকার একই পরিপত্রে দেশের সব রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুল ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের মাসে ৫ শ’ টাকা করে ভাতা দেয়ার পরিপত্র জারি করে। রেজিস্টার্ড প্রাইমারি স্কুল ভাতা পরে বাড়ে এবং একপর্যায়ে ২০১৩ সালে প্রায় সব স্কুল জাতীয়করণ হয়। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের মাসে ৫ শ’ টাকা দেয়ার কথা বলেও তা বন্ধ হয়ে যায় মাত্র এক হাজার ৫১৯টি মাদরাসা ভাতার আওতায় আনার পর।
তাই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন জাতীয়করণের দাবিতে। গত ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চলা অবস্থায় শিক্ষকরা গতকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে। এতে সারা দেশ থেকে যোগ দিয়েছেন কয়েক হাজার শিক্ষক। রয়েছেন অনেক নারী শিক্ষকও।

Leave a Reply