পাঁচ দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ শুরু

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৮ জানুয়ারী ২০১৮, সোমবার: আজ থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮। এবারের পুলিশ সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য- ‘জঙ্গি মাদকের প্রতিকার, বাংলাদেশ পুলিশের অঙ্গীকার’।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারার সংশোধন চায় পুলিশ।সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারার সংশোধন চায় পুলিশ। বর্তমানে এ আইনে মামলা করার সময় তাৎক্ষণিক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে হয়।
এ ছাড়া চার্জশিট দেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ারও বিধান মানতে হয়। পুলিশ বলছে, এ ধারার সংশোধন না হলে বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে।
আজ সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহে এ আইনের বিষয়টি বিশেষভাবে মনোযোগে আসছে। পুলিশ বিভাগ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৪০ (১) ও ৪০ (২) ধারার সংশোধন চাইবে।
পুলিশ জানায়, অনেক সময় চার্জশিটের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হলে তা দিনের পর দিন আটকে থাকার নজির আছে। এতে উগ্রপন্থিদের দ্রুত বিচারের আওতায় নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পাঁচ দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮ রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বার্ষিক প্যারেডে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে গতকাল রোববার বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা বিধানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুলিশ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারা অনবদ্য অবদান রাখছে। সম্প্রতি জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের অনন্য ভূমিকা দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম ত্যাগ ও বীরত্বগাথার ইতিহাসকে ধারণ করে সগৌরবে এগিয়ে চলছে পুলিশ। সরকার পুলিশকে একটি দক্ষ, জনবান্ধব ও প্রতিশ্রুতিশীল বাহিনীতে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
আইন সংশোধনের প্রশ্ন : পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জঙ্গিবাদ অত্যন্ত গুরুত্ব একটি ইস্যু। জঙ্গিদের গ্রেফতারের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রুজু করা হয়। আইনটি ২০০৯ সালে প্রণীত।
আইনের একটি ধারায় রয়েছে- সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া এ আইনের অধীনে কোনো অপরাধ বিচারের জন্য আমলে নেওয়া হবে না। এই ধারার ব্যাখা হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন রয়েছে।
সেখানে বলা আছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিলের আগে এর একটি অনুলিপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এর পর সেখানে অনুমোদন পাওয়ার পর তা বিচারের জন্য আমলে নেওয়া হবে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিট অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে মাসের পর মাস আটকে থেকেছে। ২০১৫ সালে পুরান ঢাকার হোসনীদালানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিটের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনায় পড়ে পুলিশ।
এ মামলার তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে চার্জশিট দেওয়া হয়। দীর্ঘ দিন চার্জশিট অনুমোদনের জন্য আটকে থাকার পর গণমাধ্যমে লেখালেখি শুরু হয়। এর পর চার্জশিটে অনুমোদন দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, অন্য কোনো ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান না থাকলেও কেন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এমন ধারা যুক্ত করা হবে?
এ ব্যাপারে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, যে কোনো মামলার তদন্ত একটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। আর তদন্তের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো কোনো নির্বাহী বিভাগের দিকনির্দেশনা না থাকা বাঞ্ছনীয়। সেই যুক্তির আলোকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নির্দিষ্ট ওই ধারার সংশোধন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
পুলিশের ডিসি (প্রসিকিউশন) আনিসুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারার পরিবর্তন করলে কী কী সুবিধা হতে পারে, তা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হতে পারে।
আরও যা চায় পুলিশ : পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের সংশোধন চায় পুলিশ। পুলিশ বলছে, আইনে নির্যাতন যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তা আরও পরিস্কার হওয়া জরুরি। আইনে মানসিক কষ্ট বলতে কী বোঝায়, সে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার কথা বলবে পুলিশ। এ ছাড়া হেফাজতে মৃত্যুর সংজ্ঞা আরও পরিস্কার করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামির মৃত্যু নিয়ে পুলিশকে বিব্রত ও দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। মানবাধিকারের প্রশ্ন ওঠে। হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগই বেশি। কালে-ভদ্রে পুলিশের সাজাও হয়। তবে আইনের কিছু অস্পষ্টতা দূর করতে চায় পুলিশ।
পুশিল সপ্তাহে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি পুলিশ একাডেমি, প্রস্তাবিত ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ গ্রেড-১, গ্রেড-২ সংক্রান্ত প্রস্তাব, পুলিশের যানবাহন বাড়ানো, মোটরসাইকেল কেনার জন্য উপপরিদর্শকদের দুই লাখ টাকা ঋণ প্রদান, প্রশিক্ষণ ভাতা বৃদ্ধি, পুলিশ বিভাগে বিদ্যমান সব আউটসোর্সিং পদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণিতে নিয়মিতকরণসহ ভবিষ্যতে আউটসোর্সিং হিসেবে নতুন পদ সৃষ্টি না করা সংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরার কথা আছে।
এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পোশাক সামগ্রী সরকারিভাবে সরবরাহ করা, পুলিশের নামে বরাদ্দকৃত খাসজমির নামজারি, স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) পূর্বাচল নিউ টাউনে ১০ বিঘা জমি বরাদ্দ, পুলিশ মেডিকেল কলেজ, সারাদেশে নৌ পুলিশের নামে ৮১ একর জমি দেওয়ার বিষয়টি পুলিশের আলোচ্য এজেন্ডায় রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২-৭৪ সালে পুলিশকে ১৫৩টি বাড়ি দিয়েছিলেন। বাড়িগুলো পুলিশের নামে নামজারি করার প্রস্তাব, ডিএমপিতে ডাম্পিংয়ের জন্য ১০ একর জায়গা বরাদ্দ, পুলিশ বাহিনীর অনকূলে পরিত্যক্ত জমি বরাদ্দ, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজির আবাসিক ভবন নির্মাণের বিষয় পুলিশের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে।
পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলছেন, জঙ্গি দমনে সরাসরি পুলিশের যেসব ইউনিট (বোমা নিষ্ফ্ক্রিয়করণ দল, সোয়াট ও কাউন্টার টেররিজম) কাজ করছে তাদের ২০০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতা দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত সদস্যরা ৩০ শতাংশ ঝুঁকি ভাতা পেয়ে থাকেন। তবে সবার জন্য ভাতার ব্যবস্থা করার কথা বলছেন সংশ্নিষ্টরা। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে আলাদা ব্যাটালিয়ন গঠন করতে চায় পুলিশ।
সাত মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা : এবার প্রথম পুলিশ সপ্তাহে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাতটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেবেন। মন্ত্রণালয়গুলো হলো- অর্থ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, জনপ্রশাসন এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেখানে এসব মন্ত্রণালয়ের সচিবরাও থাকবেন। আজ দুপুরে রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় আইসিসিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্মেলন, সন্ধ্যায় রাজারবাগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে। রাতে রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে সাত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক। বুধবার দুপুরে বঙ্গভবনে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
বৃহস্পতিবার মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইজিপির সম্মেলন ও শুক্রবার আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এগিয়ে চলেছে পুলিশ : পুলিশের বর্তমান সদস্য সংখ্যা দুই লাখ ৫ হাজার ৮৬০। এর মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার থেকে তদূর্ধ্বের পুলিশ কর্মকর্তা ২১ হাজার ৯৫৬, পরিদর্শক ৬ হাজার ৬২৮, উপপরিদর্শক ২৩ হাজার ৬৩২, কনস্টেবল এক লাখ ২৫ হাজার ৩৫৪ জন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশের নানা সমস্যার জট খুলতে থাকে। জনবল ঘাটতি দূর করার পাশাপাশি এসআই ও সার্জেন্ট পদকে তৃতীয় থেকে দ্বিতীয়, পরিদর্শক পদকে দ্বিতীয় থেকে প্রথম (নন ক্যাডার) পদে উন্নীত করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে শিল্প পুলিশ, নৌ পুলিশ, পুলিশ বুরে‌্যা অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নারী পুলিশ ব্যাটালিয়নসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট।
২০১৫ সালে পুলিশে ট্রাফিক সার্জেন্ট পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় গত বছর গঠন করা হয় ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট।’ এ ছাড়া পুলিশের একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের কার্যক্রমও শুরুর পথে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের পক্ষ থেকে নানা দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে কিছু দাবি পূরণ হয়, আবার কিছু পূরণের আশ্বাস পাওয়া যায়।
২০১৭ সালে পুলিশ সপ্তাহে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। তা হলো- থানা ও আলামত সংগ্রহের স্থান বাড়ানো, আবাসন সমস্যা নিরসন, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট গঠন, বিশেষায়িত ব্যাংক স্থাপন, থানাপ্রতি ৫টি পিকআপ ভ্যান, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নীতকরণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশের একজন লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, দুদক, পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষ, কারা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রেষণে কাজের সুযোগ। সূত্র: সমকাল

Leave a Reply