বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মতো নয়: সাখাওয়াত হোসেন

জুয়াইরিয়া ফৌজিয়া, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার: বাংলাদেশে তীব্র আন্দোলনের মুখে সামরিক শাসক জেনারেল হোসেন মো. এরশাদ ক্ষমতা ছেড়েছিলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। আওয়ামী লীগ, বিএনপি মতো প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সবাই তখন রাজপথে নেমেছিল। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল এরশাদ। পরে ৮ বছর তাকে কয়েকবার বড় ধরনের আন্দোলনের মুখে পড়তে হলেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়নি। কিন্তু বলা হয় ১৯৯০ সালে সামরিক বাহিনীর সমর্থন হারানোর পরই তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। এই বক্তব্যের সত্যতা কতখানি?
সে সময়ে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন সেনাবাহিনীর সাবেক একজন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন। বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এটা সম্পূর্ণ সত্য। কারণ ওই সময়ে যারা আন্দোলন করেছিল তারমধ্যে তৎকালীন বড় বড় ৩টি রাজনৈকিত দল ছিল। তখন এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছিল যখন সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নাকোজ করেছিল। শেষদিনে এরশাদ যখন আর্মি ডিক্লায়ার করতে চাইলেন তখন তৎকালীন আর্মি সেনারা সরাসরি না করে দিল। আর সেনাবাহিনীরা জেনারেল এরশাদকে বললো আপনি রাজনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করুন।
এরশাদ ৬ তারিখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় কিন্তু তার ১ থেকে ২ দিন আগেও তিনি বলেছিলেন, পদত্যাগ করবেন না। হঠাৎ করে সেদিন রাতে তিনি ঘোষণা দিলেন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। তাহলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে কী হয়েছিল যাতে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন?
জবাবে তিনি বলেন, আমি যেটা জানতে পেরেছি এবং ফাস্ট হ্যান্ড নলেজ থেকে বলছি, হোসেন মো. এরশাদের কাছ থেকে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও তৎকালীন সিডিএস যে ম্যাসেজ পেয়েছিল তাকে রেসকিউ করার জন্য পলিটিক্যালি অথবা সামরিক শাসনের মাধ্যমে সরাসরি নাকোজ করা হয়েছিল। এরশাদের কাছে যখন ম্যাসেজটি পৌঁছায় যে সেনাবাহিনী তাকে আর সার্পোট করছে না এবং তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে তখন তিনি সেটাই করেছিলেন।
জেনারেল এরশাদের আগে চাপের মুখে পড়েছিলেন তখনও রাজনৈতিক দলগুলো এক হয়েছিল, রাজপথে বড় রকমের আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেগুলি তিনি ঠিকই সারভাইভ করেছেন কিন্তু ১৯৯০ সালে এসে রাজনৈতিক আন্দোলনকে কেন সামাল দিতে পারলো না এবং কী এমন হয়েছিল যে সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল?
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মতো নয়। এমন অনেক দেশ আছে যেখানে তারা তাদের নিজেদের জাতি-গোষ্ঠীর মধ্য থেকে সেনাবাহিনী নির্বাচন করে। তাছাড়া এই সেনাবাহিনীর প্রত্যেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন সাধারণ পরিবার থেকে এসেছে। কাজেই এদের পরিবার যখন এ্যাফেকটেড হয়ে যায় তখন কিন্তু সমগ্র সেনাবাহিনীই এফেকটেড হয়ে যায়। আর যখন রাজনৈতিক আন্দোলন চলে যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষ একটি রিজিয়ুমের বিরুদ্ধে থাকে তখন স্বভাবতই তার পক্ষে থাকা সম্ভব হয় না। ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের ওপর যে চাপ এসেছিল সেই চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কী তার ছিল না?
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেনারেল এরশাদের লাস্ট ট্রাম্পকার্ড ছিল সামরিক বাহিনীর সমর্থন। সেটা যখন কাজ করল না তখন তিনি বাধ্য হলেন পদত্যাগ করতে। এরশাদ কিন্তু ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখেও বলেছিলেন পদত্যাগ করবেন না। পরবর্তী পর্যায়ে সামরিক বাহিনী যখন শেষ কথা বলে দিল তখনই কিন্তু তিনি পদত্যাগ করলেন। জেনারেল এরশাদের পদত্যাগ নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে ইউনিটি কতখানি ছিল, সবাই কী ইউনাইটেড ছিল?
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরশাদ সাহেব সামরিক বাহিনীকে লুক আফটার করে চলতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সহনুভূতি এক জিনিস আর রাজনীতি আর এক জিনিস। আমরাও চেয়েছি তিনি চলে যাক তবে তার ক্ষতি হোক সেটা চায়নি। সূত্র- বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*