সাবধানে চালাবো গাড়ী-নিরাপদে ফিরবো বাড়ী

আবছার উদ্দিন অলি, ১৭ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার: বাসা থেকে বের হলেই যেন মনের মধ্যে ভয় জাগে। এই বুঝি কোনো দূর্ঘটনার মুখোমুখী হচ্ছি কিংবা দূর্ঘটনার কোনো দু:সংবাদ আসছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলে দূর্ঘটনার সংবাদ দেখতে দেখতে মনকে আর ভালো রাখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সড়ক দূর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণহানি হচ্ছে, আবার কেউবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে। একটি দূর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না। কোন ভাবেই দূর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। দ্রুত গতি পরিহার করি-সড়ক মুক্ত দেশ গড়ি। আমি আপনি সচেতন হলে সড়ক দূর্ঘটনা যাবে কমে। এ বিষয়ে সভা, সেমিনার, মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, তদন্ত কমিটি সবকিছু হলেও কার্যত ফলাফল শূন্য। এভাবে সড়ক দূর্ঘটনা মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হবে, তা আমরা কেউ বলতে পারি না। এ নিয়ে কোন আশ্বাসের বাণীও শুনছিনা। বর্ষার অতি বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও সড়ক মহাসড়কে এমনকি পাড়া মহল্লার অলি-গলিতে রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে দূর্ঘটনা ঘটে চলেছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় দূর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ১ হাজার ৯৬০ এর বেশি। সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু জনিত কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও কম না। দূর্ঘটনা এড়াতে সরকার মহাসড়কে টেক্সী চলাচল বন্ধ করলে অন্যদিকে গণপরিবহন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে মহাসড়কে গাড়ী চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারী করা প্রয়োজন ছিল। সবকিছুতেই সমন্বয়হীনতা বাস্তব চিত্র ফুটে উঠছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেডের গবেষণা অনুযায়ী মাদকাসক্ত চালকের কারণে দেশে ৩০ শতাংশ সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে। মালিক, চালক ও সরকার এই তিন পক্ষকে দূর্ঘটনা বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এক হতে হবে এবং কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দূর্ঘটনা ঘটলে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে এই দায় এড়ানো যাবে না। অনভিজ্ঞ ড্রাইভার, এক ড্রাইভার দিয়ে দৈনিক ১৮ঘন্টারও বেশি সময় গাড়ী চালানো, হেলপার দিয়ে গাড়ী চালানো, ফিটনেস বিহীন গাড়ী চলাচল এবং রাস্তার বেহাল দশা, মহাসড়কে দূরপার্লার গাড়ীর সাথে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ভ্যানগাড়ী, ঠেলাগাড়ী, ট্রাক্টর, রিক্সা, টেক্সী, সাইকেল, মোটরগাড়ী, লবণবাহী গাড়ী ইত্যাদি চলাচলের কারণে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনা ঘটছে।
সড়কে নিরীহ পথচারী, সবচেয়ে অরক্ষিত সড়ক ব্যবহারকারী, তাকে কোনো গাড়ি আঘাত করলেই পরিণতি খুব খারাপ হয়। ৫৮ শতাংশ পথচারীই রাস্তায় মারা যাচ্ছে। মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ শতাংশ। পশ্চাতে যে সংঘর্ষটা হয়, সে ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ এবং গাড়ি উল্টে রাস্তা থেকে পড়ে গিয়ে আরও ৯শতাংশ মারা যায়। পথচারীর স্বভাবতই সুরক্ষা থাকে, যখন সে হাঁটে, তখন কিন্তু একটা যানবাহন এসে তাকে আঘাত করতে পারে না। এটাই রীতি। পথচারীর জন্য যে পথটা বরাদ্দ থাকে, সেটা হলো একটা ফুটপাত এবং রাস্তা পারাপার করার জন্য নিম্নতম পর্যায়ে হচ্ছে জেব্রা ক্রসিং এবং উচ্চমানের নিরাপদ হচ্ছে ওভারপাস অথবা আন্ডারপাস। আমরা দেখি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তা পার হতে গিয়ে লোকজন মারা যাচ্ছে এবং বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ মারা যাচেছ হাঁটতে গিয়ে।
জাতীয় মহাসড়কে আমাদের সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে ২৩ শতাংশ। আঞ্চলিক মহাসড়কে ১২ শতাংশ আর স্থানীয় সংযোগ (ফিডার) সড়কে ১৫ শতাংশ। জাতীয় সড়কে সবচেয়ে বেশি দূর্ঘটনা ঘটছে। সেটা ফুটপাত দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং দায়িত্ববান চালক যদি তৈরি করা যায়, তাহলে ৭০ শতাংশ সড়ক দূর্ঘটনা রোধ করা যাবে। সংকেত চিহ্নগুলো দিলেই চালকেরা যে মানছেন, এটাও কিন্তু নয়। কারণ, অনেক সময় তিনি জানেনও না যে এই সংকেত বা চিহ্নগুলোর মানেটা কী এবং এই জায়গায় তাঁকে কীভাবে গাড়ি চালাতে হবে। বিষয়গুলো তাঁরা কিন্তু শিখতে পারছেন না। আধুনিকভাবে যে চালক তৈরি করা হয়, ওই ধরনের প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে একেবারেই নেই। সচেতনতার কথা যে আমরা বলছি, সচেতনতা কী? আমি যদি না-ই জানি যে আমাকে কীভাবে গাড়ি চালাতে হবে, তাহলে আমি সচেতন হব কী করে।
আমাদের দেশে বাণিজ্যিক গাড়ি হচ্ছে বাস ও ট্রাক। প্রস্তুতকারকেরা বাসগুলোতে যেভাবে সিটসংখ্যা বসান, মালিকেরা তার থেকে কিন্তু আরও বেশি করে ফেলেন। এতে ভেতরে যে নিরাপদ সিট হওয়ার কথা, সেটা হয় না। এগুলোতে দূর্ঘটনা ঘটার পর পরিণতি অনেক মারাত্মক হয়। বাসের ওপর কোনো রেলিং লাগানো মূল প্রস্তুতকারকেরা অনুমোদন করেন না। ওপরে অতিরিক্ত ওজন নিলেই বাস কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ট্রাকের ক্ষেত্রেও লোড বেশি করার জন্য লম্বা ও চওড়া করা হচ্ছে এবং উচ্চতাও বাড়ানো হচ্ছে। ওভারলোডিং কিন্তু চালক, গাড়ি ও রাস্তার জন্য খারাপ এবং ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি মারাত্মক হচ্ছে ট্রাকের দুই পাশে তিনটি তিনটি করে যে অ্যাঙ্গেল লাগানো হয়েছে এটা একটা মারণাস্ত্রের মতো বাসের সবচেয়ে দূর্বল অংশ জানালায় আঘাত করে মানুষসহ সবকিছু ছিঁড়ে ফেড়ে নিয়ে যায়।
আমাদের দেশে যত লোক মারা যায়, তার ৫০ ভাগ মারা যায় দূর্ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যে। বাকি ১৫ ভাগ মারা যায় চার ঘন্টার মধ্যে এবং ৩৫ ভাগ মারা যায় হাসপাতালে। ৫০ ভাগ মারা হচ্ছে পুরোপুরি চিকিৎসার ব্যবস্থাপনার অভাবে। আমরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা বা ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে পারলে এদের হয়তো বাঁচানো সম্ভব। দরকার কিছু ফার্ষ্ট রেসপন্ডার তৈরি করা। অর্থাৎ দূর্ঘটনা যে জায়গায় ঘটবে, সে জায়গায় যদি চিকিৎসা দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে পারা যায়, তাহলে হয়তো অনেক লোককে বাঁচানো যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ের কর্মী তৈরি করতে পেট্টোল পাম্প, সিএনজি ষ্টেশন বা স্থানীয় ওষুধের দোকানগুলোতে যারা কাজ করে, তাদের প্রশিক্ষিত করে ফার্ষ্ট রেসপন্ডার করতে পারি। অথবা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।
উল্লেখিত বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে সড়ক দূর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। গাড়ীর চালককে গাড়ী চালানো অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ড্রাইভারকে শিক্ষিত হতে হবে। কারণ তার একজনের খাম খেয়ালীপনার কারণে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দূর্ঘটনা। তাই সবার আগে ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সড়ক দূর্ঘটনার বিষয়ে বাস্তব ধারনা দিতে হবে। মহাসড়কে গাড়ী চলাচলের নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। হঠাৎ হঠাৎ নতুন নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে জনসাধারণকে ভোগান্তিতে না ফেলে বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যাত্রা এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের এবারের স্লোগান ‘সাবধানে চালাবো গাড়ী-নিরাপদে ফিরবো বাড়ী’। লেখকঃ সাংবাদিক ও গীতিকার

 

Leave a Reply