কারবালা ট্র্যাজেডি

আ ব ম খোরশিদ আলম খান, ৩০ সেপ্টম্বর ২০১৭, শনিবার: ১০ মহররম অতীব মহিমান্বিত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। বিশ্ব ইতিহাসে নানা চমকপ্রদ ঘটনা-দুর্ঘটনা ও ট্র্যাজেডির জন্য এই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। আশুরা মানে দশমী। পবিত্র মহররম মাসের দশম তারিখে বিশ্ব ইতিহাসে নানা উত্থান পতন ঘটেছে। এই দিনে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ পাক সমগ্র সৃষ্টি জগত। আবার আশুরা দিবসেই বিনাশ ঘটবে সৃষ্টি জগতের। সংঘটিত হবে কিয়ামত বা মহাপ্রলয়। অন্যদিকে ৬১ হিজরিতে প্রিয় নবীর (দ) দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ও আহলে বায়তে রাসূলকে কারবালার ময়দানে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নৃশংস কায়দায় খুন করা হয়। প্রসিদ্ধ সাহাবি ওহি লেখক হযরত আমিরে মুয়াবিয়ার (রা) অযোগ্য দুষ্ট অবাধ্য সন্তান অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নিষ্ঠুর-পাষাণ চরিত্রের অধিকারী ইয়াজিদ কারবালা ময়দানে নবী পরিবারের ওপর যে জঘন্য নৃশংসতা চালিয়েছে বিশ্ব ইতিহাসে এর কোনো তুলনা নেই। মধ্যযুগীয় বর্বরতা অর্থাৎ চেঙ্গিস খানের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ, মুসোলিনি ও হিটলারি স্টাইলের বর্বরতা ইয়াজিদি নৃশংসতার কাছে খুবই নস্যি। মধ্যযুগে ও হিটলারি শাসনকালে লক্ষ লক্ষ ইহুদির প্রাণ গেছে সত্য, কিন্তু কারবালায় যেভাবে যে ধরনের নিষ্ঠুরতার খেলা ঘটেছে আহলে বায়তে রাসূলের (দ) নিষ্পাপ সদস্যদের ওপর এর সঙ্গে আর কিছুর তুলনা চলেনা। হিটলার শর্টকার্টভাবে নিরীহ মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। সে পানির কষ্টে ফেলে এবং ক্ষুধায় মানুষ মারেনি। কিন্তু পিশাচ ইয়াজিদ অবুঝ শিশুদের এমনকি আহলে বায়তে রাসূলের (দ)পূত পবিত্র রমণীদের পানীয় ও খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে তৃষ্ণায়-প্রচন্ড ক্ষুধায় এবং নির্দয়ভাবে খুনের উল্লাস করে ইতিহাসে নির্মম ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছে।
আশুরা দিবসটি নানা কারণে স্মরণীয়। চারটি মহিমান্বিত ফজিলতপূর্ণ মাসের মধ্যে রয়েছে মহররম মাসও।এই মাসগুলোতে আরবে জাহেলিয়া যুগেও শান্তি বিরাজ করতো। যুদ্ধ-সংঘাত মহররম মাসেও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু মুসলমান নামধারী হয়েও ইয়াজিদ মহিমান্বিত মহররম মাসে আশুরা দিবসে নবী পরিবারের ওপর বর্বরতা-নৃশংসতা চালাতে একটুও দ্বিধা করেনি। ইয়াজিদ, উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ ও সীমার হযরত ইমাম হোসাইন (রা ) সহ আহলে বায়তে রাসূলের নির্দোষ নিরপরাধ মানুষের ওপর কারবালা ময়দানে যে জঘন্য নৃশংসতা চালিয়েছে তা বিশ্ব ইতিহাসে কলংকজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ইয়াজিদ অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্রমূলক কায়দায় মসনদে বসে হযরত ইমাম হোসাইন (রা) কে বশ্যতা স্বীকার করার এবং তার শাসনে হস্তক্ষেপ না করতে নানা ভয়ভীতি দেখায়। প্রলোভন, ভীতি প্রদর্শন, মৃত্যু পরোয়ানা সব পথ ইয়াজিদ খোলা রেখেছিল হযরত ইমাম হোসাইন (রা) কে তার শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য। ইয়াজিদ ছিল একজন মদ্যপ, ব্যভিচারি, জালেম শাসক। ইসলামের নামে নানা অবৈধ রীতি নীতির বৈধতা দেয়া এবং জনগণের ওপর জুলুমকারী ফাসেক ব্যক্তির বশ্যতা স্বীকার মানে ইসলামের কবর রচনা করা। ইয়াজিদের এই ঘৃণ্য তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা)। সপরিবারে ইয়াজিদ গোষ্ঠীর হাতে নির্দয় নির্মম ও নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করলেন, তবুও ইয়াজিদের কাছে মাথা নত করেননি। ভয়ভীতি ও প্রলোভনেও দমে যাননি আহলে বায়তে রাসূল (দ) ও ইমাম হোসাইন (রা) । ইয়াজিদি নির্মমতা সত্ত্বেও সত্য-ন্যায়ের পথ থেকে এক চুল পর্যন্ত টলাতে পারেনি হযরত ইমাম হোসাইন (রা) কে। হাসিমুখে মূল্যবান জীবন দিয়েছেন, কিন্তু অন্যায়, মিথ্যা ও জুলুমবাজের সঙ্গে কোনো আপস করেননি হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ।
আজকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে আমরা নানাভাবে নীতি নৈতিকতার বিসর্জন দেই। কিন্তু হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ক্ষমতার হাতছানি উপেক্ষা করে ইসলামের শান্তি,ন্যায়পরায়ণতা, ইনসাফ ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন ইয়াজিদি বাতিল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।কারবালার যুদ্ধে নবী পরিবারের খুনের সিঁড়ি বেয়ে মসনদ দখল রাখতে চেয়েছিল ইয়াজিদ।কিন্তু তার মসনদের ভিত কারবালার ঘটনার মাধ্যমে প্রচন্ড বাধা ও প্রতিরোধের মুখে পড়ে। খুন হত্যা চালিয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা যায় না, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মসনদে আসীন থাকা মুশকিল হয়ে পড়েÑ ৬১ হিজরিতে সংঘটিত কারবালার ঘটনার এটাই শিক্ষা।
দশই মহররম হযরত আদম (আ) কে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়। তাঁর জান্নাতে অবস্থান, পৃথিবীতে পাঠানো এবং দীর্ঘকাল পর তওবা কবুল করা হয়। এই দশই মহররমের দিনে হযরত নূহ (আ) এর উম্মেতেরা তাঁর বশ্যতা না মানা এবং আল্লাহর একত্ববাদে দীক্ষিত না হওয়ার অপরাধে মহাপ্লাবনের মুখে পড়ে। যারা হযরত নূহ নবীর নৌকায় অবস্থান নেয় তারা ছাড়া বিরুদ্ধবাদী সকলেই মহাপ্লাবনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ৪০ দিন নৌকা ভাসার পর জুদি পাহাড়ে অবস্থান করে এই দশই মহররম দিবসে। হযরত ইদ্রিস (আ) কে বিশেষ মর্যাদায় আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয় এই দিনে। হযরত ইব্রাহিম (আ) খলিলুল্লাহ তথা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে খেতাবপ্রাপ্ত হন আশুরা দিবসে। ৪০ বছর পার হওয়ার পর হযরত ইউসুফ (আ) পিতা হযরত ইয়াকুব (আ) এর সাক্ষাত পান এই মহিমান্বিত দিনে।নবী হযরত আইয়ুব (আ) দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি কুষ্ঠরোগে ভোগার পর আরোগ্য লাভ করেন আশুরা দিবসে। ৪০ দিন মাছের পেটে থাকার পর হযরত ইউনুস (আ) মুক্তি পান এই দিনে।নবী হযরত সোলায়মান (আ) অত্যন্ত প্রতাপশালী শাসক ছিলেন। ঘটনাক্রমে রাজত্ব হারানোর পর আবার ফিরে পান আশুরার এই দিনে। হযরত ঈসা (আ) জন্ম লাভ করেন আশুরা দিবসে। ইহুদিরা তাঁকে হত্যা করার জন্য দুরভিসন্ধি সৃষ্টি করলে আল্লাহ পাক তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেন আশুরা দিবসে। হযরত মুসা (আ) তুর পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছিলেন তাও এই দিনে। মহান আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আ) ও তাঁর অনুসারী বনি ইসরাইলিদেরকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করে পানির মধ্যে রাস্তা বানিয়ে পার করে দেন এবং দুঃশাসক ফেরাউনকে সদলবলে ডুবিয়ে মারেন ১০ মহররম তথা আশুরার দিনে। এভাবে অনেক ঘটনা ইতিহাসের সাক্ষী এই আশুরা।আশুরা উপলক্ষে অতীব সওয়াবের আশায় মুসলমানেরা রোজা রাখেন। প্রিয় নবী (দ) বলেছেন, মাহে রমজানের রোজার পরে আল্লাহর নিকট মহররম মাসের রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ( সহি মুসলিম :১/৩৮৮)।
আসুন আমরা আশুরা ও কারবালার চেতনায় ঘুরে দাঁড়াই। দেশ ও সমাজে বিরাজিত সকল অরাজকতা , অবক্ষয়- অন্যায়- অনৈতিকতা রুখে দেই কারবালার চেতনায়। সত্য, ইনসাফ,মানবতা ও গণকল্যাণের পথকে মসৃণ করে উভয় জগতে পরিত্রাণের সৌভাগ্য অর্জনে এগিয়ে আসি। যুগে যুগে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগায় কারবালা। লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

 

Leave a Reply