আমদানিকারকরা সব চাল এম হোসেন ট্রেডার্সের কাছেই বিক্রির করায় সংকট সৃষ্টি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৭ সেপ্টম্বর ২০১৭, বুধবার: অস্থির চালের বাজারে অসহায় হয়ে পড়েছে সরকার এবং ক্রেতারা। দিনে দিনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে চট্টগ্রামের চালের বাজার। মোটা চাল, চিকন চাল সব রকম চালের দামই দুই থেকে তিন টাকা করে বাড়ছে প্রায় প্রতিদিন। গত এক সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা। খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতারা এ জন্য সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন। অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা আদায় করছেন। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি অভাবে সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে অবৈধভাবে হঠাৎ বড় লোক বনে যাচ্ছে এসব অসাধু ব্যবসায়ী। তবে বরাবরের মতোই প্রশাসনকে খোঁড়াযুক্তি দেখাচ্ছেন এসব ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, দুই মাস আগে বন্যার কারণে বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি করে প্রায় হাজার কোটি টাকা লোপাট করে সিন্ডিকেট। তখনও ১৬ হাজার মিল মালিককে কালো তালিকাভুক্ত করলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে চাল সিন্ডিকেট। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও সেই সিন্ডিকেট চক্র থেমে নেই। এই চক্র আবারও হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করতে বাজারে সক্রিয়। কিন্তু সরকার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে মুখেই শুধু হুঙ্কার দিচ্ছে।
সূত্র জানানয়, চট্টগ্রামে চাল নিয়ে চালবাজির মুলে রয়েছে খাতুনগঞ্জের এম হোসেন ট্রেডার্স। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. শামসুল আলম ও মো. ইব্রাহিম। আমদানিকারক এস আলম গ্রুপ এবং দেশবন্ধু কাছ থেকে ৮৫ হাজার টন (১৭ লাখ বস্তা) চিকন ও মোটা চাল কিনে নেয় খাতুনগঞ্জের এম হোসেন ট্রেডার্স। এই প্রতিষ্ঠান এসব চাল কেনার পরপরই চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জের চালের বাজার অস্থির হয়ে উঠে। পাইকারি চালের বাজারে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ১৭০ থেকে ২২০ টাকা দাম বাড়িয়ে দেয় ওই প্রতিষ্ঠান। ৮৫ হাজার টন চাল বিক্রি করে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মো. শামসুল আলম ও মো. ইব্রাহিম।
সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার টন (১০লাখ বাস্তা) বার্মার আতপ চাল আমদানি করে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ। আমদানিকারকের কাছ থেকে এসব চাল প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ১৫ শত ৫০ টাকা দরে কিনে নেয় এম হোসেন ট্রেডার্স। এই প্রতিষ্ঠান প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) পাইকারি দোকানিদের কাছে বিক্রি করছেন ১৭ শত ৭০ টাকা দরে। প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ২২০ টাকা মুনাফা আদায় করেছেন এম হোসেন ট্রেডার্স। এতে এ প্রতিষ্ঠানের বাড়তি মুনাফা হয় প্রায় ২২ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, ভারত থেকে ৩৫ হাজার টন (৭ লাখ বস্তা) মিনিকেট সিদ্ধ চাল আমদানি করে রাজধানীর প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ২ হাজার ৮০ টাকা দরে কিনে নেয় এম হোসেন ট্রেডার্স। এ প্রতিষ্ঠান কিছু চাল জাহাজ থেকে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ২১ শত ২৫ টাকা দরে পাইকারি দোকানিদের কাছে বিক্রি করে। এরপর এ প্রতিষ্ঠান জাহাজ থেকে সব চাল গোদামজাত করে ফেলে। গোদাম থেকে প্রতি বস্তা চাল (৫০ কেজি) পাইকারি দোকানিদের কাছে বিক্রি করছেন ২২শত ৫০ টাকা দরে। এতে ১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করছেন এম হোসেন ট্রেডার্স।
এম হোসেন ট্রেডার্সের অন্যতম স্বত্ত্বধিকারী শামসুল আলম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চালের ব্যবসা করিনা। তৈল ও চিনির ব্যবসা করি। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম স্বত্ত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম এর সাথে এ বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। জানতে চাইলে এম হোসেন ট্রেডার্সের অন্যতম মালিক মো. ইব্রাহিম জানান, সব চাল আমি বিক্রি করে দিয়েছি। বাড়তি দামে আমি চাল বিক্রি করছি এটা ঠিক নয়। আমার কেনা চালের মধ্যে ৪টন কম হয়েছে। গুদাম ভাড়া, গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিকদের বেতন দেয়ার পর আমার মুনাফা করতে হবে।
ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমদানিকারকরা এক প্রতিষ্ঠানের কাছেই সব চাল বিক্রির করায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমদানিকৃত চাল যদি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হতো, তা হলে ওই প্রতিষ্ঠান সুযোগ নিতে পারত না। এখন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের সব পাইকারি দোকানিকে জিম্মি করে ফেলেছে এ প্রতিষ্ঠান। এতে প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির এক শীর্ষ নেতা এসব কারসাজির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এম হোসেন টেডার্স সব চাল বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে গেছেন। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরকার নির্দিষ্ট সময়ে ব্যবস্থা না নেয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধেও কারসাজির আঙ্গুল তুলেছেন অনেক ব্যবসায়ী। এম হোসেন ট্রেডার্স থেকে ১৩ হাজার টন (২লাখ ৬০ হাজার বস্তা) চাল কিনে নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছেন তিনি। তার কাছ থেকে কেনার একদিন পর বাড়তি দামের জন্য চাল ডেলিভারী না দেয়ার গুরুতর অভিযোগ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী। তিনি বাজারে পর্যাপ্ত চাল না থাকার সুযোগ নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে সদাই বাতিল (বিক্রি বাতিল) করেছেন। পরে তিনি প্রতি (৫০ কেজি) বস্তা ২ হাজার ৪শত টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। এতে প্রতি (৫০ কেজি) বস্তায় ৩শত টাকা বাড়তি মুনাফা আদায় হয়েছে তার। এ হিসেবে ১৩ হাজার টন (২লাখ ৬০ হাজার বস্তা) চাল বিক্রি করে অন্তত ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা মুনাফা করার টার্গেট নিয়েছেন তিনি।
চট্টগ্রাম চাক্তাই ধান-চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনামুল হক বলেন, দুইটি কারণে চালের দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টনে ৩০ থেকে ৫০ ডলার দাম বেড়েছে। এখানে এর প্রভাব পড়েছে। ঈদুল আযহার পর যে গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে এতে চালের দাম বেড়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫ থেকে ৭টাকা দাম বেড়েছে। খোলা বাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রম (ওএমএস) চালু হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে বলে তিনি মত দেন। তিনি বলেন, কেউ কেউ চাল আমদানি করেছে আগে। এসব চাল গোদামজাতের মাধ্যমে বাজারে সংকট সৃষ্টি করে এখন দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। এক আমদানিকারক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টন চাল গোদামজাত এখন চড়াদামে বিক্রি করছেন। এসব বিষয় সরকারের নজরদারির মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক চাল ব্যবসায়ী জানান, সরকারের কাছে চালের মজুদ না থাকার বিষয়টি ব্যবসায়ীরা জেনে গেছেন। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন।
অস্থিতিশীল চালের বাজার। নাভিশ্বাস সাধারণের। সাধারণ খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের প্রতিনিয়ত শংকা করছেন রাত পোহালেই বুঝি শুনতে হবে চালের দর আবারও বেড়েছে। কিন্তু এর আগেই ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই আশা করছেন সাধারণ জনগণ।

Leave a Reply