জ্যোর্তিন্ময়ী মহাশক্তি মা দূর্গা

লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই, ২৬ সেপ্টম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার: মানুষ বর্তমানের দাস। তার অর্থনীতি, সমাজনীতি এমনকি আনন্দ উৎসব গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় বর্তমান পরিবেশ ও পরিস্থিতির মানদন্ডে। ফলে কাল যা সম্ভব ছিল আজ তার অন্যথা হওয়াও বিচিত্র নয়। তাই অনেকের মতে সামাজিক রূপ কোন দিনই এক থাকেনা। তার জন্ম আছে, মৃত্যু আছে, যুগে যুগে কালে কালে তাকে নতুন রূপে আসতে হয়।
বর্তমান হচ্ছে অতীতের ফলশ্র“তি এবং ভবিষ্যতের দিক দর্শন যন্ত্র। রুধির ধারা যেমন গোপন থেকে সমস্ত শরীরে রক্ত সঞ্চার করে অতীতও তেমনি কোন সমাজের গতি প্রকৃতিকে পরিচালিত করে। এই যুগসুত্রটি সর্বদা দৃশ্যমান না হলেও যোগ যে আছে তা নিশ্চিত।
শ্রী শ্রী চন্ডিতে মহামায়ার স্বরূপ সম্পর্কে বলা হয়েছে জীবের বন্ধন ও মুক্তি তারই নিয়ন্ত্রনে। উপাসকের ধ্যান-ধারণা অনুসারে দিব্যরূপ ধারণ করে দূর্গা, কালী, জগদ্বাত্রী প্রভৃতি নামে পুজিতা হয়ে থাকেন। দেবী ভগবতে মহামায়া, পরমাত্মা এবং মা ভগবতী নামে সমাদৃতা, কালীকা পুরানে যিনি যোগীগনের যন্ত্রের মর্মোদঘাটনে তৎপর তিনিই “মহাশক্তি জগন্ময়ী”। যেমন বীজ নিঃসৃত অংকুরের ক্রমবিকাশ মেঘের জলে হয় তেমনি উৎপন্ন জীবের ক্রমপুষ্টিওসাধন করে থাকেন। সেই সর্বসৃজনই তার সৃষ্টি। আদ্যাশক্তি মহামায়ার দ্বি-ভাবে প্রচলিত আছে তার কাহিনীসত্ত্বা। একেতো:- দেবী দেবতেজ সম্ভূতা, জ্যোর্তিন্ময়ী, তেজোরূপা, অসুরঘাতিনী। সেই ক্ষেত্রে তিনি বৈদিক দিব্য সরস্বতীর স্বগোত্রা। দ্বিতীয়ত: তিনি দক্ষ তনয়া, জন্মান্তরে হিমালয় নন্দিনী ও দৈত্যনাশিনী। উভয় ভেদেই তিনি শিবশক্তি, শিবমায়া, মহাশক্তি চন্ডী, বিষ্ণুমায়া ও বিষ্ণুর যোগনিদ্রা, প্রকৃতপক্ষে তিনি মহাশক্তি ও সকল দেবতার শক্তি।
দূর্গাপূজা বাঙালী হিন্দুদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় ধর্মোৎসব।
“সর্বস্য বুদ্ধিরূপেন জনস্য হৃদি সংস্থিতে, স্বর্গা পবর্গদে দেবী নারায়নি নমোহস্ততে;” দুর্গ থেকে দূর্গা শব্দের উৎপত্তি। দূর্গ বলতে সাধারণতঃ আমরা বুঝি, সৈনিকরা যে গৃহে বাস করে, সেই গৃহকে দূর্গ বলে। ইংরেজীতে বলে ক্যান্টনমেন্ট। প্রতিটি দেশে প্রতিরক্ষার জন্য একাধিক ক্যান্টনমেন্ট বা দূর্গ থাকে। দূর্গ হলো শক্তির আঁধার। দূর্গে থাকে প্রতিরক্ষার জন্য সকল প্রকার শক্তি। যেমন- বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, আধুনিক সমরাস্ত্র, মরণাস্ত্র ও সামরিক ব্যক্তিবর্গ। পঞ্চভূতের দেহ প্রতিটি মানুষের, ক্ষিতি-ধৈর্য্য, অপ-সারল্য, তেজ-শক্তি, মরুৎ-চলন, ও ব্যোম-উদারতা। মানুষ নিজে আত্মরক্ষার জন্য পঞ্চভূতের দেহে ভিতরে বাহিরে শক্তি সাহসের একটি অভেদ্য দূর্গ সৃষ্টি করে থাকে। আর এ দূর্গই হল সুকঠিন চরিত্রের প্রকাশ যার নাম ব্যক্তিত্ব। অমানুষের পর্যায়ে পরে ব্যক্তিত্বহীন মানুষ। পঞ্চভূতের দেহআত্মার মহাশক্তি হল তেজ। এই তেজ হলো ব্রহ্মশক্তি। ব্রহ্ম এবং শক্তি হল অভেদ্য। এই দেহ দূর্গে যিনি অবস্থান করেন তিনিই দূর্গা, তেজময়ী মাতা, মহামায়া, জগজ্জননী, মাহেশ্বরী ও ভূবনেশ্বরী।
দেহাভ্যন্তরে আমাদের হৃদরাজ্যে সুরক্ষিত দূর্গে তরল চন্দ্রিকার উজানমূখী অমিয়ধারার øাত মা দূর্গা সদা বিরামিত ও অবস্থান আছেন। মনগঙ্গার দু’কাল প্লাবিত তরঙ্গেঁ তরঙ্গিঁত ও লোহিত রক্তে রঞ্জিত, সহস্রদল পদ্ম মধ্যে অর্ধভাসমান, অর্ধশায়িত, অর্ধনিদ্রিত ও অর্ধজাগ্রত অবস্থায় অবস্থানরত। মহাদেবী মা দূর্গা তিনিই পরমব্রহ্মা মহাশক্তি তেজোময়ী বিবেকানন্দ। বিপদত্তারিনী, কৃপাময়ী যা দূর্গা নিজেই বলেছেন “অহংরাষ্ট্রি” অর্থাৎ জগৎজননী নিজেই এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিপতি। কাজে রাষ্ট্র বা রাজ্য পরিচালনার জন্য যে সকল শক্তির দরকার, সে সকল শক্তি নিয়ে, দূর্গাতিনাশিনী মা শরৎকালীন শারদীর দূর্গোৎসব ও বসন্তকালীন বাসন্তী পূজাস্থলে আর্ভিভূত হন। ধনশক্তি লক্ষ্মী, জ্ঞানশক্তি সরস্বতী, জনগনশক্তি গনপতি ও সমরশক্তি কার্তিক এদেরকে নিয়ে আবিভূত হন, রাজ্য পরিচালনার জন্য এই চারটি কাঠামোই প্রয়োজন।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে, মা দূর্গার কাছ থেকে এটাই শিক্ষনীয় যে, আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে দূর্গতিনাশিনী দূর্গা শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের দেহাভ্যন্তরে রাজ্যের রাজা হয়ে সকল প্রকার ষড়রিপু কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, অসুরুদের ধ্বংস করে সকল প্রকার অপশক্তি কে দূরীভূত করে ধর্মে ও কর্মেসিদ্দি লাভ করে বিজয়ী বীর হওয়া সম্ভব। তাই তো সর্বস্তরের জনগনের প্রতি অনুরোধ সব হিংসা বিদ্বেষ ভূলে গিয়ে সম্প্রীতির রঙে মনকে রাঙিয়ে আমরা জগত জননীকে নতশিরে প্রণাম জানিয়ে বলি “প্রসীদ জননী প্রসীদ” হে মহাশক্তি জননী তুমি আমাদের প্রতি প্রসন্ন হও। সকলের প্রতি রইল শারদীয় দূর্গোৎসবের আন্তরিক শারদ শুভেচ্ছা।

 

Leave a Reply