বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে ত্রিমুখী সংকটে সরকার

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৩ সেপ্টম্বর ২০১৭, শনিবার: বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে ত্রিমুখী সংকটে সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক শ্রেণির কর্মকর্তার ব্যবসায়ী মনোভাবে এ সংকট তৈরি হয়েছে। এনসিটিবির অযৌক্তিক শর্তারোপে মঙ্গলবার থেকে একযোগে সব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির বই ছাপা, বাঁধাই, বিতরণের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বই ছাপার সব কার্যক্রম। এসব কারণে ১লা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। দৌড়ঝাঁপ করেও এ সংকট নিরসন করতে পারেনি এনসিটিবি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সংকট দূর হবে না বলে জানিয়েছেন মুদ্রণ সমিতির নেতারা। কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে ডেকে কাজ দেয়া, টেন্ডারের বাইরে নতুন শর্তারোপ, নির্দিষ্ট সময়ে ওয়ার্ক অর্ডার দিতে না পারা, প্রাথমিকে বই বাঁধাইয়ে নতুন শর্ত এবং নবম-দশম শ্রেণির সুখপাঠ্য বইয়ের কাজ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে এ সংকট ঘনীভূত হয়েছে বলে জানা গেছে। এনসিটিবি ও মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা বলছেন, কালো তালিকাভুক্ত ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে রীতিমত তোপের মুখে এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য।

এনসিটিবির নিয়োগ করার ইন্সপেকশন এজেন্ট বালটিক বিডি লিমিটেড পরিদর্শন করে নিজস্ব প্রেস ও বাঁধাইখানা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। সেই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে প্রথমারের মতো ছাপাতে যাওয়া নবম দশম শ্রেণির সুখপাঠ্য সম্পূর্ণ রঙিন বইয়ের কাজ বিতর্কিত পেতে যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। নানা শর্ত ভঙ্গের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছে। ১৭ই আগস্ট সুখপাঠ্য বইয়ের টেন্ডার করেও এখন বোর্ড মিটিং করতে পারেনি এনসিটিবি। এর মধ্যে এসব বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে ডেকে মৌখিকভাবে কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এনসিটিবির একজন সদস্য। বিষয়টি জানতে পারে চেয়ারম্যানকে এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি ফয়সালা করার আলটিমেটাম দেয় মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ওইসব বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান কাজ পেতে আরো মরিয়া হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ধর্মঘটে যায় মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা। এরপরই নড়েচড়ে বসে এনসিটিবি। মুদ্রণ শিল্প সমিতির কোনো কোনো ব্যবসায়ীকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন দেয়া হয় এনটিসিবি থেকে। প্রস্তাব আসে কাজ পাইয়ে দিয়ে আপস করার। এ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ধর্মঘটে যায় তারা। এর মধ্যে এনসিটিবির কর্মকর্তারা দিনভর বৈঠক করেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। এনসিটিবির চেয়ারম্যান নিজেও মুদ্রণ শিল্প সমিতির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফায় কথা বলে ধর্মঘট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ স্লোভেনিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। আগামী রোববার উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসায় কথা রয়েছে। সেখানে বিষয়টি সমাধান হতে পারে বলে জানিয়েছে উভয় পক্ষ।

বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা মানবজমিনকে বলেন, কিছু ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটা হয়েছে। শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।
কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি বলেন, যারা এখনও কাজই পায়নি, তাদের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ আমি আমলে নিতে পারি না।

মুদ্রণ সমিতির নেতারা বলছেন, দরপত্রের ২নং শর্তে স্পষ্ট বলা আছে, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই নিজস্ব প্রেস ও নিজস্ব বাঁধাইখানা থাকতে হবে। কাজ পেতে যাওয়া ৩২টি প্রতিষ্ঠানের কারোরই নিজস্ব ছাপা এবং বাঁধাইখানা নেই। তারা অন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করায়। বালটিক বিডির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই ৩২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো প্রেস অথবা বাঁধাইখানা নেই। এগুলো হচ্ছে- কমলা প্রিন্টিং প্রেস, পল্টন; নিউ ফাইভস্টার, সুত্রাপুর; ফাইভস্টার, সুত্রাপুর; আল-বারাকা প্রেস, বাংলাবাজার; তকদির প্রিন্টিং প্রেস, বাংলাবাজার; অয়ন প্রিন্টিং প্রেস, সুত্রাপুর; রিফাত প্রিন্টিং প্রেস, লক্ষ্মীবাজার; আলমগীর প্রিন্টিং প্রেস, জিন্দাবাজার; শামীম প্রিন্টিং প্রেস, কবিরাজ লেন, ঢাকা প্রিন্টার্স, শিরিশ দাস লেন; রাইয়ান প্রিন্টার্স, সুত্রাপুর; ক্যাপিটাল প্রিন্টার্স, গেন্ডারিয়া এবং উষা প্রিন্টার্স, জিন্দাবাজার। এ ছাড়া বাকি ১৯ প্রতিষ্ঠানের কারো কারো নিজস্ব প্রেস থাকলেও তা নামেমাত্র। কাজ হচ্ছে অন্যখানে। এসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- মানামা প্রিন্টার্স, সুত্রাপুর; এস.এস প্রিন্টার্স, মুসলিমনগর; মহানগর প্রিন্টিং প্রেস, মাতুয়াইল; রেজা প্রিন্টিং প্রেস, সুত্রাপুর; বৃষ্টি প্রিন্টিং প্রেস, নিমতলী; কোহিনুর আর্ট প্রেস, মাতুয়াইল; হাসান প্রিন্টিং প্রেস, বাংলাবাজার; বোরাক প্রিন্টিং প্রেস, সুত্রাপুর; একতা প্রিন্টিং প্রেস, সুত্রাপুর; নুরুল ইসলাম প্রিন্টিং প্রেস, বাংলাবাজার; হেরা প্রিন্টার্স, সুত্রাপুর; ইসলাম প্রিন্টিং প্রেস, সুত্রাপুর; দিগন্ত অপসেট প্রেস, সুত্রাপুর; মডেল প্রিন্টিং ওয়ার্কস, সুত্রাপুর; আবুল প্রেস, আগামাসি লেন; টাংগাইল অফসেট প্রেস, সুত্রাপুর; ফেইথ প্রিন্টিং প্রেস, গেন্ডারিয়া, রাব্বিল প্রিন্টং প্রেস, সুত্রাপুর এবং মহানগর অফসেট প্রেস, মাতুয়াইল।

এনসিটিবির সূত্রে জানা গেছে, এবার সংকটের অন্যতম কারণ প্রাথমিক বই বাঁধাইয়ে নতুন শর্ত এবং নবম দশম শ্রেণির সুখপাঠ্য বই। প্রাথমিক বইয়ের দরপত্রে নতুন শর্ত অনুযায়ী, পাটের দড়ি বা অন্যান্য দড়ি দিয়ে বই বাঁধাই করার পরিবর্তে মোট কাগজ দিয়ে প্যাকেজ বাঁধাই করে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ প্যাকেজ সিস্টেম আগে কখনও ছিল না। আমাদের দাবি, এই বছরের জন্য এই শর্ত শিথিল করে আগের মতো বই পাঠানোর দাবি। কারণ প্রাথমিকের বই ছাপার ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছি প্রায় দুই মাস দেরিতে। শেষ সময় এসে এই প্যাকেজিং করতে গেলে সময় নষ্ট হবে। বই ছাপা কমে যাবে। কারণ বই বাঁধার পর ইন্সফেনশন সেই প্যাকেজ খুলবে, উপজেলা পর্যায়ে বই বুঝে নেয়ার জন্য সেটি আবার খোলা হবে। তাদের দাবি, ৩৬ কোটি বইয়ের মধ্যে ২৬ কোটি প্যাকেজ ছাড়া যেতে পারলে প্রাইমারি ১০ কোটি বই যেতে সমস্যা কোথায়?

এ ব্যাপারে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান মানবজমিনকে বলেন, দুই মাস দেরি করে কাজ দিবেন আর নতুন নতুন শর্ত দিবেন এটা হয় না। ২৫ কোটি বই যদি প্যাকেজিং ছাড়া যেতে পারে তবে ১০ কোটি বইয়ে কী সমস্যা? ধর্মঘট করে রাষ্ট্রদ্রোহী করেছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যানের এমন অভিযোগের ব্যাখ্যায় তোফায়েল খান বলেন, আমরা সাহস করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ নিয়েছি বলেই এনসিটিবি নতুন নতুন শর্ত আরোপ করতে পারছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান গত বছর মার্চ মাসেও বই দিতে পারেনি, তাদের কিছুই করতে পারেনি। এখন দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যর্থ করতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হয়ে দালালি করছেন তারা। মানবজমিন

 

Leave a Reply