চাঁনখালী নদী ও জনজীবনের ঐতিহ্য

এ.কে.এম. আবু ইউসুফ, ০৭ সেপ্টম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার: বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। অসংখ্য নদ-নদী ঘিরে রয়েছে এই দেশের চারিদিকে। আমাদের এই বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিলের দৈর্ঘ্যও কম নয়, প্রায় ১৫ হাজার মাইল। কোন এক ঐতিহাসিক লিখেছিলেন বাংলার ইতিহাস এক হিসেবে নদীর ইতিহাস। আবার “নদী জননী জন্মভূমির স্তন্যধার” বলেন অনেকে। নদীর এপার ভাঙ্গে ওপাড় গড়ে, এই ভাঙ্গার গড়ার ভেতর দিয়ে বাংলার মানুষের জীবন প্রবাহিত। সংস্কৃতি পেয়েছে নিজস্বতা। অসংখ্য নদী ছুটতে ছুটতে মিলেছে বঙ্গোপসাগরে, বদলে দিয়েছে জীবনের গতিপথকে। নদী পার্শ্বের জনজীবনকে বার বার শাসন করেছে এই নদী। নদীকে ঘিরে বেঁচে উঠে জীবন, জগৎ সংসার। এইসব নদীর মাঝে আছে খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, আছে শান্ত নদী, রয়েছে সমুদ্রের মত বিশাল পদ্মা-মেঘনার মত উত্তাল নদী। বাংলাদেশের প্রধান নদীর কয়েকটি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র, করতোয়া, তিস্তা, কর্ণফুলী ইত্যাদি। আর এই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর প্রবাহমান ধারায় সৃষ্টি হয়েছে চাঁনখালী নদী। যাহা কর্ণফুলী নদীর সংযোগ শিকলবাহা খালের পর থেকে শুরু হয়েছে। পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশ এই তিন উপজেলার বুক চিরে থর থর করে বয়ে চলেছে চাঁনখালী নদী। এই নদী মিলিত হয়েছে শংঙ্খ নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে। কখনও শান্ত কখনও প্রবল খরস্রোতা বহমান এই নদীকে ঘিরে রয়েছে এই জনপদের ও জনজীবনের অনেক ঐতিহ্য ও ইতিহাস। আমি চাঁনখালী নদীকে দেখেছি খুব কাছ থেকেই, দেখেছি এই নদীর জৌলুসতা। কেননা আমার জন্মস্থান চন্দনাইশ থানাধীন বরকল ইউনিয়নের কানাইমাদারী গ্রামে। এই ইউনিয়ন ও গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে বহমান চাঁনখালী নদী। তৎকালীন সময়ে এই এলাকার লোকজন অধিকাংশ নির্ভরশীল ছিল চাঁনখালী নদীর উপর। চাষাবাদ, ব্যবসা-বানিজ্য গড়ে উঠেছিল চাঁনখালী নদীকে ঘিরেই। পটিয়া উপজেলার পশ্চিমাংশ, আনোয়ারা উপজেলার পূর্বাংশ ও চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের লোকদের যাতায়াত, ব্যবসা-বানিজ্য ও চাষাবাদের একমাত্র ভরসা ছিল চাঁনখালী নদী। শংঙ্খ নদীর উপর দিয়ে বাঁশখালীর চাম্বল থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চ (স্থানীয় ভাষায় স্টিমার) চলত নদীর বুক চিড়ে। এই জনপদের লোকদের তখনকার যাতায়ত ও মালামাল পরিবহনের বাহন হিসেবে লঞ্চ, সাম্পান ও নৌকা ছিল একমাত্র ভরসা। নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী কর্ণফুলীর চাক্তাই ব্রিজঘাট থেকে ছেড়ে আসতো এই লঞ্চ, শেষ ষ্টেশন ছিল বাঁশখালী চাম্বল। আবার চাম্বল থেকে ছেড়ে গিয়ে চাক্তাই ব্রিজঘাট পৌঁছাতো এই লঞ্চ। প্রতিমধ্যে যাত্রীই ছিল পশ্চিম পটিয়া, ভেল্লাপাড়া, জিরি, কৈগ্রাম, কালারপোল, টাঙ্গারপোল, মুরালী, খরনা, ওষখাইন, লাউয়ারখীল, চামুদরিয়া ঘাটকুল, তিশরী, বরকল, টিনেরঘরের হাট, কেশুয়া, মাস্টারহাট হয়ে বাঁশখালীর নাপোড়া ও চাম্বলের। এই চাঁনখালী নদীর রয়েছে অনেক উপ-খাল। যে খাল গুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী স্লুইস গেইট দিয়ে এতদঅঞ্চলের জনজীবনের চাষাবাদের সুযোগ করে দিয়েছে। লবনের বোঝাই করা পাল তোলা সারি সারি নৌকা, সাম্পান, পন্য বোঝাই বড় নৌকার বহর ও স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার নৌকায় মুখরিত ছিল এই নদী। পার্শ্বে সারি সারি চাটাই পাতার বন, কেওড়া গাছ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিশোর বয়সের দুরান্তপনায় শালুক তোলা, দলবেঁধে সাঁতরিয়ে নদী পার হওয়া ও মাছ ধরা ছিল মজার বিষয়। বি¯তৃর্ণ এলাকায় চাঁনখালী নদীর পানি দ্বারা বোরো মৌসুমে সেচ দিয়ে চাষাবাদ, শীতকালীন সবজির চাষাবাদ সবই করত এই এলাকার লোকজন। তৎসময়ে জৌলুসও ছিল এই নদীকে ঘিরে। চামুদরিয়া ঘাটকুলে ছিল দিনরাত ২৪ ঘন্টা সরগরম বাজার। পৌষ মাসের শেষের দিক থেকে নানান মেলা, ওরশ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনে নদীর উপর দিয়ে চলাচলে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। চামুদরিয়া ঘাটকুল থেকে ওষখাইন হযরত শাহ আলী রেজা (র.) প্রকাশ কানুশাহের পবিত্র বিষু মোবারকে অনেক দুরদুরান্তের লোকজন চাঁনখালী নদী দিয়ে নৌকাযোগে পার হয়ে সমবেত হতো। আবার এতদঅঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পটিয়া থানাধীন ভাটিখাইন টেগরপুনির (বুড়া গোসাই) মেলায় যাতায়াত করত এই চাঁনখালী নদী দিয়ে। ঐতিহাসিক নিকুঞ্জের বলী খেলায় দলে দলে লোকজন নৌকা, সাম্পান যোগে চাঁনখালী তিশরীঘাট দিয়ে যাতায়াত করত। চাঁনখালী নদীর বরকল কানাই মাদারী অংশের উপ-নদী তেরমুজ খালী ছিল এই অঞ্চলের লোকদের আশির্বাদ স্বরূপ। ঐতিহাসিক এই তেরমুজ খালীর পাড়ে রয়েছে চট্টগ্রামে প্রথম মুসলমান আগমনের সময় যে কয়েকজন মনীষী এই উপ-মহাদেশে এসেছিলেন তাঁদেরই একজন হযরত সৈয়দ মোছন শাহ আরবি (র.) এর মাজার শরীফ। দীর্ঘ কয়েক যুগ এই মাজারের খেদমতে ছিলেন অত্র এলাকার নিদাগের পাড়ার সুফী মোহাম্মদ জৈনুদ্দিন প্রকাশ জুনু ফকির। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক মৃত্যুর পর তাঁকেও দাফন করা হয় হযরত সৈয়দ মোছন শাহ আরবি (র.) এর মাজার শরীফের পার্শ্বে। চামুদরিয়া ঘাটকুলের ঐতিহ্যবাহী আবদুল হাকিম মাস্টারের ঔষধের দোকান, আনুর বাপের চায়ের দোকান আর বাছা সওদাগরের মুদির দোকান ছিল এতদঅঞ্চলের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। কালের বিবর্তনে যা হারিয়ে গেছে এখন আছে শুধু ইতিহাসটুকু। নব্বইদশকের দিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন হতে শুরু হয়। এই উন্নয়নের প্রভাব পড়ে গ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে। চাঁনখালী নদীর উপর বরকল নামক স্থানে ১৯৯৪ সালে বেলি ব্রিজ স্থাপন হয়, প্রসার হয় রাস্তাঘাট। মানুষ নৌযানের পরিবর্তে গাড়িতে করে চলাচল শুরু করে। নৌ-পথ ভূলতে বসে। নানা কারণে জোয়ার-ভাটা ঠিক থাকলেও নদীর তলদেশ ভরাট হতে শুরু করে ও নদীর নাব্যতা কমে যায়। বন্ধ হয়ে যায় নৌযান। আর দেখা মিলে না সারি সারি পালতোলা নৌকা ও পন্য বোঝাই বড় নৌকা। হারিয়ে যায় চাঁনখালী নদীর জৌলুস। তবে এই চাঁনখালী নদীকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলে নৌ-রুট চালু করা ও নদীর জৌলুসতা ফিরিয়া আনার চেষ্টায় কাজ করতেছে চাঁনখালী তেরমুজখালী নদী সংরক্ষন কমিটি। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশবাদী সংগঠক, চট্টগ্রাম। abuyousuf7919@yahoo.com

 

Leave a Reply