তামাকের আগ্রাসনে পরিবেশ হুমকির মুখে

কামরুল হুদা, ৩০ এপ্রিল ২০১৭, রবিবার: তামাক চাষের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে আবাদি জমি। তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির অনুজীব নষ্ট হচ্ছে এবং জমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে।
চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শুরু হয়েছে তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন। নতুন করে এ বছরও তামাক চাষের আওতায় চলে গেছে বিপুল পরিমাণ খাদ্য-শস্য ফলানোর জমি। তামাক কোম্পানিগুলো প্রান্তিক চাষিদের অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবছর তামাকের বিস্তার ঘটিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ বিধ্বংসী এ চাষের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো যতই সোচ্চার হোক না কেন, তবুও বিস্তার লাভ করছে তামাক চাষ। তামাক কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক তৎপরতায় চরম হুমকির মুখে পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা।
সরকারি ভাবে তামাক চাষ নিষিদ্ধ হলেও এর বিরুদ্ধে আইনগত কোন পদক্ষেপ নেই। যার ফলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয় এবং ভবিষ্যতে খাদ্য-শস্য ফলানোর জমি বলতে কিছুই থাকবে না।
তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়ানিক সার এবং অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মাটির অনুজীব নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জমি উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলছে। একনাগাড়ে তামাক চাষ চলতে থাকায় শত চেষ্টা করেও একই জমিতে অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ে উবিনীগের গবেষণায় ভয়াবহ এ চিত্র উঠে এসেছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলের লামা, আলিকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, ফাসিয়াখালী, রুমা, থানচি ও চকরিয়া উপজেলায় ব্যক্তিমালিকাধীন উবিনীগের জরিপ মতে প্রায় ৫২০০ হেক্টর আবাদি জমিতে এ বছরও বিপুল পরিমাণ তামাকের চাষ হচ্ছে। এছাড়াও মাতামুহুরী নদীতে জেগে ওঠা বিশাল চর এবং নদীর দুই তীরের খাস জমিতেও প্রভাবশালীরা তামাক চাষ করছে।
এসব অঞ্চলের আবাদি জমিতে খাদ্য-শস্য ফলানোর জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া সার, কীটনাশক অতিরিক্ত মূল্যে তামাক চাষিদের কাছে চলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে উপজেলার একাধিক সার ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আবাদি জমিতে তামাক আগ্রাসনের ফলে জমি মালিকরা প্রতিবছর ইজারা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তামাক ক্ষেতের জন্য জমি বর্গা দিতে পারলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায় বেশি। জমি মালিকের এই মনোভাবের কারণে প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না ওই ইজারায় জমি বর্গা নিতে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চলে অচিরেই খাদ্য সংকট দেখা দেবে। কৃষক হারাবে তার আদি পেশা।
চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি দখল করে নিয়েছে তামাক চাষ। বছরের পর বছর স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় তামাক চাষের কারণে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে এখানকার সবুজ পাহাড়। তামাক চাষ ক্ষতিকর জেনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশে অবাধে চাষ করা হচ্ছে তামাক। টোবাকো কোম্পানিগুলোর কাছে যেন জিম্মি হয়ে আছে প্রশাসনসহ স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
প্রচুর রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার তামাক চাষের একটি বড় ক্ষতিকর দিক। নানা কারণে গত ১০ বছরে কীটনাশকের ব্যবহারের পরিমাণ ৩২৮ ভাগ বেড়েছে এই এলাকায়। এ রাসায়নিক ও কীটনাশক মাটির উর্বরতা হ্রাস, পানি ধারণক্ষমতা নষ্ট এবং ক্ষয় বৃদ্ধি করছে। এ ছাড়া রাসায়নিকের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য, বনভূমি, পানি, জলজ প্রাণী, পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ও তামাকের রাসায়নিক গিয়ে নদী-জলাশয়ের পানিতে মিশে সে পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। তামাকপাতার কারণে এমন সব পোকার আগমন ঘটে, যা আশপাশের জমির ফসলকে আক্রমণ করে। তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল নীতি বা অবস্থান দেশের কৃষিজমি ধ্বংস, খাদ্য-সংকট, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সমস্যার মতো বিষয়গুলোকে প্রকট করে তুলবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
সরকারি হিসাবে তামাক চাষ কমে আসার কথা থাকলেও বাস্তবে বেড়েছে তামাক চাষ। তামাক চাষের কারণে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় সহস্রাধিক তামাক চুল্লিতে পোড়ানো হচ্ছে বনের মূল্যবান কাঠ। অতিরিক্ত তামাক চাষের কারণে জেলার সবজিসহ নানা ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তামাক চাষের কারণে শুধু শস্য উৎপাদন হ্রাস, বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ক্ষতিই নয়, বেড়েছে চাঁদাবাজিও। বিষাক্ত তামাক চাষের ফলে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তেমনি ফসলের জমি হ্রাস পেয়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। শিশু শ্রমিক ব্যবহার নিষেধ থাকলেও তামাক চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশু ও নারী শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগ-ব্যাধি। গত বছরের চেয়ে জেলায় এ বছর তামাক চাষ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এসব এলাকায় তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নির্মিত হয়েছে ধূমঘর। সেখানে প্রতিদিন জ্বালানো হচ্ছে সরকারি রিজার্ভ ফরেস্টের শত শত মন বনজ সম্পদ, মূল্যবান কাঠ। এসব ধূমঘর থেকে বের হয় বিষাক্ত ধোঁয়া। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। পরিবেশবিদেরা তামাক চাষের কারণে চট্টগ্রাম জেলার খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে যেদিকে চোখ যায়, শুধু তামাক আর তামাক। তামাক চাষের জন্য আগাম টাকা, সার কীটনাশকসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে টোবাকো কোম্পানিগুলো। ফলে ক্ষতিকর জেনেও তামাক চাষ করছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তামাক চাষিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তারা অসহায়। একাধিক তামাকচাষি বলেন, সবজি চাষ করে তা বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা নেই। লোকসানের মুখে পড়তে হয়। পক্ষান্তরে তামাক চাষে বাজারজাতের নিশ্চয়তাসহ আগাম টাকা, সার-কীটনাশকসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে বিভিন্ন টোবাকো কোম্পানি। ফলে ক্ষতিকর জেনেও তাঁরা তামাক চাষ করছেন লাভের আশায়।
জেলায় তামাক চাষ বাড়ার কারণে চলতি বছরে এ অঞ্চলে তামাক চুল্লিও বেড়েছে। তামাক চুল্লিগুলোতে ব্যাপক হারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ। তামাক চাষ রোধে কৃষি বিভাগের পক্ষে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করার সক্ষমতা নেই। এর জন্য প্রয়োজন সরকার ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। তা ছাড়া কৃষকেরা নগদ লাভে বিশ্বাসী। তাই তামাক চাষ থেকে কৃষকদের ফেরাতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
তামাক কোম্পানিগুলোর প্রলুব্ধকর প্রতারণায় দেশের বিভিন্ন জেলায় খাদ্যের জমিতে তামাক চাষের আগ্রাসন ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এছাড়া পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে।
তামাক পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, মাটি ও পানির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজনব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
তামাক চাষিদের খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও ঋণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদিত খাদ্য শস্যের বাজার নিশ্চিত করতে পারলে কৃষকদের ক্ষতিকর তামাক চাষ থেকে সরিয়ে আনা সহজ হবে।
তামাক কোম্পানিগুলো প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দরিদ্র কৃষকদের তামাক চাষে প্রলুব্ধ করে। তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে আনতে তামাক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় তামাক চাষের ফলে সেখানকার কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, সাঙ্গু ইত্যাদি নদীর পানি দূষিত হচ্ছে যা মৎস্যসহ পানিনির্ভর প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করণের কাজে নির্বিচারে বৃক্ষনিধনে পার্বত্য এলাকার বনজ সম্পদও ধ্বংস হচ্ছে। অবিলম্বে পার্বত্য এলাকায় তামাক চাষ বন্ধ করা দরকার। খাদ্য শস্য উৎপাদনের জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে, অথচ তামাক কোম্পানির প্রলুব্ধকর প্রচারনায় তামাক চাষের
ফসলের জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হতে যাচ্ছে তামাক চাষে। পাহাড়ি অঞ্চলের যে সব জমিতে আগে ধান, শাক-সবজি, তরমুজ, আলু আবাদ করা হতো সেসব জমিতে তামাক চাষের জন্য কৃষকরা ব্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তামাক চাষের কারণে দিন দিন গ্রাসের পথে প্রাকৃতিক পরিবেশ অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে বিলিন হতে যাচ্ছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি।
সচেতন সমাজ মনে করছে, ক্ষতিকারক তামাক চাষবাদ যদি বেড়ে যায়,তাহলে আগের তুলনায় দশগুণ খাদ্য শস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে। তাই পাহাড়ি এলাকায় এখন থেকে শুরু হবে প্রাকৃতিক পরিবেশের গাছ কাঁটার মহোৎসব চাষকৃত তামাক পোড়ানোর জন্য, যার প্রভাব পড়বে পশু-পাখি খাদ্য সংগ্রহে আর অন্য দিকে তামাকের চাষাবাদে পাহাড়ি এলাকায় দিন দিন খাদ্য সংকট প্রকট দেখা দেবে অতি শীঘ্রই, যার ফলে ফসলের জমিতে তামাক চাষাবাদে বাজারের বিক্রয়কৃত সকল সবজির দাম এখন থেকে বেড়ে যেতে শুরু করেছে।
স্থানীয় চাষীরা জানায়, প্রতি বছর ট্যোবাকো কোম্পানিগুলো কৃষকদের বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তামাক চাষে আগ্রহী করে তুলছে। তামাক চাষের জন্য চাষীদের অর্থ, বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করে দিচ্ছে এসব কোম্পানিগুলো। তাছাড়া তামাক কিনে নেওয়ার নিশ্চিয়তা দেওয়ার অধিক লাভের কারণে নিষিদ্ধ তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছে হাজার হাজার সাধারণ কৃষক। বর্তমানে যদি তামাক চাষ করা হয়, তাহলে ফসলের জমির মাটি উর্বরতা শক্তি যেমন হ্রাস পাচ্ছে তেমনি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে প্রাকৃতিক পরিবেশও।
পরিবেশ বিধ্বংসী তামাকের আগ্রাসন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবারের ন্যায় এ তামাকের আগ্রাসন থেকে এবারও বাদ পড়েনি উপজেলা ও থানা প্রশাসনের জমি, বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি, কর্ণফুলী নদী ও মাতামুহুরী নদীর চরসহ দু’পাড়। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের পাশাপাশি আদালতের নিষেধাজ্ঞাকেও উপেক্ষা করে তামাক কোম্পানির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে চলতি মৌসুমে তামাক চাষ হয়েছে দেদার। ফলে ফসলি জমির উর্বরতা হ্রাস, সবুজাভ পরিবেশ, পাহাড়-মাটি, নদী-খাল ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি এই চাষে সংশ্লিষ্ট কৃষক ও স্থানীয়রা নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ ও প্রশাসনের উদাসিনতায় এ তামাক চাষ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গোটা বিশ্বের সঙ্গে দেশবাসী যখন সরব, তখন গাছগাছালির সবুজ বনায়নের বদলে জেলায় তামাক চাষের প্রসার নিয়ে সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। তাই এখনিই পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না হলে আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়ে অচিরেই জেলায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারী জমিতে তামাক চাষ নির্মূল অভিযান পরিচালনা করা হলেও গত দু বছর ধরে তা হচ্ছে না।
গত দেড় দশকের ব্যবধানে এখানকার প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষি জমি দখল করে নিয়েছে সর্বগ্রাসী এ তামাক চাষ। ফলে এখানকার শাক সবজির চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে হচ্ছে রীতিমত। এখন রবিশস্য মৌসুম এলেই তামাকের উৎকট গন্ধে বিষাক্ত হয়ে উঠে এখানকার পরিবেশ। আবার উৎপাদিত তামাক প্রক্রিয়াজাত করতে নির্মাণ করা হয়েছে তন্দুর (চুল্ল¬ী)। এসব চুল্লিতে জ্বালানী হিসেবে পোড়ানো হয় সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনের কাঠ। ফলে দিন দিন বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে এখানকার বনাঞ্চল।
টোব্যাকো কোম্পানিগুলো তাদের সঠিক পরিসংখ্যান দিয়ে রেজিস্ট্রেশনকৃত তামাক চাষির সংখ্যা ও কত একর জমিতে তামাক চাষ হবে তা বরাবরই কৌশলগতভাবে চাপিয়ে যাচ্ছে। জমিতে ব্যাপকহারে তামাকের আবাদ হয়েছে। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু তামাক আর তামাকের আবাদ। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা সবাই তামাক চারার সেবা যতেœ ব্যস্ত সময় পার করছেন। আশপাশ এলাকার কোন ফসলি জমিতে কোন ধরণের সবজি কিংবা বোরো আবাদ চোখে পড়েনি তিল পরিমাণও। মৌসুমের শুরুতেই তামাক কোম্পানিগুলো চাষিদের আগাম অর্থসহ সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে। আবার উৎপাদিত তামাক একত্রে টাকা দিয়ে কোম্পানিই কিনে নেয়। এসকল সুযোগ সুবিধার কারণে তামাক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠি। এাছাড়া তামাক বিক্রি করে এক সঙ্গে টাকা পাই। সবজি কিংবা ধান চাষে এসব সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় না।
বার বার একই জমিতে তামাক চাষের ফলে যেমন এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি রবিশস্যের উৎপাদনে নেপথ্যচারী হিসেবে নানা অন্তরায় সৃষ্টি করে যাচ্ছে। তাই জনস্বার্থে ২০১০সালে তামাক চাষ বন্ধে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু কোম্পানীগুলো আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এখনও তামাক চাষ অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ ও প্রশাসনের উদাসিনতায় এ চাষ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিজ্ঞমহল। তারা বলেন, প্রশাসন চাইলে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ প্রতিরোধ সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা। না হয় অচিরেই এতদ্বাঞ্চল মরুভুমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
তামাক শোধনের সময় নির্গত নিকোটিনের কারণে এলাকার মানুষ হাঁপানি, কাশি এবং ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তামাক চাষ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে নিয়োজিত ট্যোবাকো কোম্পনীগুলোর ফাঁদে আটকে পড়ে কৃষকরা এ চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এখনিই তামাক চাষ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তামাকের আগ্রাসনে হুমকির মুখে পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। এ অবস্থার কারণে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে পরিবেশ সচেতন মহল। প্রতি বছর তামাক চাষের পরিধি বাড়তে থাকায় হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমি। অন্যদিকে মালিকরা তামাক জমির ইজারা বেশি পাওয়ায় ইরি-বোরো ও সবজি চাষের জমি সাধারণ কৃষকদের অল্প টাকায় বর্গা দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তামাকের আগ্রাসন বেড়েই চলছে। নাইক্ষ্যংছড়ি ও গর্জনিয়ার বাঁকখালী নদীর বুক যেন গিলে খাচ্ছে তামাক। এ ছাড়া বাইশারী ইউনিয়নের ঈদগড় নদীর দুই তীরজুড়ে তামাকের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাতে ও কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলাতে বিভিন্ন তামাক কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে চাষিরা পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এতে উপজেলার কৃষি সম্ভাবনাময় মিষ্টিআলু, গোলআলু, কাঁচামরিচ, মিষ্টিকুমড়া, তরমুজ, টম্যাটো, বেগুন, খিরা ও ধানসহ সব ধরনের রবিশস্য উৎপাদন ষাট শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ উপজেলায় সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক মাত্র কয়েক একর জমিতে তামাক চাষের হিসাব দেখালেও বাস্তবে অনেক বেশি জমিতে নির্বিঘ্নে তামাক চাষ চালিয়ে যাচ্ছে। এ বছর তামাক চাষের জমির পরিমাণ দুই উপজেলায় হাজার একরের বেশি হবে বলে জানালেন, বাইশারী ইউনিয়নের আলিক্ষ্যং এলাকার বাসিন্দা তামাক চাষিরা। এলাকাবাসী জানান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানির লোভনীয় ফাঁদে পা দিয়ে অনেক কৃষক তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে উপজেলায় বছর বছর খাদ্য উৎপাদনে জমির পরিমাণ কমে যাবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছরী ইউনিয়ন, ঘুমধুম, সোনাইছড়ি, বাইশারী ইউনিয়নের ক্যাংগারবিল বড়ছরা এবং রামু উপজেলার বাঁকখালী নদীর দুই তীরে এবং কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন, কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তামাকের সর্বনাশা আগ্রাসনে আবাদি জমি দখল করে ফেলেছে। যার ফলে শাক-সবজিসহ রবিশস্য আবাদ প্রতি বছরই কমে যাচ্ছে। গ্রাম অঞ্চলে বর্তমান মৌসুমে তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিরা আগাম অর্থ প্রদানের নামে দাদন দিয়ে চাষিদের বিভিন্ন লোভ-লালসা দেখিয়ে ক্ষতিকারক সর্বনাশা তামাক চাষের দিকে বিস্তার ঘটাচ্ছে। আগে যেসব জমিতে ধান, মরিচ, বেগুন, আলু, টম্যাটো, ধনিয়া পাতা, ভুট্টা, ছনফুল, ফেলন, শিমসহ বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদন হতো। এখন সেসব জমিতে তামাক চাষে ছেয়ে গেছে। তামাক চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আবাদি জমি কমে যাওয়ায় কৃষি খাদ্য এখন নিরাপত্তার চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে উপজেলায় চরম খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কাঁচা তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে বনের কচি কাঁচা কাঠ। এতে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানে মূল্যবান বৃক্ষরাজি উজাড় করে ফেলছে বনদস্যুরা।
প্রতিবছর বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে বেড়ে চলছে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন। এবছর সরকারী হিসেবে উপজেলায় ৩হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে বলে কৃষি বিভাগ দাবি করলেও বাস্তবে দেখা গেছে তামাক চাষের পরিধি গতবছরের চেয়ে এবছর বেড়ে গেছে। তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে জড়িত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এনজিও সংস্থা উবিনীগ ও একলাবের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গতবছর উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করা হয়। প্রশাসনের নিলিপ্ততার সুযোগে এবছর চাষের পরিধি অনেক বেড়েছে। সংস্থা দুটির গবেষনা কর্মকর্তাদের ধারনা, টোবাক্যো কোম্পানী গুলোর লোভনীয় ফুলঝুঁড়িতে পড়ে কৃষকরা প্রায় ৭হাজার একর জমিতে এবছর তামাকের চাষ করেছে। প্রতিবছর তামাক চাষের পরিধি বাড়তে থাকায় আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতেকরে চরমভাবে হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার খাদ্য নিরাপত্তা। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামীতে খাদ্য উদ্বৃত্ত এ উপজেলায় চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষি সচেতন মহল।
জানা গেছে, উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, বমুবিলছড়ি, লক্ষ্যারচর, ফাসিয়াখালী, কৈয়ারবিল ও বরইতলী ইউনিয়নে এবং পৌরসভার আংশিক এলাকায় গত এক দশক ধরে ফসলি জমিতে ভয়াবহ তামাকের আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের নিলিপ্ততার সুযোগে প্রতিবছর এখানে বেড়ে চলছে তামাক চাষের পরিধি। প্রতিবছর তামাক চাষের ভয়াবহ বিস্তারের কারনে উপজেলার এসব ইউনিয়নে হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমির পরিমান। এতে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আগামীতে এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে উপজেলায় চরম খাদ্য ঘাটতি হবে। তামাক চাষের কারনে প্রতিবছর উজার হচ্ছে সরকারি সংরক্ষিত ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বনাঞ্চলের মুল্যমান বৃক্ষরাজি। তামাক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য এসব বনাঞ্চল নিধন করে লুটে নেয়া হচ্ছে ছোট-বড় গাছপালা। তামাক চাষের কারনে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের পাশাপাশি এখানকার জমিনের মাটি হারাচ্ছে উর্বতা শক্তি। বিগত সময়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তামাক চাষ অধ্যুষিত এলাকার লোকজনের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। এতেকরে এলাকার পরিবেশও চরমভাবে বিষিয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সুত্র জানায়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে বেশ ক’টি এনজিও সংস্থা উপজেলায় কাজ করলে কৃষকের পক্ষ থেকে তামাক চাষ বন্ধে কোন ধরনের আগ্রহ নেই। ফলে অনেকটা বিনা বাঁধায় স্থানীয় কৃষকদের জিম্মি করে প্রতারণার প্রলোভনে ফেলে ট্যোবাকো কোম্পানী গুলো প্রতিবছর তামাক চাষে বাধ্য করছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক এলাকায় জনপ্রতিনিধিরাও পরিবেশ বিধ্বংসী এ চাষকে সমর্থন দিচ্ছে। চকরিয়ায় এ বছরও বিপুল পরিমাণ আবাদি জমিতে চাষ হয়েছে তামাক। স্থানীয়ভাবে তামাক কোম্পানিগুলো চাষিদের বেশি মুনাফার প্রলোভনে ফেলে তামাক চাষ করেছে।
তামাকের আগ্রাসনে হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার খাদ্য নিরাপত্তা। জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। এ অবস্থার কারণে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে পরিবেশ সচেতন মহল। প্রতি বছর তামাক চাষের পরিধি বাড়তে থাকায় হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমি। অন্যদিকে মালিকরা তামাক জমির ইজারা বেশি পাওয়ায় ইরি-বোরো ও সবজি চাষের জমি সাধারণ কৃষকদের অল্প টাকায় বর্গা দিচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অধিক জনসংখ্যার ছোট্ট ভুখন্ডের এ দেশ। খাদ্যের জমিতে তামাক চাষ খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। অপরদিকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্ররোচনার কারণে তামাকচাষ আগ্রাসীভাবে বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য উৎপাদনের জমি দখল করে নিচ্ছে। বর্তমানে সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৭৪০০০ হেক্টর জমিতে তামাক হচ্ছে। বিগত ২ বছরে তামাকচাষ প্রায় ৬৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত চলনবিল এখন দখল করে নিচ্ছে তামাক চাষ। পাবর্ত্য এলাকায় বিগত ১০ বছরে তামাক চাষ বেড়েছে ৫০০%।
তামাকচাষের কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় বৃহত্তর রংপুরে অনেক জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে এবং মঙ্গার অন্যতম কারণ তামাক চাষ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় নদীর পাড়ে তামাক চাষ করায় তামাকের জমির কীটনাশক ও তামাক গাছের উচ্ছিষ্ট নদীতে নিক্ষেপ করায় নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। ফলে সেখানে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পার্বত্য এলাকার মানুষ এ পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তামাক চাষের সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্কুলে শিশুদের উপস্থিতির হার কমে যায়। তামাকপাতা প্রক্রিয়াজাত করার জন্য অবাধে বৃক্ষনিধন চলছে। যে কারণে পার্বত্য এলাকার অনেক পাহাড় বৃক্ষশূণ্য হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, তামাক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে ৩০ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিবছর ১২ লক্ষ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত প্রধান ৮টি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ৫৭,০০০ জন মৃত্যুবরণ এবং ৩,৮২,০০০ লোক পঙ্গুত্ব বরণ করছে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে তামাক সেবনের হার ছিল ৩৭%, বর্তমানে তা ৪৩.৩%। সুতরাং দেখা যায় এ সময়কালে তামাক সেবনের হার যেমন বেড়েছে তেমনি জনসংখ্যাও বেড়েছে। তাই তামাক সেবনজনিত কারণে মৃত্যুসংখ্যাও অনেক বেড়েছে, তামাক সেবনজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে।
বিড়ি কারখানাগুলোও জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০০৮ সালের সরকারি হিসাবে বলা হয়, দেশে বিড়ি শ্রমিকের সংখ্যা ২,৬৬,৮১৮ জন। দূষিত পরিবেশে বিড়ি কারখানায় কাজ করা শ্রমিকরা কম মজুরিতে কাজ করায় একদিকে কখনও দারিদ্র থেকে মুক্তি পায় না, অন্যদিকে অকালে অসুস্থ্য ও মৃত্যুবরণ করে। অথচ তামাক কোম্পানিগুলো শ্রমিকের সংখ্যা ও কর্মসংস্থানকে অজুহাত হিসেবে তুলে কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করে থাকে। বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ হলে ১৮.৭% চাকুরি বৃদ্ধি পাবে। তামাক কোম্পানিগুলো মিথ্যাচার করছে। তারা বলছে বিড়ি শিল্পে অনেক শ্রমিক কাজ করে। অথচ বিড়ি শিল্পে যে মারাত্মক শ্রম শোষণ হয় তা তারা বলে না। এখানে প্রতিদিন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার বিড়ি বানানোর কাজ পায় একজন শ্রমিক। কিন্তু একজন শ্রমিকের পক্ষে এত বিড়ি বানানো সম্ভব নয়। সে তার স্ত্রীকে দিয়ে কাগজে আঠা লাগিয়ে বিড়ির রোল বানানোর কজা করায়, তার সন্তানকে দিয়ে বিড়ি রোল এর মধ্যে তামাকের গুড়া ভরানোর কাজ করায়। কারণ রোল বানানোর জন্য নরম হাত ভাল। নাহলে কাগজের রোল নষ্ট হয়ে যাবে। অন্যদিকে বিড়ির রোল-এ তামাকের গুড়া ভরার জন্য ছোট ছোট আঙ্গুলের ব্যবহার হলে কাজ দ্রুত হয়। কিন্তু এ মারাত্মক পরিবেশে কাজ করেও বিড়ি শ্রমিকের স্ত্রী বা সন্তান কোন পারিশ্রমিক পায় না। স্ত্রী ভাবেন, তিনি তার স্বামীর কাজে সহযোগিতা করছেন, শিশুসন্তান ভাবেন, তারা গরীব, তাই সে তার বাবার কাজে সহযোগিতা করছেন। মারাত্মকরকম ক্ষতিকর পরিবেশে বিড়ি কারখানার শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করে চলেছে।
২০০৯ সালে গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযাযী, বর্তমানে ৪৩.৩% প্রাপ্তবয়স্ক লোক তামাক ব্যবহার করে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় এবং নিরুৎসাহিত করতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন এবং তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধি করা জরুরি। ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের গবেষণায় জানা যায়, প্রতিবছরে বিড়ির পিছনে যে পরিমান টাকা (২৯১২ কোটি টাকা) খরচ হয় তা দিয়ে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে। বিড়ির বার্ষিক খরচ দিয়ে ৪৮৫ কোটি ডিম অথবা ২৯ কোটি ১ কেজি ওজনের মুরগী, অথবা ২৯ লক্ষ গরু অথবা ১৪ লক্ষ টন চাল অথবা ২৩ লক্ষ রিকশা ক্রয় করা সম্ভব।
তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে আদায়কৃত অতিরিক্ত রাজস্ব সরকার প্রয়োজনে দরিদ্র লোকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ব্যয় করতে পারে। প্রায়শই কোম্পানিগুলো অনেক টাকা রাজস্ব দেয় বলে নিজেদের জাহির করতে চায়। আমাদের মনে রাখা দরকার, কোম্পানিগুলো মূলত সংগৃহীত জনগনের টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেয়। বিনিময়ে জনগণ ও সরকারের উপর মানুষের মৃত্যু, রোগ ও অসুস্থ্যতার বোঝা চাপিয়ে দেয়।
বিগত কয়েক বছরে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও তামাকজাত দ্রব্যের দাম সে হারে বৃদ্ধি পায়নি বরং কমেছে। সস্তায় তামাকজাত দ্রব্য (সিগারেট, বিড়ি, গুল, জর্দ্দা, সাদাপাতা) প্রাপ্তির কারণে মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা যায়, গড়ে ১০% মূল্য বৃদ্ধিতে উচ্চ আয় ও নিম্ন আয়ের দেশসমূহে ধূমপায়ী এবং ধূমপানজনিত মৃত্যু উল্লেখ্যযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। মানুষের জীবন অপেক্ষা কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১ এবং অনুচ্ছেদ ১৮ (১) এ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হানিকর মদ ও ভেজষের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-র আর্টিকেল-৬ নং ধারায় তামাক ব্যবহার হ্রাসে কর বৃদ্ধির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তামাক নিয়ন্ত্রণের যে কয়টি পদ্ধতির কথা বলেছেন, তার মধ্যে করবৃদ্ধি অন্যতম।

তামাক হচ্ছে সর্বগ্রাসী একটি পণ্য। তামাক চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবন সকল পর্যায়েই জনস্বাস্থ, পরিবেশ, অর্থনীতির উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এজন্য উন্নত দেশগুলো তামাকের উপর উচ্চহারে কর আরোপ, সিগারেটের প্যাকেটে ছবি ও সতর্কবাণীসহ কঠোর আইন প্রণয়ন করায় তামাক সেবনের হার কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেও উন্নত দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তামাক চাষ কমে যাচ্ছে। যে কারণে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসন বেড়ে গেছে।
জনপ্রতিনিধিরা দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য শপথ গ্রহণ করেন। নীতিনির্ধারনের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতির উপর তামাকের নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা এবং তামাকজাত দ্রব্যের উপর উচ্চহারে কর আরোপ করার অর্থ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন। সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, বেশ ক’জন সংসদ সদস্য বিড়ির উপর কর না বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বরাবর পত্র দিয়েছেন। এটা খুব দুঃখজনক, তার মানে কি আমাদের সংসদ সদস্যবৃন্দ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে উৎসাহিত করছেন?
প্রতিবছর তামাক কোম্পানিগুলো ভ্রান্ত প্রচারণার মাধ্যমে সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের বিভ্রান্ত করে তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। নিত্য প্রয়োজনীয় সকল পণ্যের উপর কর বৃদ্ধি হলে তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধি হবে না কেন? বরং জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় বিড়ি-সিগারেটসহ সকল ধরণের তামাকজাত দ্রব্যের উপর কর বৃদ্ধি বিষয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যদের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply