ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ভোট দিচ্ছে দেশ বিদেশের ফরাসি ভোটাররা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৩ এপ্রিল ২০১৭, রবিবার: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ রোববার। ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে ভোট দিচ্ছে দেশ বিদেশের ফরাসি ভোটাররা। কোনো প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশের অধিক ভোট না পান, তাহলে সর্বাধিক এগিয়ে থাকা দুজন প্রার্থীর মধ্যে ৭ মে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় রাউন্ড।
স্থানীয় সময় সকাল ৮ টায় এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে ৩০ শতাংশ ভোট গ্রহণ হয়েছে বলে জানা যায়। ভোটারদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। গত সপ্তাহর সন্ত্রাসী হামলা তাদের উপর খুব প্রভাব পড়েনি। প্রায় ৭০ হাজার ভোট কেন্দ্রে এই ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ সন্ধ্যার মধ্যেই প্রাথমিক ফলাফল জানা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। People choose their ballots before voting for the first round of the regional elections, Sunday, Dec. 6, 2015, in Lyon, central France. French voters are casting ballots Sunday for regional leaders in an unusually tense security climate, expected to favor conservative and far right candidates and strike a new blow against the governing Socialists. (AP Photo/Laurent Cipriani)
যদিও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ১১ জন প্রার্থী। তবে তাদের মধ্যে এগিয়ে আছেন ৪ জন। কট্টরপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্টের  মেরি লি পেন, মধ্যপন্থী এল মার্সি দলের ইমানুয়েল ম্যাকরন, রিপাবলিকান দলের ফ্রাসোয়া ফিলন এবং সমাজতন্ত্রী দলের প্রার্থী জাঁ লুক মেলেঙ্কোঁ।
এই চার জনের যে- কোনো একজন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পেলে প্রথম দুজন অংশ নিবেন দ্বিতীয় রাউন্ডে। ধারণা করা হচ্ছে সে দুজন হবেন লি পেন আর ম্যাকরন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইটা হবে মূলত ম্যাকরন আর লি পেনের মধ্যেই। ফ্রাঁসোয়া ফিলন প্রথম দিকে প্রথম অবস্থানেই ছিলেন, কিন্তু স্ত্রীকে অবৈধ অর্থ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে তিনি জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন অনেকখানি, প্রথমস্থান থেকে ছিটকে পড়েছেন তৃতীয় অবস্থানে।
নানা কারণেই এবারের ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত নিজেদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, ব্যাপক বেকারত্বের চাপ, অভিবাসন ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা এবং দ্বিতীয়ত মুহুর্মুহু সন্ত্রাসী হামলায় ফ্রান্স প্রায় বিপর্যস্ত। তার বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ-পরিস্থিতিও সামাল দিতে হচ্ছে তাদের।
সে কারণে সমস্ত আন্তজার্তিক মহলই ফ্রান্সের নির্বাচনের উপর দৃষ্টিনিবদ্ধ করে আছে। শেষ পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটিকে আখ্যা দেয়া হয়েছে অনেকটা অনিশ্চিয়তার নির্বাচন বলেই। কারণ সন্ত্রাসবাদ দমন নাকি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কোনটাকে গুরুত্ব দিবে ভোটাররা তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভুগছে। বিশেষ গত বৃহসম্পতিবারের সন্ত্রাস আক্রমণ তাদের জটিল এক আবর্তে ফেলে দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ নির্বাচনকে বিশেষ নজরে রাখছেন। টুইট করে তিনি সমর্থন জানিয়েছেন লি পেনকে। এবং সন্ত্রাস বাদ ঠেকাতে লি পেনকেই তিনি উপযুক্ত মনে করবেন। সেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ লি পেনকে ফ্রান্সে বলা হচ্ছে ‘মহিলা ট্রাম্প’। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনিও ট্রাম্পের মতো ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর মতো ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মেইড ইন ফ্রান্স’। সবার আগে ফ্রান্স। এমনকি, তিনি নির্র্বাচনী জয়ী হলে ব্রেক্সিটের মতো  ‘ফ্রেক্সিট’ টাইপের কিছু একটা করবেন বলেও জানিয়েছেন। অর্থাৎ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফ্যান্সের একক কর্তৃত্ব গড়ে তুলবেন। তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক কর্তৃত্ব চলে যাবে জার্মানির হাতে। জার্মানিতেও সামনে নির্বাচন। সেদিক থেকে ফ্রান্সের নির্বাচন এই মুহূর্তে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক মহলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ  তো বটেই, লি পেনের রাজনৈতিক মতাদর্শও খুব গুরুত্বপূর্ণ। রক্ষণশীল বয়স্করা লি পেনের পক্ষ নিলেও তরুণ-প্রজন্ম লি পেনকে ছেড়ে দ্রুতই ঝুঁকেছেন ম্যক্রোঁর দিকে।
ম্যাক্রোঁ লি পেনের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি মধ্যপন্থী। ডানেও নেই, বাঁয়েও নেই। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ডান-বাম করে দেশটাকে দুভাগ করবেন না। আমার দলে যে- কোনো মতাবলব্বী লোকই আসতে পারে। আমরা চাই বেকারত্ব দূর করতে এবং অর্থনীতিকে পুররুদ্ধার করতে। তিনি কর্পোরেট ট্যাক্স কাটার ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের। ৩৯ বছর বয়স্ক ইনানুয়েল ম্যাক্রোঁ ছিলেন ফ্রাঁসোয়া ওলাদের অর্থমন্ত্রী, ছিলেন ব্যাং-নির্বাহী, আর শিক্ষাগত জীবনে দর্শনের ছাত্র। ২০১৬ সালে তিনি তার নতুন রাজনৈতিক দল এন মার্সি (এগিয়ে চলো) নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। আর সামাজিক উদারনীতি, জাতীয়তাবাদ, ফ্রান্সে বিবাদমান ডান ও বামপন্থীদের মধ্যে ঐতিহ্যগত দ্বন্ব মেটানো এবং ফ্রান্সকে বিশ্বের প্রধানতম অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তরুণ-প্রজন্মকে এক করে খুব দ্রুতই তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সত্যি বলতে এখন তাকে ধরা হচ্ছে প্রথম অবস্থানেই। অনেকেই ধারণা করছেন তিনি হয়তো লি পেনকে পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে যাবেন। আর তাকে বলা হচ্ছে ‘ফ্রান্সের ওবামা’। ওবামার মতো ডিপ্লোমেটিক। ট্রাম্প বা লি পেনের মতো উগ্রপন্থী উত্তেজিত নন। ওবামা তাকে নির্বাচনের দুদিন আগে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর সেটা দ্রুত নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানাতে ভুলেননি ম্যাক্রোঁ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির দল ইউএমপির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফ্রাসোয়া ফিলন। তবে এবার তিনি দলটির নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন এল রিপাবলিকান। ডানপন্থী দলের নেতা ফিলন নির্বাচনী প্রচারণার শুরু দিকে সমতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তায় প্রথম দিকেই ছিলেন। কিন্তু,স্ত্রীকে অবৈধ উপায়ে মোটা অংকের অর্থ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে তিনি দ্রুতই জনপ্রিয়তা হারান। সেই অভিযোগ অবশ্য তিনি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন। এখন তিনি আছেন তৃতীয় অবস্থানে। জনশ্রুতিতে তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও তাকে মেলেঙ্কোঁ ও বেনোয়া হামনের চেয়ে পেছনের সারিতেই রাখছে কেউ কেউ।
সোশ্যালিস্ট পার্টির বেনোয়া হামন আ সমাজতন্ত্রী দলের প্রার্থী জাঁ লুক মেলেঙ্কোঁ আছেন সমান কাতারেই। ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি, শরনার্থীদের আশ্রয় দানসহ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে  তারা দুজনই প্রায় একইরকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটলে হয়তো এ দুজনের একজন প্রথম প্রতিযোগীর দুজনের একজন হয়েও উঠতে পারেন
শিল্প ও সংস্কৃতির দেশ ফ্রান্সের এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ববাসী। ফ্রান্সকে বলা হয় গণতন্ত্রের প্রধান সুতিকাগার। কারণ ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর ফ্রান্সই প্রথমে বিশ্ববাসীকে শুনায় গণতন্ত্রের ভাতৃত্ব বন্ধনের কথা। নানা কারণে ফরাসি বিপ্লব হয়তো ব্যর্থ হয়ে গেছে কিন্তু হারিয়ে যায়নি ফ্রান্সের ইতিহাস ঐতিহ্য। ফ্রান্স জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একটি। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের উপর যে শুধু ফ্রান্সের ভবিষ্যত নির্ভ করছে তাই নয়, নির্ভর করছে বৈশ্বিক রাজনীতির নানা প্রেক্ষাপট। বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশের মানুষও তাকিয়ে আছে সেই আগাম প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে। সূত্র: সিএনএন, বিবিসি, ইউকিপিডিয়া, অন্যান্য পত্র-পত্রিকা

Leave a Reply