কোটি কোটি ইয়াবা বড়ি ঢুকছে দেশে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার: শতকের ঘর ছাড়িয়েছে অনেক আগে। তারপর হাজার। এখন কোটি কোটি ইয়াবা বড়ি ঢুকছে দেশে। সম্প্রতি শত কোটি টাকা মূল্যের ২০ লাখ পিস ইয়াবার একটি চালান আটক করেছে র‌্যাব। তার কয়েক দিন আগে আটক করা হয়েছে ছয় লাখ পিস। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যে পরিমাণ ইয়াবা ধরা পড়ছে তা মোট চোরাচালানের ১০ থেকে ২০ শতাংশের বেশি নয়।
গত ১৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগরের গভীর এলাকা থেকে ২০ লাখ পিস ইয়াবার একটি চালান আটক করে র‌্যাব-৭। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়া এটি হলো দ্বিতীয় বড় চালান। চালানটি নিয়ে আসছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারার গহিরা এলাকার ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান মোজাহের। তার ৯ সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। মিয়ানমার থেকে এই চালানটি আসছিল। গত ১৯ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা থানার চরপাড়া স্লুইচ গেট এলাকা থেকে ৬ লাখ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয় মিয়ানমারের ৮ নাগরিককে। র‌্যাব-৭ এই গ্রেফতার অভিযান চালায়। সমুদ্রপথে তারা এ দেশে ইয়াবা নিয়ে আসতো। এভাবে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোষ্টকার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী ও সীমান্তরক্ষীরা প্রায়ই ইয়াবার চালান ধরছে। কিন্তু তারপরেও ঠেকানো যাচ্ছে না ইয়াবার চালান। মরণ নেশা ইয়াবার কোটি কোটি টাকার চালান ঢুকে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
অভিজাত পরিবারের সন্তানরা ইয়াবার প্রতি আসক্ত, তা নতুন কিছু নয়। নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, মডেল ও ধনাঢ্য পরিবারের বখে যাওয়া অনেকের বিরুদ্ধেই আগে থেকেই অভিযোগ রয়েছে ইয়াবা সেবনের। কিন্তু সম্প্রতি এই চিত্র ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানরাও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে খবর আছে। উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে এমন কোনো শ্রেণী বা পেশা নেই যারা ইয়াবায় আসক্ত নয়। যে ডাক্তাররা মানুষের চিকিৎসার মতো মহৎ কাজে নিয়োজিত তাদের অনেকেই এখন ইয়াবা সেবন ও ব্যবসায় জড়িত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইয়াবার মূল চালনগুলো আসছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে। সম্প্রতি বিজিবির সাথে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের এক বৈঠকে ইয়াবার তৈরি ৪২টি কারখানার তালিকা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। শুধু বাংলাদেশে পাচারের জন্যই এসব কারখানা তৈরি করা হয়েছে। কারখানাগুলোর পেছনে স্থানীয় ও প্রশাসনিক সম্পৃক্ততাও রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ওই কারখানাগুলোতে ইয়াবা উৎপাদনের পর তা এ দেশে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। দেশে ইয়াবা প্রবেশের মূল রুট হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও এর আশপাশের এলাকা। সমুদ্রপথেও আসছে বড়বড় চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইয়াবার পুরোটাই আসছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে। কিছু নকল ইয়াবা তৈরি হচ্ছে এখানে। নেশাজাতীয় বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে ওই সব ট্যাবলেট তৈরি করা হচ্ছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তের প্রবেশমুখ থেকেই যদি ইয়াবার এই চালান ঠেকানো না যায় তবে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে তেমন ফল মিলবে না। একাধিক ইয়াবা বিক্রেতা বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্ত থেকে তারা ইয়াবা সংগ্রহ করছেন। স্থলপথের পাশাপাশি নদী পথেও ঢুকছে ইয়াবা। কিছু কিছু চালান নৌপথে কুয়াকাটা এবং ভোলা দিয়েও প্রবেশ করছে। সুযোগ পেলেই সীমান্ত গলিয়ে ইয়াবার চালান এ দেশে এনে আশপাশের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জড়ো করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে তা বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
কী পরিমাণ ইয়াবা প্রতিদিন দেশে প্রবেশ করছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। পুলিশ এবং র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ইয়াবা উদ্ধার অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। ছোট ছোট এই ট্যাবলেট সহজেই বহনযোগ্য। পকেটেও কয়েক শ’ পিস ইয়াবা বহন করা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক সময় শুধু ধনাঢ্য পরিবারের বখে যাওয়া সন্তানদের বিরুদ্ধেই ইয়াবা সেবনের অভিযোগ ছিল। নতুন করে এখন অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে ইয়াবার প্রতি। এখন এর বিস্তৃতি প্রত্যন্ত গ্রামেও। বরিশালের ঝালকাঠী একটি ছোট্ট জেলা। এই জেলায় প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার ইয়াবা কেনাবেচা হয় বলে খবর আছে। ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে এই এলাকায় কনসার্টসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু ইয়াবা সেবন থামছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইয়াবার দু-চারটি চালান বাজারে নিরাপদে পৌঁছুতে পারলেই কোটি টাকা উপার্জন সম্ভব। ফলে এই কারবারের দিকে ঝুঁকছে অপরাধীরা। কখনো ধরা পড়লে তারা লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে মুক্তির জন্য। রাজধানীর কুখ্যাত মাদক সম্রাজ্ঞী পাপিয়া, তাসলিমা আক্তার সিমুসহ অনেকেই ইয়াবার কারবার করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। গত ১৬ এপ্রিল যে মোজাহের র‌্যাবের হাতে আটক হয় সে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বলে জানা যায়। এরা গ্রেফতার হলেও কখনোই বেশি দিন কারাভোগ করতে হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। খোদ মিয়ানমার যেখানে ইয়াবা তৈরি হয় সেখানেও কঠোর আইন রয়েছে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডেও কঠোর আইন রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইয়াবা একটি খ শ্রেণীর মাদক। আইন যা রয়েছে তা যথেষ্ট শক্তিশালী। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সদস্যরা সব সময়ই সোচ্চার রয়েছে। তবে যে পরিমাণ ইয়াবা ততটা উদ্ধার হচ্ছে না বলে ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেন।

Leave a Reply