খাদ্য দ্রব্যে মূল্য বৃদ্ধি ও ভেজাল প্রতিরোধে নজরদারী বাড়াতে হবে

মাহমুদুল হক আনসারী, ১৯ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার: খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। নাগরিকের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খাদ্য দ্রব্যের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় সরবরাহ প্রাপ্য সহজ ও সুলভে রাখতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে প্রয়োজনীয় দিক নির্র্দেশনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের থাকতে হবে। খাদ্য ছাড়া জীবন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না। মানব জাতির জীবন বাঁচাতে হলে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য দরকার। দেশের শহর ও গ্রামে নিয়মিত ভাবে নানা জাতের খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তর, কৃষি বিপনন কেন্দ্র, নিত্য নতুন নতুন জাতের খাদ্য জাতীয় পণ্য উৎপাদন বিপনন করে সমাজকে সচল রাখার চেষ্টায় আছে। দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিদিন খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, চাউল, ডাল, মাছ, মাংস, তরি-তরকারির প্রয়োজন বেড়েই চলছে। কৃষি জমি কমে তৈরি হচ্ছে বাড়ী ঘর, মার্কেট, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল জোন। প্রায় ৮০ হাজার গ্রামে এখন কৃষি জমি অনেক কমে যাচ্ছে। কৃষি জমি কমলেও ফসল ফলাদির উৎপাদন বাড়ছে জমি থেকে। কৃষক ভাইয়েরা জমিকে আগের তুলনায় ব্যাপক হারে উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষ হতে তাঁদের প্রতি সার্বিক সাহায্য আগের চেয়ে বাড়ছে। যে কোন সরকারের চেয়ে বর্তমান সরকার কৃষকবান্ধব সরকার। সার, ডিজেল, পানি এবং কৃষি ধানের জন্য এখন আর কৃষদের আন্দোলন করতে হয় না। ন্যায্য মূল্য কৃষকরা তাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ঘরে বসেই পাচ্ছে। সমস্যা একটি সেটা হচ্ছে মধ্যসত্তভোগীরা কৃষকের লাভ আত্মসাত করছে, কৃষক ক্ষেতে অল্প মূল্যে পণ্য বিত্রি করছে। মাঝ পথে মওজুদদাররা উচ্চ মূল্যে তা বাজার জাত করে অতি মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রতারিত ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে নির্ভেজাল পণ্য ব্যবসায়ীরা নিয়ে সে পণ্যে নানা ধরণের কিটনাশক দ্রব্যে মিশিয়ে খাদ্যে মারাত্মক ভেজাল সৃষ্টি করছে। ফলে খাদ্যের মান, ভিটামিন নষ্ট হচ্ছে। নির্ভেজাল আর তাজা খাদ্যকে ভেজাল ও মান নষ্ট করে বাজারে উচ্ছমূল্যে সরবরাহ করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে অসাধু ব্যবসায়ীগণ। তাদের দৌরাত্ম আর ভোগান্তি থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করতে হবে। ভোক্তার অধিকার সহজ ও নিশ্চিত করতে হবে। ভোক্তার অধিকার আইন যথাযতভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা জনগণ ভোগ করতে পারে। দোকান, বাজার, মার্কেটে ঘোষণা ছাড়া মনিটরিং থাকতে হবে। দেখা যায় একই বাজারে একই মূল্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য তালিকা। অনেক দোকানে মূল্য তালিকা টাঙ্গানো হয় না। দোকানির কথামত ক্রেতাকে পণ্য মূল্য দিতে হচ্ছে। কোনো কথায় তাদের উচ্চমূল্য কমানো যায় না। যার যার খুশিমত তাদের পণ্যমূল্য নিয়ে থাকে। মার্কেট, দোকান, বাজার সব দিকেই নজরদারী রাখতে হবে। ভোক্তাগণ প্রতি নিয়তি দাম ও পণ্যে ঠকছে। ওজনে কারচুপি, পণ্যে ভেজাল, মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্যে ঘষামাজা করে পুনরায় বিক্রি, কোনো অবস্থায় তাদের ভেজাল পণ্য বিক্রি থেকে বাচার উপায় নেই। মরিচ, মসল্লা, চাউল, আঠা, ময়দায় ভেজাল আরো বেশী। ধান, চাউলের উচ্ছিষ্ট দিয়ে ক্যমিক্যাল যুক্ত মরিচ আর মসল্লারগুরি প্যাকেট করে সাধারণ মানুষকে খাওয়াচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। চউল, আঠা ময়দায় ভেজাল, তেলে ভেজাল, মাছ মাংস তরি তরকারীতে ফরমালিন কী খাবে মানুষ! খাদ্যের নামে খাচ্ছে বিষ। মানবদেহে প্রতিনিয়ত বিশ প্রয়োগ করছে। আর শরীরে তৈরী হচ্ছে ক্যন্সার, আলসার, টিওমার ইত্যাদি। হোটেল, রেস্তোরার পোরা তেল, বাসী খাবার খেতে হচ্ছে শহরের খেটে খাওয়া দিন জজুর লাখ লাখ মানুষকে। না খেয়ে কোন উপায় নেই। কাজের জন্য বাঁচার জন্য খেতেই হচ্ছে। নগদ টাকা পয়সা দিয়ে ‘বিষ’ খাওয়া হচ্ছে। আবার এ সব খাদ্যের মূল্য এক পিস মাছ শত টাকা। চার পিছ গোমাংস একশত বিশ টাকা। একপিছ মুরগীর মাংস মূল্য আশি টাকা। এভাবে সব হোটেল রেস্তোরায় ইচ্ছে মতো মূল্যে নিয়ে প্রতারিত করছে জনসাধারণকে পছা বাসি, মাছ মাংস ফ্রিজ থেকে বের করে খাওয়ানো হয় জনসাধারণকে। মাঝে মধ্যে একটা দুটা হোটেল রেস্তোরায় জরিমানা করে শান্ত থাকেন ভ্রাম্যমান প্রশাসন। কিন্তু বছরের ৩৬৫ দিন তারা গলাকাটা মূল্য নিয়ে জনগণকে প্রতারিত করছে। তাদের ভাত, মাছ মাংসের প্রকৃত হিসেব করে মূল্য নির্ধারণ হয় না। খরচের অনেক গুণ বেশী হোটেল রেস্তোরায় খাবার বিল নেয়া হয়। এ সব হোটেল রেস্তোরায় খাবার মূল্য নির্ধারণ হওয়া দরকার। মূল্য নির্ধারণ না থাকায় হোটেল খাবারে খুব বেশী মূল্য নেয়া হয় ক্রেতার নিকট থেকে। অনন্য উপায় হয়ে যাদের হোটেলে খেতেই হয় তারা সর্বদা হয় ভোগান্তিন শিকার। এ সকল হোটেল রেস্তোরায় অযৌক্তিক মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার। বেকারী খাদ্যে মূল্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে। একেক বেকারী এক এক ধরণের মূল্য নিচ্ছে। তাদের পণ্যের মধ্যে মূল্য ঠিক কোন্ কোন্ জায়গায় তফাত সেটা ক্রেতাগণ বুঝতে পারে না। পণ্যের ভিতরের চেয়ে উপরের মলাট চক চকে, এখানেই তাদের চাহিদা আর মূল্য বেশী। আমাদের দেশের খাদ্যে বাজার খুবই অনিয়ন্ত্রিত। মানহীন বাজার, ইচ্ছেমতো মূল্য। বি,এস,টি,আই খাদ্যের মান রক্ষায় তাদের ভূমিকা নিয়েও জনগণের ব্যাপক অভিযোগ আছে। তাদের যথাযত ভূমিকার অভাবেই খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলে সচেতন মহলের অভিমত। মানুষের মেধা, শক্তি, বৃদ্ধি কর্মক্ষমতা সব কিছুর মূলে সঠিক নির্ভেজাল খাদ্যের প্রয়োজন সর্ব প্রথম। এ চাহিদার অপূরণ হলেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার শারীরিক শক্তি থাকে না। খাদ্যে ভেজালের কারণে নানা ধরণের রোগের জন্ম নেয় শরীরে। তা হলে সব কিছুর মূলেই নির্ভেজাল খাদ্য মানবদেহের জন্য দরকার। এর প্রয়োজনীয় সরবরাহ যোগান উৎপাদন তদারকী নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কখনো রাষ্ট্র অবহেলা করতে পারে না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলার জন্য সুস্থ সবল থাকার জন্য নির্ভেজাল খাদ্য সরবরাহ থাকতে হবে। সরবরাহ বিপণন রাখতে হবে। অসাধু কৃত্রিম সংকটসৃষ্টিকারী তথাকথিত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনে পবিত্র রমজান মাস। এখন থেকেই পণ্য মওজুদ করে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র করতে পারে। এ সুযোগ যেন তারা না পায় স্থানীয় ও জাতীয় প্রশাসনকে তদারকী বাড়াতে হবে। সব কিছুর আগে খাদ্যের সংরক্ষণ চাহিদা পূরণে সরকারকে সর্বোচ্চ ভূমিকা ও দায়িত্ববোধ দেখাতে হবে। চাউলসহ কোন পণ্যের মূল্যে আযৌক্তিক ভাবে বাড়তে দেয়া যাবে না। সকল পণ্যের মওজুদ, সরবরাহ জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। সরকারসহ সব সংস্থাকে খাদ্যে নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। লেখক: সংগঠক, গবেষক, কলামিষ্ট।

Leave a Reply