হাওরের বাঁধ নির্মাণে জড়িত দুর্নীতিবাজদের ক্ষমাও করা যাবে না: রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ

আবেগ রহমান, সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে, ১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন বোরো ফসলী হাওরের বেরীবাঁধে বরাদ্দের টাকা নিয়ে যারা দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িত  সেই সব  দুর্নীতিবাজ ও লুটপাটকারীদের কোন অবস্থাতেই ছাড় দেয়া যাবেনা, তাদেরকে কোন ধরণের ক্ষমাও করা যাবেনা।’ চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জ হাওর এলাকায় বাঁেধর বরাদ্দের টাকা নিয়ে বাঁধ অসমাপ্ত রেখে হাওরের লাখ লাখ কৃষককের সারা বছরের একটি মাত্র বোরো ফসল ডুবিতে ভুমিকা রেখেছেন সেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা, ঠিকাদার ও পিআইসি সহ যারাই দুর্নীতির সাথে জড়িত রয়েছে তাদেরকে কোন ধরণের ক্ষমা করা যাবেনা।
সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও ওপারের ঢলে ধেয়ে আসা পানিতে অসমাপ্ত বেরীবাঁধ দিয়ে পানি ডুকে সুনামগঞ্জ- ও কিশোরগঞ্জ জেলার সব কটি বোরো ফসলী হাওর ডুবিতে ক্ষতিগ্রস্থ্য হাওর এলাকা ও কৃষক পরিবারের দুর্ভোগ সরজমিনে দেখতে  তিন দিনের সফরের দি¦তীয় দিন সোমবার সন্ধা সাড়ে ৭টায়  সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন।
তিনি আরো বলেন, জেলার সব জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বস্তরের লোকজনই যখন বলছেন বেরীবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে তখন আগে থেকেই সাবই মিলৈ প্রতিবাদ করলে আজ বছরের একমাত্র বোরো ফসল হাড়িয়ে লাখ লাখ কৃষক পরিবারে দুর্ভোগ দুর্দশা নেমে আসত না।
রাষ্টপতি আবদুল হামিদ বলেন, যে কোন উপায়ে সরকারের পাশাপাশী সবাইকে ক্ষতিগ্রস্থ্য কৃষক পরিবারের পাশে সহায়তার হাত প্রসারিনত করে তাদেরকে পুন:বার্সন করতে হবে। সরকারি সহায়তার পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে, আগামী বোরো পসল না উঠা পর্য্যন্ত সব ধরণের কৃষি উপকরণ কৃষকদেও সরবরাহ করার পাশাপাশী তাদের দুরবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে সারা বছর ফেরার প্রাইজের চাল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ন্যায্য মুল্যে প্রাপ্তির সুবিধা, ভিজিএফ ভিজিডি পরিমাণ বাড়িয়ে তা অব্যাহত রাখা সহ ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পুন:বাসনের জন্য সরকারের সকল মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক করব এবং জাতীর জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে হাওর পাড়ের কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া তাদেও দুর্ভোগ দুর্দশা লাঘবে যা যা করণীয় সবই করার কথা বলব। তিনি আরো বলেন পর্যায় ক্রমে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় অর্থ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য , ত্রাণ ও দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীদ্বয়কে সফরের কথা বলব।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জেলার বরণ্যে রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মুতি চারণ করতে গিয়ে মরহুম দেওয়ান ওবায়দুর রাজা,  প্রয়াত বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি, কমরেড বরুণ রায় এমপি, মরহুম
হোসেন বখত, মরহুম আবদুজ জহুর  এমপি সহ সকল প্রয়াত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের প্রতি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মাতৃভৃমিকে রক্ষায় আমি নিজ উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধেও ৫ নং সেক্টরের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পে থাকা ৪ নং সাব- সেক্টরে এসে মুক্তিযুদ্ধাগণকে সংগঠিত করি নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করি ঠিক আজও হাওর তীরের লাখ লাখ কৃষক পরিবারের দুর্দশার কথা জেনে নিজেকে চার দেয়ালের ভেতর ধরে রাখতে না পেরেই নিজ উদ্যোগেই সুনামগঞ্জ এসেছি কেউ আমায় দাওয়াত করে আনেননি এসেছি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত আমার লাখ লাখ ফসল হারা কৃষক ভাইদেও দু:খ দুদর্শা স্বচক্ষে দেখে তাদেরকে পুন:বাসনে যা করণীয় তা নির্ধারণ করতে ও  তাদেরকে সাহস জোগাতে। প্রায় টানা দেড় ঘন্টার অধিক সময় রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন সুদী সমাবেশে।
জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপির সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, মুহিবুর রহমান মানিক এমপি, ড. জয়া সেনগুপ্তা এমপি,  মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সংরক্ষিত মহিলা আসনের অ্যাডভোকেট শামসুন্নার বেগম শাহানা রব্বানী এমপি, পীর ফজলুর রহমান মিছবাহ এমপি,   সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. কামরুল আহসান বিপিএম, জেলা প্রশাসক শেখ মো. রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, পৌর মেয়র আইয়ুব বকত জগলুল, উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ইদ্রীস আলী বীর প্রতীক, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ (বড় ভাই), অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু, সুনামগঞ্জ প্রতিদিনের সম্পাদক কামরুজ্জামান চৌধুরী শাফি, সুনামকন্ঠের সম্পাদক বিজন সেন রায় প্রমূখ। সমাবেশের পুর্বে বিকেলে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘর পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রপতি। রাত সাড়ে ১১টায় সুধী সমাবেশ সমাপ্ত হলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ রাত্রী যাপনের জন্য সার্কিট হাউসে উদ্দেশ্যে শিল্পকলা একাডেমি ত্যোগ করেন।
রাষ্ট্রপতিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইনস মাঠে বেলা দুপুর আড়াইটায়  অবতরণ করে।  সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ ৮৮ বন্যার সময় প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রথম বারের মত সুনামগঞ্জ সফর করেছিলেন। এর পর  ২৮ বছর পর দেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জেলার সব ক’টি উপজেলার অসামাপ্ত বেরীবাঁধ দিয়ে পানি ডুকে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হাওর ও কৃষক পরিবারের দুর্ভোগের চিত্র সরজমিনে পরিদর্শন করতে সোমবার সুনামগঞ্জ সফরে আসেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতির পুত্র কিশোরগঞ্জ -৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজোয়ান আহমদে তৌফিক এমপিও রাষ্ট্রপতির সাথে সুনামগঞ্জ সফরে আসেন।
এর আগে দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রপতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন এলাকা থেকে লো-ফ্লাইং ফ্লাইটে পানিতে তলিয়ে যাওয়া হাওর পরিদর্শন করতে নেত্রকোণা যান। সেখান থেকে তিনি সুনামগঞ্জের তলিয়ে যাওয়া বোরো ফসলী হাওর পরিদর্শন করে দুপুর আড়াইটায় হেলিকপ্টার থেকে নেমে  সরাসরি সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইন্স থেকে সার্কিট হাউসে যান।
১৯৭১ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ  মুক্তিযুদ্ধের ৫ নং সেক্টরের তাহিরপুরের  ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের ৪ নং সাব – সেক্টরে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন মুক্তিরুদ্ধের একজন  সংগঠক হিসাবে দায়িত ¡পালন করেন।

Leave a Reply