চট্টগ্রামে পুলিশ-ছাত্রলীগ সংঘর্ষে রণক্ষেত্র, আহত অর্ধশত

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার: চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়িতে সুইমিংপুল নির্মাণকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কাজীর দেউড়ি মোড়ে আউটার স্টেডিয়াম এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ চলাকালে আউটার স্টেডিয়াম, কাজীর দেউরী, লালখানবাজার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে ৩ পুলিশসহ অন্তত অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কাজীর দেউরি মোড়ের কাছে ছাত্রলীগের মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচির এক পর্যায়ে এই সংঘর্ষ বাঁধে। এর জের ধরে বিকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মেহেদীবাগ, গোলাপাহাড়, সিইজি মোড়সহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে দোকানপাট, যানবাহন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
কোতোয়ালী থানার ভারপাপ্ত কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন জানান, পুলিশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সুইমিং পুলের মধ্যে ঢুকতে না দিলে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। সংঘর্ষের এ ঘটনায় দুইজন পুলিশ আহত হয়েছে বলে জানান তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে ‘সুইমিংপুল নির্মাণে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন থেকে সুইমিংপুল নির্মাণের ঘোষণা দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা স্টেডিয়াম চত্বরে জড়ো হয়ে সুইমিংপুল নির্মাণের বিরোধিতায় নামেন। আর এই বিরোধিতা ঠেকাতে গিয়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগকর্মীরা আশপাশের অন্তত ৫০টিরও বেশি দোকান ও গাড়ি ভাংচুর করেছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, দুপুর ১টা থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আউটার স্টেডিয়ামে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করে। তারা পুলিশের বাধায় আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুল নির্মাণ এলাকায় প্রবেশ করতে না পেরে সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ধরে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ভাংচুর করা হয় বেশ কয়েকটি গাড়ি। পরে পুলিশ শটগানের গুলি ছুড়ে ছাত্রলীগকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুনরায় বিকেল চারটা থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে আউটার স্টেডিয়ামের প্রবেশমুখে আসতে থাকে। কিন্তু আগে থেকেই প্রবেশমুখে পুলিশের অবস্থানের কারণে তারা সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে তারা সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করতে থাকে। সমাবেশ শেষে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আউটার স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা টিনের বেস্টনী উপড়ে নির্মাণসামগ্রী ভাংচুর করে এবং পুলিশের উপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউণ্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। লালখান বাজার থেকে আসকারদীর্ঘ সড়ক ও কাজীর দেউরী থেকে নিউ মাকের্ট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।
এ ঘটনায় পুলিশের দুজন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। এদের একজনের পায়ে গুলি এবং আরেকজনের মাথায় ইটের আঘাত লেগেছে। ছাত্রলীগের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মীও পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়েছেন বলে ছাত্রলীগের দাবী।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির দাবি, এ সময় ছাত্রলীগের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ এবং আরও অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। কাজীর দেউড়ি ছাড়াও নগরীর মেহেদীবাগ, গোলপাহাড়, লাভলেইন, নিউমার্কেটসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক ভাংচুর করেছে। সড়কের উপর টাইয়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা ব্যাপক গাড়ি ভাংচুর চালায়।
প্রসঙ্গত, গত ১০ এপ্রিল লালদিঘীর সমাবেশে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সুইমিংপুল নির্মাণ বন্ধের জন্য ১৫ দিনের সময় বেধেঁ দেন; অন্যথায় সন্তানরা গিয়ে স্থাপনা ভেঙে দেবে বলে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন। এর আগে গত রোববার সুইমিংপুল নির্মাণ বন্ধ করতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয় মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারী নগর ছাত্রলীগের নেতারা। এর মাঝেই মঙ্গলবার দুপুরে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের সম্মেলনক্ষে সুইমিংপুলের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সুইমিংপুল নির্মাণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় সুইমিংপুল বাস্তবায়ন কমিটি।
‘সুইমিং পুল নির্মাণে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সুইমিংপুল নির্মাণ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আলী আব্বাস জ্ঞানের অভাবে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট নয় এমন কিছু ব্যক্তি এবং সংগঠন শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরেই চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিংপুল নির্মাণের বিরোধিতা করছে বলে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করেন।
এর মাত্র কয়েকঘণ্টা পরই সুইমিং পুল ইস্যুতে মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারী নগর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে পুলিশের সংঘর্ষের এই ঘটনা ঘটল।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম জানান, গুরুতর আহত ছয়জনের মধ্যে কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শকসহ (এসআই) দুজন পুলিশ সদস্য এবং বাকি চারজন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। এসআই শহিদের রহমানের কপালের বাঁ দিক ফেটে গেছে। আর কনস্টেবল পিংকু দের শরীরে ছররা গুলি লেগেছে। এ ছাড়া নগর ছাত্রলীগের মানবসম্পদ ও উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক লিটন চৌধুরীসহ আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা চলছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাইন হোসেন জানান, মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বন্দরনগরীর কাজীর দেউরি মোড়ের কাছে ছাত্রলীগের মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচির এক পর্যায়ে এই সংঘর্ষ বাঁধে।
প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ধরে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ভাংচুর করা হয় বেশ কয়েকটি গাড়ি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আউটার স্টেডিয়ামে একটি সুইমিংপুল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্রলীগ এ সুইমিংপুল নির্মাণে বাধা দেয়। রবিবার এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সুইমিংপুল নির্মাণ বন্ধে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন ছাত্রলীগ নেতারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বিকেলে সড়ক অবরোধ করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এ সময় বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।
নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আউটার স্টেডিয়াম সংকুচিত করার প্রতিবাদে আমরা কর্মসূচি দিয়েছিলাম। রাস্তায় গাড়ি বন্ধ করে আমরা কর্মসূচি পালন করতে চাইনি। কারণ, এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয়। আমরা মাঠের ভেতরে কর্মসূচি করতে চাইলে পুলিশ আমাদের দিকে গুলি ছোড়ে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ এবং আহত হয়েছেন।

Leave a Reply