সরকারবিরোধী আন্দোলনও জমিয়ে তুলতে পারেনি ২০ দল

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৭ এপ্রিল ২০১৭, সোমবার: বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রায় চার বছর পার করল। কিন্তু এই জোট এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেনি। সরকারবিরোধী আন্দোলনও জমিয়ে তুলতে পারেনি। অনেকে বলেন, বিএনপিসহ মাত্র গোটা চারেক দল ছাড়া জোটের অন্য দলগুলোর সারা দেশে নেটওয়ার্ক নেই। এমনকি পুরো কেন্দ্রীয় কমিটি নেই। এসব দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেই কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি। বিএনপির কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ২০ দল নিয়ে তাদেরও ক্ষোভ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন তাদের ক্ষোভের কথা। তারা বলেছেন, যারা আমাদের ‘নখের’ যোগ্যতা রাখে না, তারাই কেবল ‘জোট নেতা’ হওয়ার কারণে বড় সমাবেশ হলে ‘ম্যাডামের’ (খালেদা জিয়া) আশপাশে বসেন, বক্তৃতা করার সুযোগ পান। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখুন, এসব দল দিয়ে না হয় কোনো আন্দোলন, আর না বাড়ে সমাবেশে লোক। তাদের অভিযোগ, রাজনীতিতে ‘অপরিচিত ও আনকোরা’ এসব নেতার আবার দলের ভালো জনপ্রিয় লোকদের পরিবর্তে নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে হয় কেবল জোট নেতা বলে। আমাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তারা দিব্যি শিকার করে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের এসব নেতার অভিযোগেরও কমতি নেই। তারাও নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, আমরা ছোট দল হতে পারি। কিন্তু কোনোভাবেই আমাদের ঠেলে ফেলে দিতে পারবে না। আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা আমাদের সামর্থ্য নিয়ে উপস্থিত থাকি। কিন্তু বিএনপি নেতারাই উপস্থিত থাকেন না। আমাদের না জানিয়েই অনেক সময় ২৯ দলীয় জোটের নামে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টি চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নীলু এ লেখককে জোট

চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ করেছেন। তিনি জোট থেকে চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে জানান, ‘আমরা যে জোটে আছি তা বুঝতেই পারতাম না। মাস ও বছরে কয়েকটি বৈঠক হতো মাত্র। ওই সব বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হতো না। চা-নাশতা খাইয়ে, হাসি-ঠাট্টা করে বৈঠক শেষ হতো। পরে আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হতো।’ তিনি বলেন, এভাবে তো কোনো জোট চলতে পারে না।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে চারদলীয় জোটের পরিসর বাড়িয়ে ১৮ দলীয় জোট গঠন করেছিল বিএনপি। এরপর এরশাদের সঙ্গ ত্যাগ করে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি যোগদান করলে ১৮ দলীয় জোট ১৯ দলে রূপ নেয়। ২০১৪ সালের ৩ জুন দিলীপ বড়–য়ার সঙ্গ ছেড়ে সাম্যবাদী দলের একাংশের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমদের নেতৃত্বে যোগ দিলে ১৯ দলীয় জোট ২০ দলে রূপ লাভ করে।
এর মধ্যে কয়েক মাস আগে জোট থেকে বেরিয়ে যায় শেখ আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ভাসানী। পরে অবশ্য আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ভাসানী জোটে থেকে যায়। শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বে এনপিপি জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও দলের নেতা ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে একটি অংশ ওই নামেই ২০ দলে থেকে যায়। একইভাবে আবদুল লতিফ নেজামী ২০ দল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাওলানা আবদুর রকিবের নেতৃত্বে আলাদা কমিটি করে জোটে থেকে যায় একটি অংশ। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, জোটের ‘একটি দলও কমেনি’। বিএনপি জোটের অন্য দলগুলো হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিশ, বিজেপি, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, জাগপা, এনপিপি, এনডিপি, লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস লীগ ও ডেমোক্রেটিক লীগ।
আসলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এখন শুধুই ফটোসেশন-নির্ভর। গুলশান কার্যালয়েও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠক আর গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশেই সন্তুষ্ট তারা। এর মধ্যে আবার নিবন্ধন নেই বেশ কয়েকটি দলের। নিজস্ব কোনো রাজনীতিও নেই। অধিকাংশই এক নেতার এক দল। এমনও দল আছে যার সভাপতি নেই। আবার সভাপতি থাকলেও নেই সাধারণ সম্পাদক।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘নামসর্বস্ব দল শুধু বিএনপি জোটেই নয়, আওয়ামী লীগ জোটেও আছে। সবাই যে সমান শক্তিশালী হবে এমনও নয়। তবে যাদের নিবন্ধন নেই আমরা তাদের বলেছি, নিবন্ধন করতে। বিএনপির আলোয় আলোকিত−এটা অনেকটাই সত্য। জোট সম্প্রসারণের চিন্তাভাবনা চলছে। নিবন্ধিত অনেক দলের সঙ্গেই যোগাযোগ হচ্ছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তবে জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, জোট বিএনপির আলোয় আলোকিত−এটা আংশিক সত্য, পুরোটা নয়। কল্যাণ পার্টি ২০০৮ সালে যখন নিবন্ধন নেয় তখন জোটে ছিল না। নিজের যোগ্যতায় নিবন্ধন নিয়েছে। তবে জোটে অনেক দল আছে যারা এখনো নিবন্ধন নিতে পারেনি। জোটে বর্তমানে কর্মকা- সীমিত, এটা বাস্তব। এর কারণ হলো প্রধান শরিক বিএনপি ক্ষমতাসীন সরকারের হামলা-মামলায় নিজেদের আত্মরক্ষায় ব্যস্ত।’
২০ দলীয় জোটের মধ্যে দলীয়ভাবে বিপদে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিএনপিও তাদের নিয়ে রয়েছে ‘না-ঘরকা না-ঘটকা’ অবস্থায়। ঢাকাসহ সারা দেশে তাদের দলীয় অফিস বন্ধ। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেককেই ‘যুদ্ধাপরাধের’ দায়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে। সংগঠনের সারা দেশে বহু নেতাও হয় যুদ্ধাপরাধের দায়ে আটক কিংবা অন্য কোনো কারণে জেলবন্দি। এমতাবস্থায় জামায়াতে নিয়ে কোনো আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে পারছে না বিএনপি। সর্বশেষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নির্বাচন মনিটরিং সেলে জামায়াতকে নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ২০ দলীয় জোট কেবল নামেই আছে, কাজে নেই।

Leave a Reply