ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে চলছে নানামুখী তৎপরতা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৬ এপ্রিল ২০১৭, রবিবার: ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে চলছে নানামুখী তৎপরতা। এ কারণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি চূড়ান্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে দলের হাইকমান্ড। অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কমিটি চূড়ান্ত করতে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে, ফলে আটকে আছে কমিটি ঘোষণা। পর্দার আড়ালে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় দফায় দফায় পরিবর্তন করা হচ্ছে খসড়া কমিটির শীর্ষপদে। জানা গেছে, আজ যাকে উত্তরের সভাপতি করা হচ্ছে কাল তাকে বানানো হচ্ছে দক্ষিণের সভাপতি। পরদিন দেখা গেল, কোনো কমিটিতেই তার নাম নেই। এক কান দুই কান করে এসব খবর আবার ছড়িয়েও পড়ছে নিচ পর্যন্ত। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এ ইউনিটের কমিটি গঠন নিয়ে এই নানামুখী তৎপরতার পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে জল্পনা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিকে নিজের বলয়ে রাখতে এই সিন্ডিকেটে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন মীর্জা আব্বাস। এ তৎপরতায় যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা ছিটকে পড়ছেন। বাদ দেয়া আর কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির এ খেলায় অনৈতিক সুবিধা দেয়া-নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, পছন্দের লোকদের শীর্ষপদে আনতে টাকার মেশিন নিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে মীর্জা আব্বাসের অনুসারী একটি শক্তিশালী গ্রুপ।
এদিকে কমিটি গঠন নিয়ে এমন ইঁদুর-বিড়াল খেলায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ মহানগরের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দু’ভাগ করে যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার মধ্য দিয়ে মহানগরের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর যে স্বপ্ন তারা দেখছিলেন, এসব তৎপরতায় তা দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। মহানগরের অনেক নেতা ক্ষোভে-দুঃখে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছেন। হাল ছেড়ে দিচ্ছেন পদপ্রত্যাশী কয়েকজন ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাও। মীর্জা আব্বাসের এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবল থেকে সম্ভাব্য নতুন কমিটিকে মুক্ত করতে হাইকমান্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।
সরকারবিরোধী দুই দফা আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা মহানগরকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। সংগঠনে গতি আনতে উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুই ভাগ করা হয় ঢাকাকে। এ দুই ভাগের সম্ভাব্য কমিটির তালিকা করতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া। ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস, যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আউয়াল মিন্টু, স্থায়ী কমিটি ও মহানগরের সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালামসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা কয়েক মাস কাজ করে একটি তালিকা করেন। শুধু উত্তর-দক্ষিণ নয়, ৪৯টি থানা ও একশ’ ওয়ার্ড ও সাতটি ইউনিয়নের সম্ভাব্য কমিটিও তৈরি করা হয়। সব গ্রুপের নেতাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি করা এ তালিকা গত নভেম্বরে খালেদা জিয়ার কাছে তুলে দেয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে মহানগরের অপর প্রভাবশালী নেতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাও সম্ভাব্য একটি তালিকা পাঠান। আব্বাস ও খোকার তালিকায় বড় ধরনের অমিল দেখা যায়নি। পরে দলের চেয়ারপারসন দুই তালিকা সমন্বয় করে সম্ভাব্য কমিটি করার নির্দেশ দেন। চেয়ারপারসনের নির্দেশনামতে, সব পক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণের কমিটির খসড়া তৈরি করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
সূত্র জানায়, সম্ভাব্য ওই কমিটিতে উত্তরের সভাপতি হিসেবে আবদুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক এমএ কাইয়ুম, আর দক্ষিণে সভাপতি হিসেবে হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক ইউনুস মৃধা ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিবের নাম প্রস্তাব করা হয়। ইউনুস মৃধার পরিবর্তে হাবিবকে সাধারণ সম্পাদক করার পক্ষেও মত ছিল। সম্ভাব্য এ কমিটিতে আব্বাস ও খোকার মৌন সম্মতিও ছিল। কিন্তু কমিটি চূড়ান্ত করার আগেই মীর্জা আব্বাসের ইশারায় তৎপর হয়ে ওঠে সিন্ডিকেটটি। পছন্দের লোকদের শীর্ষপদে আনতে তারা পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়তে থাকে।

সাবেক কমিশনার আহসান উল্লাহ হাসানকে ঢাকা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক করাসহ আরও কয়েক নেতাকে সুপার সেভেনে আনার এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করতে থাকে। হাসানকে নেতৃত্বে আনতে আবদুস সালামকে উত্তর থেকে সরিয়ে দক্ষিণের সভাপতি করার প্রস্তাব করা হয়। উত্তরে এমএ কাইয়ুমকে সভাপতি ও হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করতে তোড়জোড় শুরু করে ওই শক্তিটি। মীর্জা আব্বাসের ইশারায়া উত্তরের সভাপতি হিসেবে তাবিথ আউয়ালের নাম আবারও আলোচনায় উঠেছে। তবে এমন প্রস্তাবের খবরে মহানগর নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সালামকে দক্ষিণে নেয়ার প্রস্তাবে হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে শুরু করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। সোহেলের মহানগরের দায়িত্বে থাকার সিদ্ধান্তে আরও বেকায়দায় পড়েন তারা। দক্ষিণে সালাম ও সোহেল কমিটির প্রস্তাব করলে তাতে বিরোধিতা করেন আব্বাস। মহানগরের দায়িত্বে থাকলেও দক্ষিণে আব্বাসের প্রভাব বেশি। এ প্রভাব ধরে রাখতে দক্ষিণের শীর্ষ দুটি পদের একটিতে তার আস্থাভাজন লোককে দেখতে চান তার সমর্থকরা। সালাম ও সোহেল দু’জনই আব্বাস সমর্থক না হওয়ায় আবারও নতুন করে ভাবতে হয় সংশ্লিষ্টদের। আব্বাসের ইশারায় সালামকে বাদ দিয়ে আব্বাস সমর্থক সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি ও সোহেলকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব করা হয়। তবে সম্ভাব্য এ কমিটির পক্ষে খোকার পুরোপুরি সমর্থন নেই। সাধারণ সম্পাদক পদে তার আস্থাভাজন সাবেক কমিশনার নবীউল্লাহ নবীকে চান তিনি। সে ক্ষেত্রে সোহেল ও নবী কমিটি করার পক্ষে খোকা। আব্বাস ও খোকাকে খুশি রাখতে গিয়ে সালামকে বলির পাঠা বানানোর চেষ্টা করছে ওই সিন্ডিকেটটি। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাই সালামকে মহানগরের দায়িত্বে রাখার পক্ষে। সালামের অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চান তারা। সালামের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, একবার উত্তর আবার দক্ষিণ- হাইকমান্ডের এমন চিন্তাভাবনায় বিব্রত সালাম। তবে উত্তর-দক্ষিণ যেখানেই রাখা হোক তা নিয়ে আপত্তি নেই তার। তবে শেষ পর্যন্ত মীর্জা আব্বাসের ইশারায় মহানগর থেকে ছিটকে পড়লে সালাম রাজনীতিতে সক্রিয় থাকবেন কিনা তা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
এদিকে দক্ষিণের কমিটিতে হঠাৎ করে মীর্জা আব্বাসের অনুসারী ইউনুস মৃধার নাম আলোচনায় উঠে আসায় নেতাকর্মীদের মাঝে বেশ ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নেতাকর্মীরা জানান, যে ব্যক্তির থানা কমিটির সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা নাই, তাকে কিভাবে মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হচ্ছে।
নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মীর্জা আব্বাস নিজ আসনের নমিনেশন টিকিয়ে রাখতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করতে চাচ্ছেন। তাই, ইউনুস মৃধার মতো নিষ্ক্রিয়রা এখন আলোচনায়।
ওয়ার্ড ও থানা কমিটিতে পদ দেওয়ার কথা বলে ইউনুস মৃধার বিরুদ্ধে অর্থ বাণিজ্যের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ২০১৩ – ২০১৪ সালে আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যখন বিএনপি নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় অবস্থানে তখন ইউনুস মৃধা ছিলো পুরো নীরব। তৎকালীন সময়ে তার এই নীরব ভূমিকা নিয়ে মীর্জা আব্বাস ফোনে বিএনপির সিনিয়র মহাসচিব তারেক রহমানকে জানায়।
তবে, নিজ আসনে মীর্জা আব্বাস নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে নিষ্ক্রিয় ইউনুস মৃধাকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই বিষয় নিয়ে মীর্জা আব্বাসের সাথে বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে দলের আরো দুইজন প্রভাবশালী নেতার সাথে বাক বতিন্ডা হয়। এমনকি ইউনুস মৃধাকে যদি সাধারণ সম্পাদক করা নয় হয়, তবে দলীয় পদ থেকে স্বয়ং মীর্জা আব্বাস পদত্যাগ করবেন বলেও দলীয় হাই কমান্ডকে জানান বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করছেন, অযোগ্য ও অপরিচিত ইউনুস মৃধাকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করা হলে দলে বিভক্তি ও তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হবে।

Leave a Reply