শুভ নববর্ষ

মোঃ দিদারুল আলম, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭, বৃহস্পতিবার: বঙ্গাব্দের সূচনা বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালো মত হলো মোঘল স¤্রাট আকবরের সময় প্রচলিত হিজরী চন্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স¤্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞার্নী আমির ফতুল্লাহ সিরাজীকে হিজরী চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ফতুল্লাহ সিরাজীর সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে স¤্রাট আকবর হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। মূল হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্র মাসের ওপর নির্ভরশীল। সৌর বৎসর ৩৬৫দিন এবং চন্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন হওয়ার কারণে সৌর বৎসরের চেয়ে চন্দ্র বৎসর ১১ দিন কম হয়। তৎকালীন বাংলায় কর আদায় সহজ করার জন্য মূলত: বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রচলন হয়। চন্দ্র বর্ষপঞ্জি বাংলা তথা ভারতে চাষাবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। অসময়ে কর দেয়ার কারণে দরিদ্র কৃষকদের জীবন দূবিসহ হয়ে উঠেছিল। প্রাথমিকভাবে বঙ্গাব্দের মাসগুলো নেয়া হয়েছিল সংস্কৃত থেকে এবং সে অনুযায়ী নামকরণ করা হয় ‘ফসলী সন’। পরবর্তীতে এর নাম হয় বঙ্গাব্দ। স¤্রাট আকবর তাঁর সিংহাসনে আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরী সালের মহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। অনেকের মতে রাজা শশাঙ্ক ৫৯৪খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন।
যেকোন জাতির খাদ্যাভ্যাস তার সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। বাঙ্গালিদের বলা হয় মাছে-ভাতে বাঙ্গালি। এর অর্থ বাঙ্গালির প্রধান খাদ্য ভাত ও মাছ। বাংলাদেশের সর্বত্র যেমন ধান উৎপন্ন হয় অনুরূপ দেশের সর্বত্র বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এ সকল প্রজাতির একটি হলো ইলিশ। ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ এবং এটি প্রজননের সময় মিঠা পানিতে এসে ডিম ছাড়ে। ইলিশ মাছ সারা বছর প্রজনন করে থাকলেও সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে বাংলা আশ্বিন মাসের শেষ সপ্তাহ হতে কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহ অবধি। আমাদের মৎস্য চাহিদার প্রায় ১২% মিটানো হয় ইলিশ মাছ হতে। আমাদের দেশে সাধারণত বর্ষাকালে নদ-নদীতে ইলিশ মাছের বিচরণ দেখা যায়। আর এ কারণে সে সময়ই সর্বার্ধিক সংখ্যক ইলিশ ধরা পড়ে। বর্তমানে সমুদ্র হতে যান্ত্রিক ট্রলারের মাধ্যমে মাছ আহরণের কারণে সারা বছরই সামুদ্রিক ইলিশ পাওয়া যায়; তবে এগুলো বর্ষাকালে নদ-নদীতে প্রাপ্ত ইলিশের চেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির হয়ে থাকে।
গ্রামাঞ্চলে অতীতে কৃষকদের মধ্যে যে দারিদ্রতা ছিল বর্তমানে তার অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ কৃষকের বাড়ী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসার কারণে এবং অনেকের বাড়ীতে ফ্রিজের সংস্থান হওয়ায় এখন আর আগেকার মতো আহার পরবর্তী যে খাবার অবশিষ্ট থাকে তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রাখার কারণে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাছাড়া বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদে ব্যাপকভাবে কলের লাঙ্গলের প্রচলন হওয়ায় জমি চাষে অতীতের ন্যায় হালের ব্যবহার একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছে। কলের লাঙ্গলের চাষে কৃষকের পরিশ্রম না হওয়ার কারণে শরীর হতে ঘাম নির্গত না হওয়ায় লবণ ও পানির অভাব ঘটার উপক্রম হয় না। আর তাই আগেকার মতো এখন কৃষকের পান্তা ভাত খাওয়ারও অবকাশ ঘটে না।
আমাদের দেশের কৃষক কখনো ভাতের সাথে ইলিশ মাছকে তাদের প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেনি। কৃষকের ভাতের সাথে ইলিশ মাছ খাওয়াটা অনেকটা এর প্রাপ্যতা ও তাদের সামর্থের ওপর নির্ভর করে। অতীতে যেমন কৃষক মাটির শানকিতে ভাত খেতো এখন খুব কম কৃষকই পাওয়া যায় যারা মাটির শানকিতে ভাত খাওয়ার অভ্যাস আঁকড়ে ধরে আছে। কৃষকের মাটির শানকিতে ভাত খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগের মূল যে কারণ তা হলো তাদের আর্থিক অসচ্ছলতার অবসান।
আমাদের দেশ অতীতে যতটা না কৃষি নির্ভর ছিল বর্তমানে তা ক্রমহ্রাসমান। এরপরও দেশের এক ব্যাপক জনগোষ্ঠি এখনো কৃষি কাজকেই জীবীকার বাহন হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। আমাদের কৃষকের যে খাদ্যাভ্যাস তা-ই বাঙ্গালির খাদ্যাভ্যাস। আমাদের দেশের জনমানুষের বাংলায় বসবাস এবং বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই তাঁরা বাঙ্গালি। বর্তমানে বাঙ্গালি জাতি মুসলিম ও হিন্দু দু’টি পৃথক ধর্মাবলম্বী হলেও উভয়ের অতীত মাছে-ভাতে বাঙ্গালি হতে বিচ্যুত নয়। স¤্রাট আকবরের বাংলা এখন বিভাজিত হয়ে এর একটি অংশ ভারতের পশ্চিম বঙ্গ তথা বাংলা রাজ্য এবং অপরটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। উভয় বাংলার জনমানুষ পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালন করলেও অনুষ্ঠানের আড়ম্বরতায় বাংলাদেশ পশ্চিম বঙ্গ তথা বাংলা রাজ্য হতে এগিয়ে রয়েছে।
আমাদের দেশের শহুরে জনমানুষের একটি অংশের মধ্যে দেখা যায় পহেলা বৈশাখ এলেই দিনটি উদযাপনের জন্য তারা মাটির শানকিতে পান্তা ভাত ও ইলিশসহ বিভিন্ন ভর্তা দিয়ে দিনের আহারের সূচনা করে কৃষকের সাথে একাত্ব হওয়ার প্রয়াস নিয়ে নিজেকে বাঙ্গালির আদিরূপে খুজে পাওয়ার বাসনায় নিমগ্ন হন। বছরের একটি দিন মাটির শানকিতে ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া কৃষক ও বাঙ্গালির সংস্কৃতি নয় এবং কৃষক ও আদি বাঙ্গালিরা কখনো উপলক্ষ্য করে অতীতে মাটির শানকিতে ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খায়নি। আর তাই একটি বিশেষ দিনে শহরের এক শ্রেণীর জনমানুষের পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ্য করে ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া কৃষক ও আদি বাঙ্গালির চরিত্রের সাথে প্রহসন বৈ আর কিছু নয়। সুতরাং এটিকে সংস্কৃতি হিসেবে আঁকড়ে ধরে অপসংস্কৃতিকে সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিজেদের ঐতিহ্য, স্বাতন্ত্র ও স্বকীয়তার বিসর্জন।
বাংলা নতুন বছরকে বরন করে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরে চারুকলা ইন্সটিটিউটে প্রস্তুতি নিয়েছে। রাত জেগে শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য নানা ধরনের শিল্পকর্ম। মঙ্গল শোভা যাত্রা বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে স্থান করে নেয়ায় এবারের আয়োজনকে রাঙিয়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ ও পুতুলে দেয়া হচ্ছে তুলির শেষ আচড়।
পহেলা বৈশাখ বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাঙালি। মঙ্গল শোভা যাত্রা ঘিরে চলছে দিন রাত প্রস্তুতি। রাত জেগে এভাবেই তুলির আচড়ে শিক্ষার্থীরা রাঙিয়ে তুলছেন নানা ধরনের শিল্পকর্ম।পুরনো বছরের জড়াজীর্ণতা ও পঙ্কিলতাকে মুছে ঐক্য আর অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ার বার্তা নিয়ে আসছে নতুন বাংলা বর্ষ ১৪২৪। এবার বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে হাতি, ঘোড়া, মাছ ও পাখির আদল। কেউবা তৈরি করছে বিভিন্ন আকৃতির কাগজের মুখোশ।
প্রতিটি নববর্ষের বিদায়ি মুহূর্তে আগামীর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। বিদায়ি বছর কী কী ব্যর্থতা ছিল, নতুন বছরে এইসব ব্যর্থতা কীভাবে দূর করা যায়, নতুন বছর ব্যক্তি, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য কী করতে পারি, প্রতিটি সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবো কিনা, একজন মুসলিম ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসাবে প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে কী দাবি রাখেÑ এসব নিয়ে পরিকল্পনায় বসা নববর্ষের দ্বিতীয় কাজ।
ইসলাম বলেÑ প্রতিটি ভালো কাজের নিয়ত করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা সফলতার পথ দেখায়; খাঁটি নিয়ত কাজের গতি বৃদ্ধি করে। কাজের শুরুতে নিয়তের গুরুত্ব দিয়েছেন রাসুল সা.। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় প্রতিটি কাজ নিয়তের ওপর নিরভর্শীল।’ [বুখারি : ১/১] অন্য হাদিসে আছে ‘মুমিন বান্দার নিয়ত তার কর্মের চেয়ে উত্তম।’ [বাইহাকি : ১/৮] তাই, নববর্ষে আমাদের নিয়ত ঠিক করতে হবে। পরিকল্পনা সাজাতে হবে। কাজের গতি বৃদ্ধি এবং সঠিকতার জন্য প্রয়োজনে বড়দের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। তাদের সঙ্গে নিজের চিন্তা শেয়ার করে ভালোটা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেব নববর্ষে।
‘সময়’ জীবনের অমূল্য সম্পদ। সময়কে হেলায়-ফেলায় কাটিয়ে দিলে পরজগতে আক্ষেপের সীমা থাকবে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেখানে তারা (অপরাধীরা) চিৎকার করে বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের আবার দুনিয়ায় প্রেরণ করুন। আগে যা করেছি, তা আর করব না। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদের এতটা সময় দিইনি, যাতে উপদেশ গ্রহণ করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীরাও আগমন করেছিল। অতএব, আজাব আস্বাদন করো। জালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ [সুরা ফাতির : ৩৭]। রাসুল সা. বলেন, ‘বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের জীবনের হিসাব নেয় এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করে।’ [মুস্তাদরাক]। ইবনে ওমর রা. বলতেন, ‘তুমি সকালে উপনীত হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁচে থাকার অপেক্ষা করো না এবং সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকাল পর্যন্ত জীবিত থাকার আশা করো না। আর সুস্থ থাকা অবস্থায় অসুস্থ সময়ের জন্য আমল করে নাও এবং জীবন থাকতে মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের পুঁজি সংগ্রহ করো।’ [বুখারি]।
মহাকালের হিসাবে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর সময় খুবই অল্প। দেখতে দেখতে চলে যায় দিন। এর মধ্যেই অনেক কিছু প্রস্তুত করতে হয়। যোগাড় করতে হয় পরজগতের পাথেয়। পৃথিবী হচ্ছে পরকালের শস্যক্ষেত। পরকালের ফসল ফলাবার জন্যই মহান প্রভু পৃথিবীতে আমাদের প্রেরণ করেছেন। যেদিন পৃথিবীতে পরকালের ফসল ফলানো যাবে না, সেদিন পৃথিবীরও কোনো মূল্য থাকবে না। অতএব, দু’দিনের দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছনে না পড়ে, আমাদের মনযোগী হতে হবে পরকালের ফসল ফলানোর কাজে। দুনিয়াতে যা কিছু ফলাবোÑ পরকালে তাই আমার সম্বল হবে। অনন্তকালের সঙ্গী হবে।
প্রতি বছর নববর্ষকে কেন্দ্র করে আপত্তিকর অনেক কিছু হয়ে থাকে সমাজে। এমনটা আদৌ কাম্য নয়। এ থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের ধর্ম এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিকÑ এমন কিছু করা যাবে না নববর্ষ উদযাপনের নাম করে। প্রতিটি নববর্ষে আমাদের জীবন কল্যাণের প্রাচুর্যে ভরে উঠুক। শান্তিময় হয়ে উঠুক দেশ ও জাতি। মহান আল্লাহর রহমতে পূর্ণ হোক জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত। সর্বক্ষেত্রে আল্লাহই আমাদের সহায়। তার কাছেই আমাদের সকল স্বপ্ন ও পরিকল্পনার মঙ্গলকামনা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ইপসায় কর্মরত

Leave a Reply