উচ্চ শিক্ষা ও কোচিং সেন্টারের প্রতাপ

মাহমুদুল হক আনসারী, ১৩ এপ্রিল, ২০১৭, বৃহস্পতিবার: আদর্শ ও উন্নত শিক্ষাই জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছাড়া জাতি কখনো মূল লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। শিক্ষার মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতা মূলেবোধ জাগ্রত করতে পারে। বাল্য শিক্ষার সেই পূরনো বাক্যগুলো সমাজ হতে এখন হারিয়ে যাচ্ছে। ‘সদা সত্য কথা বলিও কখনো মিথ্যা কথা বলিও না।’ অন্যের সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিও, কারো চরিত্র হননে মতোয়ারা হইও না। আদর্শ নাগরিক ও চরিত্র গঠনে দেশে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সরকারি-বেসরকারী ভাবে গড়ে উটা এসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় নীতিমালাও ভিন্ন ভিন্নছে। আলাদা ড্রেস, বই খাতা, নিয়ম-নীতি, সময় পরীক্ষা, নির্বাচন সব কিছুই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বেতন, ভর্তি ফি, কোচিং ফি সবই স্কুল, এলাকা পরিবেশ বেঁধে সব নীতি কর্মসূচী যার যার খুশীমত নিচ্ছে এবং চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কতিপয় স্কুল বা বিদ্যালয় শিক্ষা প্রশাসনের কিছু নীতির মধ্যে চলতে দেখা যায়। বিপুল সংখ্যক বিদ্যালয় নিজস্ব নীতিতেই চলছে। তারা কারো নির্দেশনা মানছে না। দেখা যায় দূর্বল ও আইন মান্যকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে প্রশাসন বেশী চাপ দিচ্ছে। আর জরিমানা করছে। প্রশাসনিক ভাবে যারা রাষ্ট্রের নিকট ধাপট রাখে তাদের অনিয়ম কম দেখাানো হচ্ছে। তারা দূর্নীতি করে পার পেয়ে যাচ্ছে। কথা ছিল আইন সকলের জন্য এক হবে। বিদ্যালয় স্কুলের ভর্তি ফি, বেতন, কোচিং ফি, একই নিয়ম হবে। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। কেউ মানছে কেউ মানছে না। সরকারি স্কুল আর বেসরকারি স্কুল বেতন ভাতা আর টিউশন ফি এক হয় না। প্রাইভেট স্কুলের স্কুল খরচ স্কুল কর্তৃপক্ষেই বহন করে। সরকারি স্কুলের খরচ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে দেয়া হয়। নানা ধরণের ভাতা ও তারা পেয়ে থাকে। বেসরকারি স্কুরের যাবতীয় খরচ স্কুল কর্তৃপক্ষ চালাচ্ছে। ভর্তি ফি, কোচিং ফি, দান-অনুদান সরকারি-বেসরকারি স্কুরে মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যায় না। গলাকাটা ভাবে অভিভাবকদের থেকে নানা ফি আদায় করা হয়। বেসরকারি স্কুলের বিভিন্ন ফি নেয়ার একটা যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু সরকারি স্কুলের এভাবে কোন যৌক্তিতে অতিরিক্ত বেতন ভাতা, নানা ধরণের ফি নেয়া হয় সেটাই অভিভাকদের প্রশ্ন? সরকারের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ সেকটরের অধীনে পরিচালিত বিদ্যালয় কোনো ধরণের হিসাব ছাড়াই ইচ্ছেমত ফি নিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে একশান নেয়া যায় না। তারা তাদের খুশীমত চলছে। আর যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নিয়ম-নীতির প্রতি অনুগত তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ সেটাও জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আইনকে সমান তালে চালাতে হবে। সবার জন্য আইন হবে সমান। জনগণ আইনকে সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান ভাবে দেখতে চায়। আইনের প্রয়োগ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান হওয়া দরকার। সিটি কর্পোরেশন স্কুলে ডাবল ভাবে বেতন ফি আদায় করা হচ্ছে। গ্রাম থেকে আসা নি¤œ আয়ের অভিভাবকগণ হিমশিম খাচ্ছে। যারা জমিদার বা যাদের বাড়ী ঘর ভাড়ার আয় আছে, তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু যারা ভাড়ায় থেকে শহরে ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া করার চেষ্টা করছে তাদের উপর বড় ধরণের চাপ পড়ছে। সমান তালে বেতন ভাতা বৃদ্ধি ও প্রদানে কর্মজীবী অভিভাবদের কষ্ট হচ্ছে। সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তা নানা সুযোগ সুবিধা এ ক্ষেত্রে পাচ্ছে। হাজার হাজার সাধারণ অভিভাবক এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের সুযোগ পায় না। তাদের আয়ের চেয়ে খরচ বেশী। ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি বিল, ছেলে মেয়েদের স্কুল খরচ সব মিলিয়ে বেসরকারি চাকুরিজীবিদের ভোগান্তি এ ক্ষেত্রে বেশী। তাদের বিষয়ে রাষ্ট্রের কোন দপ্তরেই কোনোধ ধরনের আশার সুযোগ নেই। মূলত পদে পদে তারাই শোষিত হচ্ছে। শোষণের শিকার হচ্ছে। হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়ছে। যাদের নিকট ঘর ভাড়ার আয় আছে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা খুশিমত ভাড়া বৃদ্ধি করে ইচ্ছে মত ভাড়া আদায় করছে। কিন্তু যারা শহরে ভাড়া দিয়ে বসবাস করে তাদের বারটা বাজছে আর ভোগান্তির কোন অন্তনেই। বিদ্যালয়ের যাবতীয় ফি থেকে আরম্ভ করে ভাড়া মালিকের নানা ফাঁদ ভাড়াটিয়াদের উপর অভ্যাহত আছে। এ অবস্থায় আছে শিক্ষার নামে কোচিং সেন্টারের অপতৎপরতা। স্কুল-কলেজ ঘেঁসে গড়ে উঠছে অসংখ্য নামে বেনামে এ প্রতিষ্ঠান। ছাত্রদের একটা অংশ ফাঁদ পেতে আছে কোচিং বাণিজ্যে। নানা ধরণের চকমপ্রদ বিজ্ঞাপন, লিফলেট, প্রচার করে ছাত্র-ছাত্রীদের সুস্থ প্রতিভা মানসিকতাকে এক প্রকার নষ্ট করে দিচ্ছে। এখন এইচ.এস.সি সহ বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা চলছে। প্রতিদিন কেন্দ্রের প্রবেশের মুখে কোচিং সেন্টারের চমকপ্রদ লিফলেট প্রচার পত্র বিলি হচ্ছে, যেখানে একজন ছাত্র খুব সহজেই ভালো রেজাল্ট পেতে পারে তাদের কথায়, সেটা বলা হচ্ছে, তাদের শরনাপন্ন হলেই ঐ ছাত্র কাঙ্খিত রেজাল্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। চমকপ্রদ লোভ লালসায় ফেলছে। কোমল মতি ছাত্র-ছাত্রীদের এবং অভিভাবকদের এই চাপ সইতে হচ্ছে। অভিভাবকদের যে করেই হউক ছাত্র-ছাত্রীদের দাবী পূরণ করতে হয়। কোচিং সেন্টারের কোন সুনির্দিষ্ট হিসাব দেয়া যাবে না। শত শত তাদের সেন্টার। শহর ও গ্রামে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়ে তারা চালাচ্ছে। কথিপয় শিক্ষক ও তাদের সাথে জড়িত। তাদের পরামর্শ বুদ্ধিতে এগুলো পরিচালিত হয়। দেখা যায়, কোচিং সেন্টারের মূলে আছে একজন পরিচিত কলেজের শিক্ষক। তার নিয়ন্ত্রণই এসব সেন্টার পরিচালিত হয়। তার নিকট পড়লে ও কোচিং করলে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যাবে। এসব ধরণের প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস শিক্ষার্থীদের দেয়া হয়। গলাকাটা এসব বাণিজ্য নিয়ে একাধিক বার লেখা হলেও কোন নিস্তার অভিভাবকগণ পাচ্ছে না। প্রশাসকের কতিপয় বক্তব্য ছাড়া এ ক্ষেত্রে বাস্তব কোন সমাধান দেখছিনা। প্রতিদিন প্রশাসনের সম্মুখেই কোচিং সেন্টারের লোকজন তাদের প্রচারপত্র বিলি করছে ছাত্রদের উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা তাদের সামনে অসহায়। তাদের লিফলেট প্রচার পত্র দেখে মনে হয় দেশের সব শিক্ষা বোর্ড তারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাদের কথায় রেজাল্ট ও পাশ ফিল। কী করে তারা প্রশাসনের সম্মুখে তাদের প্রচার পত্র বিলি করে সেটাও অভিভাকদের প্রশ্ন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুধুমাত্র কতিপয় বক্তব্য আর বিবৃতি নিয়ে এ সব কোচিং সেন্টার বন্ধ করা যাবে না। গলাকাটা পকেট কাটা ফাঁদদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর বাস্তব পদক্ষেপ চায় শিক্ষার্থীর অভিভাবকগণ। তাদের সাথে যে সকল শিক্ষক জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ও ব্যবস্থা চায়। ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা নষ্টাকরী এ সকল কোচিং অপবাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। সব ধরণের স্কুলে বেতন ফি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বেসরকারি স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরণের ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। ইচ্ছে মতো ফি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ চাই। আদর্শ নাগরিক তৈরির এ সব কারখানাকে বাণিজ্য মুক্ত করতে হবে। মেধা সম্পন্ন চরিত্রবান ডিগ্রীধারীদের শিক্ষাঙ্গনে নিয়োগ দিতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা যোগ্যতাকে প্রধান্য দেয়া হউক। দলীয় চিন্তার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষক নিয়োগ হউক। চরিত্র নীতি নৈতিকতার মাপকাটিতে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হউক। স্কুল, কলেজের শূন্যপদ মেধাবী ডিগ্রীধারীদের নিয়োগ দেয়া হউক। তবেই শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড বাস্তবে হবে। জাতি উন্নত হবে, সঠিক ভাবে জাতি সভ্য জাতিতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। যে কোন মূল্যে শিক্ষাকে বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। তবেই জাতি রাষ্ট্র সূফল ভোগ করবে। সকলকেই ঐক্যবদ্ধ ভাবে শিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে। লেখক: সংগঠক, গবেষক, কলামিষ্ট।

Leave a Reply