প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে যাত্রীস্বার্থ উপেক্ষিত: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১২ এপ্রিল, ২০১৭, মঙ্গলবার: পরিবহনের সরকারী-বেসরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন মালিক শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
আজ ১২ এপ্রিল বুধবার সকালে নগরীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংগঠনের উদ্যোগে প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭ এ যাত্রী স্বার্থ সংরক্ষণের দাবীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। লিখিত বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, পরিবহনের ষ্টেকহোল্ডার সরকার, মালিক, শ্রমিক, যাত্রী। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত এই সেক্টরে সরকারী সিদ্ধান্তগ্রহনের ফোরাম সমূহে যাত্রী প্রতিনিধি ছিলনা তাই মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলে মিশে একাকার ছিল। যাত্রী সাধারণের প্রতিদিনের রাস্তাঘাটের ভোগান্তি, ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানী সরকারী সিদ্ধান্তগ্রহনের ফোরাম সমূহে তুলে ধরার মত কোন সংগঠন ছিলনা । বিভিন্ন সময়ে সরকার জনস্বার্থ বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুধাবন করে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিকে বাস ভাড়া নির্ধারণ কমিটি, সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া নির্ধারণ কমিটি, ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া নির্ধারণ কমিটি, আন্তঃমন্ত্রনালয় ঈদ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ঢাকা মেট্রো আরটিসি, চট্টমেট্রো আরটিসির মত সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফোরাম সমূহে সদস্য করলেও পুরনো আইনে যাত্রী প্রতিনিধি না থাকায় মালিক-শ্রমিক নেতাদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে অত্র সংগঠনের প্রতিনিধি তথা যাত্রী প্রতিনিধিকে বাদ দেওয়ার ইতিহাস আপনাদের সকলেরই জানা। এছাড়াও জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদে যাত্রী কল্যাণ সমিতিকে সদস্য করার সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রভাবশালী মালিক শ্রমিকনেতাদের চাপে সরকার তা করতে পারেনি। সম্প্রতি মন্ত্রী সভায় অনুমোদিত আইনের খসড়ায়ও পুরানো আইনের মতো সরকারী সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফোরাম সমূহে শুধু মালিক শ্রমিকদের রাখা হয়েছে । তাই এই আইনে যাত্রী স্বার্থ চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দেশের যাত্রী সাধারণের প্রতিদিনের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে সমাধানের লক্ষ্যে পরিবহন সেক্টরে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফোরাম সমূহে মালিক-শ্রমিকদের সংখ্যানুপাতে যাত্রী প্রতিনিধি এই আইনে অর্ন্তভুক্তির দাবী জানিয়ে ছিল। বিষয়টি মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়ায় প্রতিফলিত না হওয়ায় গত ৪ এপ্রিল ২০১৭ মঙ্গলবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্বারকলিপি দিয়ে বিষয়টি পুনরায় অবহিত করা হয়।
সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকার সত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা , মাঠেঘাটের যাত্রী ভোগান্তির প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত না থাকা, উত্তোরণের উপায়সমূহ সম্পর্কে অবহিত না থাকা ও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাদের চাপে এই আইনে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন হয়নি। জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণ হয়নি। এই আইনের সকল ধারায় আপোষযোগ্য ও জামিন যোগ্য করাই সড়ক নিরাপত্তা মারাত্বকভাবে বিঘিœত হবে। গত বছর মহামান্য হাইকোর্ট একটি মামলা নিষ্পত্তি করে সড়ক দূর্ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তি ৭ বছরের কারাদন্ড বহাল রেখে বলেছিল এই শাস্তিও যথেষ্ট নয়। অথচ এই আইনে সড়ক দূর্ঘটনার মামলায় অপরাধের শাস্তি ৩ বছরের কারাদন্ড রাখায় সড়কে যে মৃত্যুর মিছিল চলছে তা থামানো কোনভাবেই সম্ভব হবেনা। এই আইনে সড়ক দূর্ঘটনার প্রকৃত অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে যারা দায়ী যেমন চালক, মালিক, যাত্রী, হেলপার, কন্ডাক্টর, সড়ক নির্মাণ প্রকৌশলী, সড়ক সুপার ভিশন কর্মকর্তা, সড়ক নির্মাণ ঠিকাদার, বিলবোর্ড স্থাপনকারী, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী, আনফিট যানবাহনে ফিটনেস প্রদানকারী বা অন্য যে কোন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শাস্তির মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখার দাবী জানিয়েছিলাম। পাশাপাশি সরকার, মালিক ও যাত্রীর অংশগ্রহনে “সড়ক দূর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা তহবিল” গঠন র্পূবক উক্ত তহবিল আইনে অর্šÍভুক্ত করে, এই তহবিল থেকে সড়ক দূর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টিও আইনের অর্ন্তভুক্তির দাবী জানিয়েছিলাম , যা এই আইনে তা প্রতিফলিত হয়নি।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে গণপরিবহনে ছাত্র-ছাত্রীদের হাফ ভাড়া নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী মহোদয় ছাত্র-ছাত্রীদের হাফ ভাড়া না নিলে তার কাছে অভিযোগ করতে বলেছিলেন। আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা ভাড়ায়, ছাত্র-ছাত্রী ও প্রতিবন্ধিদের হাফ ভাড়ায় যাতায়াতের বিষয়টি আইনে অর্ন্তভুক্তির দাবী জানিয়েছিলাম। অথচ এই আইনে তাও প্রতিফলিত হয়নি।
বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ সেক্টরে আইন সঠিকভাবে প্রয়োগকরা যায় না। এতে করে আইন অমান্য করতে করতে মালিক শ্রমিকরা আজ বেপরোয়া। সরকার জনস্বার্থে বা যাত্রী সাধারণের স্বার্থে বা সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে কোন সিদ্ধান্ত নিলেই মালিক শ্রমিকরা পরিবহন ধর্মঘটের নামে দেশবাসীকে জিম্মি করছে। একাধিক মালিক শ্রমিকনেতারা সরকারী নীতি নির্ধারনী জায়গায়। অথচ এই সেক্টরে আইন যারা প্রয়োগ করবে যেমন বিআরটিএ চেয়ারম্যান, ডিআইজি হাইওয়ে, ডিসি ট্রাফিকদের পদমর্যাদা বা আইন প্রয়োগের ক্ষমতার চেয়েও মালিক শ্রমিকনেতারা অধিক ক্ষমতাধর। এরা সরকারের সড়ক যোগাযোগ সেক্টরে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফোরাম সমূহে প্রভাব বিস্তারের কারণে জনস্বাথের্র সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত  হয়ে মালিক শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। এর থেকে উত্তোরণ ঘঠিয়ে জনস্বার্থ সংরক্ষনের কোন দিক নির্দেশনা এই আইনে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ করে সংগঠনটি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে বিআরটিএ মাঠ পর্যায়ে জনবল রয়েছে মাত্র ৫ শতাধিক, বাংলাদেশে বর্তমানে বৈধ-অবৈধ মিলে যানবাহনের সংখ্য প্রায় ৪০ লাখ। এতে দেখা যায় প্রতি ০১ জন কর্মকর্তার পক্ষে ৮ হাজার যানবাহন কেবল মনিটরিং নয় গণণা করাও কোনভাবে সক্ষম নয়। অন্যদিকে দেশে সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বরত ২১ শত হাইওয়ে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে ২১ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক।  প্রতি ১০ কিলোমিটারে ০১ জন পুলিশের পক্ষে আইন প্রয়োগকরা কোন ভাবে সক্ষম নয়। এছাড়াও বিআরটিএ হাইওয়ে পুলিশ বা ট্রাফিক পুলিশের লজিষ্টিক সহায়তাও অপ্রতুল। এই কারণে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্বক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে দাবী করে সংগঠনটি বলেন, যাত্রীবান্ধব, ব্যাপক গণপরিবহন বান্ধব, জাতীয় সড়ক ব্যবহার নীতিমালা প্রনয়ন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপযুক্ত জনবল নিয়োগ, উপযুক্ত লজিষ্টিক সহায়তা ছাড়া প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর রূপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
এইসময় উপস্থিত ছিলেন, যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের সাবেক সচিব ড. মো: মাহাবুবুর রহমান, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ও ফুয়ারার সভাপতি ড. ইকরাম আহাম্মেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক ব্যারিষ্টার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হিরু, গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও এফবিসিসিআই এর পরিচালক আব্দুল হক, নাগরিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরীফ প্রমূখ।

Leave a Reply