একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জোট গঠনের তৎপরতা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবিবার: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এককভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার প্রচারণার পাশাপাশি শুরু হয়েছে জোট গঠনের তৎপরতা। এতে পিছিয়ে নেই দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে বিরোধী দল হিসেবে খ্যাত বিএনপি। সংসদের বিরোধী দল এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও এবার আলাদা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে দেন দরবার করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচনের এই জোট গঠনের তৎপরতা সম্পর্কে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতেই আগ্রহী থাকে ছোট ছোট দলগুলো। আর্থিক সুবিধা এবং আসন নিয়ে ছোট দলের নেতারা বড় এসব দলের সঙ্গে দর কষাকষি করে থাকে। যদিও এই জোট গঠনে ছোট দলগুলোর সঙ্গে বড় দলগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শিক মিল থাকে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমমনা দলগুলো মিলে ১৪ দল এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলাম ও সমমনা দলগুলো মিলে ২০ দলীয় জোট গঠন করেছে। এখন আবার নতুন করে জোটকে ঢেলে সাজাবার উদ্যোগ দিয়েছে বড় দল গুলো।
এবার জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের থাকায় আগামীতেও সংসদে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে জোট গঠনের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে জোটে ভিড়তে বিভিন্ন সভা সমাবেশ, সেমিনার করে তারা নির্বাচনে নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
জানা গেছে, নাম সর্বস্ব এবং ছোট দলগুলো নিজেদের তৃতীয় শক্তি হিসেবে উপস্থাপনে তৎপর। নির্বাচন কমিশনে অনিবন্ধিত এমন রাজনৈতিক দলও জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এমন অনেক দল রয়েছে যাদের কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় কোনো অফিস নেই। এসব দলের মূল লক্ষ্য হলোÑ নির্বাচনের সময় তৎপর হওয়া। কখনো কখনো এসব দল বিকল্প প্ল্যাটফর্মের সন্ধানে থাকে। আর এটা লুফে নেয় বড় দল গুলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, এসব নামসর্বস্ব দলগুলোকে সক্রিয় করে তোলা ও তাদের দিয়ে জোট গড়ে তোলার পেছনে বড় দুই জোটের নির্বাচনি রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করতে চায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ফলে আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে জোটে থাকা এবং ছোট বড় সবকটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য কৌশলী ভূমিকা নিয়েছে। যাতে বিএনপি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল যেন নির্বাচনের বাইরে না থাকে। তবে এবার বিএনপি নেতারাও নির্বাচনের বাইরে থাকতে রাজি নয়। তারা দলকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে চায়। তারাও সক্রিয় জোট গঠনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী কমপক্ষে এক ডজন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সম্ভাব্য জোট গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বৈঠক করেছেন। সবাই একটা জোট গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই জোট হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মতো জাতীয় পার্টি একটি বড় রাজনৈতিক দল।
জানা গেছে, বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার তৃণমূল বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স’ (বিএনএ) বা ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট’। এই জোটে থাকা ৩১ দলের একটিরও নিবন্ধন নেই। এ ব্যাপারে জোট প্রধান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই এ জোট হচ্ছে। জোট থেকে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়া হবে। তবে নির্বাচনি সমঝোতা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গেই হবে বলে আশা নাজমুল হুদার।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া শওকত হোসেন নিলুর ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)’ নামে একটি জোট হয়েছে। জোটের ৯ দলের মধ্যে এনপিপি ছাড়া অন্য কোনো দলের নিবন্ধন নেই। মুসলিম লীগ, তৃণমূল ন্যাপ, ন্যাপ ভাসানী, স্বাধীনতা পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস ও ইসলামিক পার্টি রয়েছে এই জোটে।
২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের চেষ্টা করছে ইসলামী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী। জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ববি হাজ্জাজ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনিও একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
সাতদলীয় বাম মোর্চা নামে সিপিবি ও বাসদ কয়েকটি অনিবন্ধিত সমমনা রাজনৈতিক দল নিয়ে নির্বাচনের আগে জোটবদ্ধ হতে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছে। এই প্ল্যাটফর্মে সিপিবি, বাসদ (খালেকুজ্জামান), চার বাম দল (বদরুদ্দিন উমরের জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা ও গণতান্ত্রিক মুক্তি মঞ্চ), নাগরিক ঐক্য, জাসদ রব ও গণফোরাম থাকতে পারে। এ ব্যাপারে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, নির্বাচনের আগে সমমনাদের নিয়ে একটি কাক্সিক্ষত ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম সৃষ্টি হবে বলে আশা করি।
নতুন জোট গঠন নিয়ে সরব জাসদ (রব) সভাপতি আ স ম আবদুর রব। এ জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোটের বাইরের সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সমাজ শক্তিকে নিয়ে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখছেন জাসদ নেতারা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক তারেক শামুসর রেহমান বলেন, যদি একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকতো তাহলে জোট গঠনের কোনো দরকার ছিল না। তিনি বলেন, এসব সুযোগ সন্ধানী দলের গুরুত্ব কমে যায় রাজনৈতিক দলগুলো যখন সক্রিয় থাকে। এসব ছোট ছোট দলের কোনো ভিত্তি নেই। এমনকি গণভিত্তিও নেই। বড় দুই জোটের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন) শরিক দলগুলোর মতো এরাও সুযোগ সন্ধানী।
অনুরূপভাবে স্থানীয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন এলেই জোট গঠনের বিষয়টি আলোচিত হয়। এর প্রধান কারণ ছোট দলের নেতারা জানেন তারা ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। বড় দলের সঙ্গে থাকলে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার মতো সুযোগও আসতে পারে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মুখপাত্র ও সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল যে কোনো দল জোটে আসতে পারে। নির্বাচন এলে সমমনা দল নিয়ে জোট বাড়তে পারে। এতে অসুবিধা নেই।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দরকার। এখনো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি সক্রিয়। তারা দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী দেশে রূপান্তরিত করতে চায়। আমরা এই অপশক্তিকে মোকাবিলা করব।

Leave a Reply