অপেক্ষা: লাল গোলাপের কিন্তু —–

মো. দিদারুল আলম, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, সোমবার: বাইরে আকাশের অবস্থা খুব ভালো নয়। কেন যেন গুমুটে ভাব। কাকগুলো অবিরাম ডেকে যাচ্ছে। কাকের ডাকের শব্দ শুনে কুকুরগুলো তাদের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। সে সময়ে বাসা থেকে বের হলো নাদিম অফিসে যাওয়ার জন্য। সকাল থেকে তার মন ভালো নেই। অকারণে মনটা খারাপ, কেন খারাপ সে তা নির্ণয় করতে পারছে না। তার ওপর কাকের বিশ্রী ডাক শুনে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।
অফিসে গিয়ে নাদিম মোটেই মন বসাতে পারছে না। কেন যেন সবকিছু অসাড় মনে হচ্ছে। সে একটা নামকরা কোম্পানিতে ভাল চাকরি করছে। বেতন – ভাতা মিলিয়েই খুব ভাল আছে। চট্টগ্রাম শহরে নিজস্ব বাড়ি- গাড়ি আছে। ভাইদের অবস্থাও ভাল।
কিছুদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভাল নয়। রাস্তায় খুব বিপদ নিয়ে বের হতে হয়। কখন যে কী ঘটনা ঘটে। আজ খবর এল মুরাদপুরের পুলিশ, সরকারি দল ও রিরোধী দলের মাঝে ত্রিমুখী সংঘর্ষে দু’জন মার গেল ও অনেকে আহত, দু’একজনের অবস্থওা নাকি খুব খারাপ। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। সবার রাগ যেন গাড়ির ওপর, কিছু হলে গাড়ি ভাঙ্গতে সবাই ওস্তাদ। নিজেরা কিনতে গেল বুঝবে কত টাকা লাগে। গাড়ি ভাঙ্গার সংস্কৃতির থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। গাড়ি ভাঙ্গলে তাকে বিশেষ আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিলে গাড়ি ভাঙ্গা কমতে পারে। সবাই জিততে চায়। কিন্তু সবাই জিততে চাইলে কেমনে হবে। কাউকে না কাউকে তো হারতে হবে। তাহলে এটা হবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও সবার পছন্দের।
নাদিম প্রতিদিনের মত অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। রেব হতে না হতে তার মা ঘরে ঢুকে বলল, বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি তুই কারো সাথে তেমন কথা বলছিস না, অফিসে যাস, অফিস থেকে আছিস, কোন সমস্যা হলে তাহলে আমাকে বল, দেখি কী করতে পারি?
না, মা তেমন কিছু না, এমনিতেই মন খারাপ, বিশেষ কিছু না
ঠিক আছে, কাজে চলে যা, তবে মনে রাখ, আমি তোর মা, কোন কিছু লুকাবি না, একমাত্র মা-ই বুঝতে পারে সন্তানের মনের কথা। আমি বুঝতে পারছি যে, তোকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। যা হোক প্রয়োজন মনে করলে কী হয়েছে আমার সাথে শেয়ার করিস।
নাদিম অফিসে যাচ্ছি বলে চলে গেল।
নাদিম মনে মনে ভাবছে, কীভাবে তার মনের কথাগুলো তার মাকে বলবে। সবকিছু যেন ওলট – পালট মনে হচ্ছে। তার কথাগুলো মা জানতে পারলে খারাপ ভাববে না তো।
রীতা বুঝতে পারছে না এখন কী করবে। অফিসে সবসময় টুকটাক সমস্যা সবসময় লেগেই থাকে। এর সাথে না হলে ওর সাথে সমস্যা লেগেই আছে। তবে সে জানে কীভাবে সমাধান করতে হবে। একুট সময়ের দরকার। তবে সবার সাথে সে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখতে চেষ্টা করে। একই অফিসে চাকরি করে নাদিম। দু’জনেই অবিবাহিত। তারা দু’জন দু’জনকে পছন্দ করে কিন্তু কেউ কাউকে এখনো পর্যন্ত বলেনি। শুধু টুকটাক কথা বলা এবং দূর থেকে থাকিয়ে থাকে।
রীতা খুব সুন্দর ও স্মার্ট মেয়ে। বিয়ের অনেক প্রস্তাব এসেছে কিন্তু সে রাজি হয়নি বলেই সব প্রস্তাব ফিরে গেছে। অনেক ভালো ভালো প্রস্তাবও ছিল। এদিকে নাদিমের জন্য খুব জোরেসোরে পাত্রী দেখা হচ্ছে। কিন্তু সে কোনভাবে স্থির করতে পারছে না কী করবে। তার ভালা লাগে রীতাকে। যেই পরিমাণ ছেলেদের ভালোবাসার প্রস্তাব ও বিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে সে কথা ভেবে নাদিম তার সাথে ভালভাবে কথা পর্যন্ত বলে না। একদিন মার্কেটের সামনে দু’জনের দেখা হয়েছে –
কেমন আছ রীতা? ভাল। তুমি কেমন আছ?
আমিও ভাল, তবে খুব বেশি ভাল নেই। কেন?
বাড়ির অফিসের অনেক ঝামেলা।
কী ধরনের? এগুলো বলা সম্ভব নয়।
চলো, সামনে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, খেতে খেতে কথা বলি।
ঠিক আছে, চলো।
দ’জন মুখোমুখি বসে হালকা নাস্তার অর্ডার দিল।
রীতা মন দিয়ে খাচ্ছে আর আড়চোখে নাদিম তার দিকে তাকিয়ে আছে।
নাদিম রীতাকে জিজ্ঞেস করল, বিয়ে সাদীর ব্যাপারে কিছু ভাবছ, না তেমন কিছু না।
তুমিও এখনো বিয়ে করনি, তুমি কী ভাবছ বলো।
আসলে এখনো মনের মানুষ পায়নি, তাই—
চল, আমাদের খাওয়াতো শেষ। আমার অনেক কাজ আছে বলে রীতা উঠে গেল।
বাড়িতে পৌঁছে নাদিম রীতার সাথে রেস্টুরেন্টে কাটানো সময় মনে মনে ভাবে। সে ভাবতে লাগলো রীতা হয়তো তাকে পছন্দ করে কিন্তু বলতে পারছে না। তাই সে ভাবছে রীতাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিলে কেমন হয়। অপরদিকে নাদিমকে একটু পছন্দ করলেও কখনো প্রেম-ভালোবাসার কথা ভাবেনি। সে ভাবে ভালোবাসা – প্রেম এগুলো করা মানে পুরুষদের অধীনস্থ থাকা, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা, কথায় কথায় জোর খাটানো ইত্যাদি।
অন্যদিকে নাদিম মনে করছে খুব শিগগিরই সে রীতাকে প্রেমের প্রস্তাক দেবে। পরের দিন দু’জনই অফিসে গেল। অফিসে ঢুকতেই দেখা হয়ে দু’জনের। পারস্পরিক কুশলাদি জিজ্ঞেস করে দুজনই নিজ নিজ জায়গায় চলে গেল। এই শীতেও গরম অনুভুত হচ্ছে। তবে এই আবহাওয়াটা বেড়োনোর জন্য দারুণ। এই সময়ের কথা ভেবে নাদিম রীতার কথা ভাবছে। সে ভাবে এই সময়ে রীতার হাত ধরে বাইরে বের হতে পারলে কী যে ভাল লাগতো। সে ভাবে রীতাকে বলবে কী বলবে না তার সাথে বের হতে। যাক সব আশঙ্খা ঝেড়ে সে রীতাকে গিয়ে বলল, রীতা অফিস ছুটির পর কোন কাজ না থাকলে চল, পার্কে গিয়ে একটু কপি খায়। রীতার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না বের হওয়ার কিন্তু অভদ্রতা হয় ভেবে সে রাজি হয়ে গেল। এদিকে এই রাজি হওয়াটাকে নাদিম ভেবে নিয়েছে তার প্রতি রীতার দুর্বলতা।
দুজন পার্কে বসে কপি খাওয়া আরম্ভ করল।
কীভেবে আজকে পার্কে আসছ।
না, এমনিই আসছি।
বাসায় সারাক্ষণ আম্মা বিয়ের কথা বলে, কিন্তু কোন মেয়েকে ভাল লাগে না।
রীতা বলল, কেন?
জানি না। তোমার কী অবস্থা বল।
না, আমার তেমন কোন অবস্থা নেই।
নাদিম তাকে প্রশ্ন করে ভালোবাসা, প্রেম ও বিয়ে নিয়ে কি ভাবছ? উত্তরে রীতা বলে, প্রেম ভালোবাসা করতে কার না ভালো লাগে, আমারতো ভালো লাগে, কিন্তু সব কেন যেন ঠিকটাক মতো মিলছে না।
আগামীকাল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। রীতাকে টেলিফোনে নাদিম প্রশ্ন করলো তোমার কী সময় হবে। সময় হবে কিন্তু কেন? না, দু’জনে মিলে একটু ঘুরতে চাচ্ছিলাম। কোথায় যাবে? নদীর ধারে বা পাহাড়ের কাছে। ঠিক আছে কখন আসতে হবে বলো। ঠিক সকাল ১০টায় ওয়ার সেমিট্রিতে আসো ওখান থেকে পতেঙ্গা সী বিচে যাব। দু’জনই প্রস্তুতি নিচ্ছে ভালোবাসার কথা বলার।
নাদিম যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। রীতার বিশ্ব ভালোবাস দিবসের দিন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বলতে পারার। সে মনে মনে ভাবছে। কী ধরনের পোশাক পরিধান করে যাবে। কী কথা বলবে রীতার সাথে। সে আরো মনে মনে ভাবলো কীভাবে তাকে বিয়ের কথা বলা যায়। মেয়ে হিসেবে রীতা খুব ভালো। ভালো পরিবারের মেয়ে। খুব শিক্ষিত ও সুন্দর। রীতাও মনে মনে নাদিমকে ভালোবেসে ফেলেছে। বাসা থেকে তার জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে। এদিকে নাদিমের পরিবারও ভালো। সেও শিক্ষিত ও ভালো চাকরি করে।
আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। দুজনই খুব সুন্দর করে সেজেগুজে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত। রীতা হলুদ রঙ্গের শাড়ি পরিধান করে এত সুন্দর করে সেজেছে ঠিক তাকে পরীর মতো লাগছে।
খুব ভোরে নাদিম ঘুম থেকে উঠে। কত আশা নিয়ে দু’জন দেখা করতে আসছে। ভালোবাসার কথা বলবে। ভালোলাগার কথা বলবে। সকাল ১০টার আগেই নাদিম ওয়ার সেমিট্রিতে চলে আসে। বারবার ঘড়ি দেখছে, কখন আসবে স্বপ্নের মাধুরী। নাদিম অপেক্ষা করতে করতে নাদিম ঘড়ি দেখল ১১ট বেজে গেল। এদিকে ফোন করেও রীতাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
তার অপেক্ষা ভালোবাসার, কাউকে কাছে পাওয়ার, মন খুলে কথা বলার। কিন্তু আসছে না তার মনের মানুষ। জানে না সে আসবে কিনা, নাকি নাদিমকে পছন্দ করেনি বা অন্যকিছু। আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। অধৈর্য্য হয়ে গেল নাদিম।
রীতাও ১০টার আগেই ঘর থেকে বের হল। সে পথে গাড়ি থেকে নেমে লাল গোলাপ নিল নাদিমকে দেবে বলে। গাড়ি নিয়ে প্রবর্ত্তক মোড় ঘুরতে ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে গেল। রীতার মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগে। পথচারিরা মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল এবং দেখল অনেক রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং তাকে বাঁচানো যাবে কিনা বুঝতে পারছে না। দুই ঘণ্টার মতো ডাক্তাররা চেষ্টা করে দেখলো তাকে আর বাঁচানো যাবে না। বের হয়ে পরিববারকে জানালো আপনাদের মেয়েকে বাঁচনো গেল না।
এদিকে নাদিম অপেক্ষা করতে করতে কোন সমস্যা হয়েছ কিনা তা জানতে পরিবারের দিকে রওনা দিল। বাসায় গিয়ে দেখল দরজা বন্ধ। এবার সে বুঝতে পারল কোন একটা সমস্যা হয়েছে। ফিরে আসার সময় দেখল গাড়ির ড্রাইভার বাড়ির দিকে আসছে। সে জোরে চিৎকার করে বলল, ভাই-আপা গাড়ী এক্সিডেন্টে মারা গেছে।
নাদিম তাকে আর কিছু কলতে পারল না। কী করবে বুঝতে পারছে না। পুরো আকাশটা যেন তার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়লো। সে গাড়ি নিয়ে দ্রুত চলে পৌঁছে গেল হাসপাতালে। গিয়ে দেখল রীতা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে অপরাধীর মতো। নাদিম প্রশ্ন করলো কেন এভাবে চলে গেলে আমায় ছেড়ে। সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করলো কেন আজকে আমরা বের হতে গেলাম।
রীতার মৃত্যু অনেক দিন হয়ে গেল। নাদিম কিছুতেই তাকে ভুলতে পারছে না। সে আর কোনদিন ভালোবাসা দিবসের দিন বের হয় না এবং পালনও করে না। সে আর বিয়ের কথা ভাবতে পারছে না। সরাক্ষণ রীতার কথা মনে পড়ে। সে ঠিকমতো অফিসেও যাচ্ছে না। তার পরিবার তার এভাবে জীবন-যাপন দেখে একদিন এক মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার সবাইকে বের হয়ে যেতে বলে।
ডাক্তার প্রশ্ন করলো কি হয়েছে?
ড্যাব ড্যাব চোখে বলে রীতা
যা প্রশ্ন করে, সো বলে রীতা।
প্রতিটি বাগানের লেখা থাকে, ফুল ছেড়া নিষেধা
যদি ভালোবাসার মাঝেও লেখা থাকতো
যে, কারো মন ভাঙ্গা নিষেধ
তাহলে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হতো
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

Leave a Reply