শিল্প সমৃদ্ধ নরসিংদী জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

খন রঞ্জন রায়, মো. আবুল হাসান: উন্নয়নের অনিবার্য ও প্রধান শর্ত হিসেবে মানসম্মত শিক্ষাকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই দেশে উচ্চ শিক্ষার চাহিদা যেভাবে 1বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সঙ্গে তাল রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়েনি। বিশেষ করে শিক্ষা অধ্যুষিত বৃহত্তর নরসিংদী জেলায় সবচেয়ে অবহেলার শিকার; নরসিংদী জেলায় একটি ছোট্ট সরকারি কলেজ ও মহিলা কলেজ ছাড়া এখানে কোনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
বিগত দুই দশকে বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকায় বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জরুরি অনেক শর্ত পূরণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঢাকাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শিক্ষা বাণিজ্যিক দিক মাথায় রেখে। অথচ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাগরিক কোলাহলের বাইরেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে সব অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত হয়। এ ধরনের উদ্যোগ জনগণের কাছ উন্নয়নবান্ধব হিসেবে বিবেচিত হবে। রাজধানী শহর ঢাকার বাইরে পূর্বাঞ্চল নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য তুলনামূলক কম দামে জমি পাওয়া সহজ।
২০১৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নরসিংদী জেলা থেকে পরীক্ষার্থী পাস করেছেন ৬৩ হাজার ১৯৩ জন। এর মধ্যে ৭২৫ জন ছাত্রীসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক হাজার ৮১৮ জন। এ ছাড়া জিপিএ ৪ থেকে ৫ এর মধ্যে ছিলেন ২০ হাজার ৮৫৫ জন এবং জিপিএ ৩.৫ থেকে ৪ পেয়েছেন ১২ হাজার ৯৬৬ জন। সংখ্যাটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এরা উচ্চশিক্ষার যোগ্য প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখেন। প্রতিপত্তি সম্পন্ন কিছু শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবেন।
এখন ভেবে দেখতে হবে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত কলেজগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষা অর্জনের সার্বিক সুবিধা আছে কি না, বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়। এমনকি নরসিংদী সরকারি কলেজ, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজও তাদের পুরোনো ঐতিহ্য ও সুনাম ধরে রাখতে পারছে না। আসনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী বাধ্য হয়েই ভর্তি হচ্ছেন। তার ওপর রয়েছে শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষা উপকরণের দৈনদশা ইত্যাদি সমস্যা। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে দূরশিক্ষণ কার্যক্রমে পর্যন্ত নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ২০১৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা ২১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়নি। কিন্তু শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে বিবেচনা করলে যাদের জিপিএ ৩.৫ এর কম, তাদেরও থাকা উচিত। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দেশের শিল্প সমৃদ্ধ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে এই অঞ্চলে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অতি জরুরি। নরসিংদীর সচেতন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন।
বিশিষ্ট ভাষাবিদ বৈজ্ঞানিক প্রফেসর ডঃ মনিরুজ্জামান দাবী করেন সব সুবিধা ও উপযোগিতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়া নিয়ে এখন আমরা দুরাশায় ভুগছি। নরসিংদীর কাদের মোল্লা সিটি কলেজ ঢাকা বোর্ডের মধ্যে পর পর তিনবার তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। এমনকি বেসরকারি ভাবে নরসিংদী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও শুরু করতে পারেনি।
নরসিংদী জেলায় বিশেষ বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে বরাবরই শীর্ষস্থান অধিকার করে থাকেন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাবে এঁদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে অনেক মা-বাবা তাদের মেয়েদের দেশের অন্য প্রান্তে পড়তে পাঠাতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে মেধাবী শিক্ষার ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত না বলে অভিভাবক মহল মনে করেন। দেশের সার্বিক শিক্ষা চিত্র বিবেচনা করে দ্রুত গতিতে নরসিংদীতে একখানা আন্তর্জাতিকমানের নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
লেখক: নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ, ৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম।, ০১৭১১ ১২২৪২৫, ০১৮২০ ১৩০০৯০, khanaranjanroy@gmail.com

Leave a Reply