নির্বিচারে মিয়ানমারে চলছে হত্যাযজ্ঞ

জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী, ২৮ নভেম্বর, সোমবার: গত ৯ অক্টোবর মায়নামারের আরাকান রাজ্যের সীমান্ত ফাাঁড়িতে পুলিশের উপর হামলায় ৯ জন পুুলিশকে হত্যার অজুহাতে সেদেশের সেনাবাহীনী ও সীমান্ত রক্ষা পুলিশ যৌথভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমকে দমনের নামে পুনরায় শুরু করেছে চরম নির্যাতন, নিপীড়ন, গণ ধর্ষণ, হত্যা ও অগ্নিসংযোগ মিয়ানমারের উগ্র মৌলবাদী বৌদ্ধরা সেনাবাহিনীসহ যৌথ বাহিনী ছদ্মাবরণে ও ইন্ধনে ক্লিায়ারেন্স অপারেশন এর নামে হেলিকাপ্টার ও এম্বুলেন্সের মাধ্যমে পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে। নিরীহ ও নিরস্ত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এছাড়াও নারীদের ধর্ষণ করেও শিশুদের গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করছে। সংগে বসতবাড়ীতে আগুন দিয়ে গৃহহারা করছে। jahangir-asp-2
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে মিয়ানমারের সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে।
বিবিসি বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের ব্যাপারে এতদিন ধরে যে অভিযোগ করে আসছিল, এবার জাতিসংঘও সেই অভিযোগ করছে। তবে মিয়ানমার সরকার বলে থাকে যে রোহিঙ্গারা সে দেশের নাগরিক নয়। তাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগও মিয়ানমার অস্বীকার করে থাকে।
কক্সবাজারে বিবিসির আকবর হোসেনের সাথে সাক্ষাৎকারে ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক রাখাইন প্রদেশের মানবিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। কিন্তু এই সমস্যার মূলে রয়েছে যে কারণ সেটি মিয়ানমারের ভেতরে। রোহিঙ্গা নিধনের প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় মিয়ানমার দূতাবাসের দিকে মিছিল।
তিনি বলেন, ”মূল সমস্যাটি হলো ৯ই অক্টোবর নয় জন সীমান্তরক্ষীর হত্যার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমষ্টিগতভাবে শাস্তি দিচ্ছে।
”তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাডিঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে। এর ফলে রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে।” বিবিসির তরফ থেকে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে মিয়ানমারে সত্যিই জাতিগত নিধন চলছে কি না, এর জবাবে মি. ম্যাককিসিক বলেন, ”এ নিয়ে আপনারা যা জানেন আমরাও তাই জানি। আমরা টিভিতে যা দেখি এবং যেসব রোহিঙ্গা আসছে তাদের কাছ থেকে যা শুনি তাতে মনে হচ্ছে এই অভিযোগ সত্য।”
”এরা সবাই বেসামরিক মানুষ। নারী ও শিশু। আমাদের কাছে তারা হত্যাকাণ্ডের কথা বলছেন, তারা ধর্ষণের কথা বলছেন। তারা তাদের প্রিয়জনকে হারানোর কথা বলছেন।”
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১০-১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে ৮২০ টি ঘর পুড়িয়ে দেয়ার সচিত্র প্রমাণ পেয়েছে, এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রায় ২ শতাধিক রোহিঙ্গা অধিবাসীকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। ২ হাজারেরও বেশী বাস্তু ভিটে ছাড়া করা হয়েছে। কয়েক হাজার একর জমির পাকা ধান কেটে নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। তথা সেনাবাহিনী বর্বরোচিত ও নিশংস হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুভিটা হারা হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার ও বান্দবনের নাইক্ষংছড়ি সীমন্ত দিয়ে নাফ নদী ফেরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধ্য করছে। জাতিসংঘের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী মিয়ানমার সরকার তাদের ভূখণ্ড থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের চিরতরে উৎখাত করার জন্য জাতিগত শুদ্ধিঅভিযান চালাচ্ছে। এতে এযাবৎ ৬০ হাজারেরও বেশী মানুষ গৃহহারা হয়েছে। এ সব দরিদ্র প্রপিড়িত সর্বহারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি ও পুলিশ প্রশাসন তৎপর আছে। সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে নৌকা বোঝাই অসহায় রোহিঙ্গা নারী ও শিশু পুনরায় পুশব্যাক বা সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর তাড়া খেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মৃত্যুর সংগে লড়াই করছে। সেনাবাহিনীর চিরুনী অভিযানের পাশাপাশি সেখানকার মুসলিম বিদ্ধেষী যুবক ও মিলিশিয়াদের অস্ত্র গুলিসহ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে দেশটিতে দীর্ঘ কয়েক যুগের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিগত ২ বছরের মধ্যে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অংসান সুচির শাসনামলে এ ধরনের চরম মানবতা বিরোধী গণ হত্যার ঘটনা বিশ্ববাসীকে আতংক করে তুলেছে। অংসান সূচি রহস্যজনকভাবে নিরব নিশ্চুপ থেকে তার প্রাপ্ত নোবেল পুরস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও অনলাইনভিত্তিক মন্তব্য তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার আহবান জানানো হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে জানা যায় যে নাফ নদী পার হয়ে মিয়ানমার হতে পালিয়ে আসা নারী পুরুষ শিশু সহ ২০/৩০ টি নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে বিজিবি। এছাড়াও বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে শত শত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনু প্রবেশ করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী স্বীকার করছে যে, এ যাবৎ তাদের অভিযানে ৬৯ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্য অনেক বেশী। কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় যে, গত ৬ সপ্তাহ ধরে পরিচালিত সেনাবাহিনী বর্বর হামলায় প্রায় সাড়ে ৩ শত নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার সত্যতা যাচাই করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কারণ কোন দেশী বিদেশী সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীকে রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গনাইজেশনের নেতৃবৃন্দরা সার্বক্ষণিকভাবে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের সংগে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। ও প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পত্রিকান্তরে এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে গত ১০ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সেনা অভিযানে সীমান্ত রক্ষা পুলিশ ও স্থানীয় মিলিশিয়া রোহিঙ্গা জাতিগত শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার অংশ হিসেবে মংডু জেলা শহরের প্রায় ১৫ টি গ্রামে পৈশাচিক হামলা চালায়। হামলায় একদিকে যেমন নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হচ্ছে অন্যদিকে তাদের বসতবাড়ী দোকানপাট এমনকি মসজিদ মাদ্রাসাসহ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা এখন বাস্তুহারা হয়ে অনাহারে অর্ধ্বহারে জীবন যাপন করছে। প্রাণের ভয়ে অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে প্রবেশের প্রাণপন চেষ্টা চালাচ্ছে। এধরনের প্রায় ৫০০ শত অনুপ্রবেশের চেষ্টা সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রতিহত করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে? তারা যাবে কোথায়? তারাও মানুষ, তাদের কি মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। যে ধর্মেরই লোক হোক না কেন কোন নিরাপদ জাতি বা গোষ্ঠীর উপর নির্যাতন হলে নির্যাতিতদের পাশে দাড়ানো প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কর্তব্য। তাই আমরা বাংলাদেশের জনগণও তাদের ব্যাথায় ব্যাথিত। ইতিপূর্বে ২০১২ সালেও রাখাইইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অনুরূপভাবে নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে শত শত লোক প্রাণ হারিয়েছে ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক হাজার নিরীহ জনগণ। মায়ানমার সরকার বরাবরই রোহিঙ্গাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে যুগ যুগ ধরে সকল প্রকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। ফলে রাখাইন রাজ্য পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রপীড়িত একটি অবহেলিত জনপদ। মহামতি বুদ্ধের বাণী ও ধর্ম যেখানে জীব হত্যা মহাপাপ বলে সেখানে কিভাবে ইতিহাসের বর্বর নির্মম হত্যা, লুঠপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ জঘন্য মানবতাবিরোধী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দিনের পর দিন যুগের পর যুগ চলতে পারে তা ভাবতেও গা শিহরিয়ে উঠে। উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সীমানা খুলে দিতে বলেছে তা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। চীনও তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছে। তারা কেহ রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধে বা গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন কর নাই। কাজেই এ সমস্যার সমাধান কল্পে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকারসমূহকে মিয়ানমার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বাগ্রে জাতিসংঘকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেই সংঘে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নাগরিকক্ত ও ভোটাধিকার শান্তিপূর্ণ বসবাসের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জাতিসংঘ একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক এবং (অব. অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) মোবাইল: ০১৮৮১-৩৯০৪১৪।

Leave a Reply