পুকুরটি প্রায় ১৩০ বছরের পুরানো

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৯ নভেম্ববর, বুধবার: পুকুরটি প্রায় ১৩০ বছরের পুরানো। ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটি পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আহসান মঞ্জিলের পাশে অবস্থিত। এটি স্থানীয়দের কাছে গোল তালাব/নবাব বাড়ি পুকুর নামেও পরিচিত। মাত্র পাঁচ টাকায় এখানে ‘নবাবি’ গোসল করা যায়। সাধারণত ঢাকায় পুকুরগুলো হয় চারকোণা আকৃতির। এটি সম্পূর্ণ গোলাকার একটি পুকুর। তবে এরকম গোলাকার পুকুর ঢাকায় একটি মাত্র রয়েছে। পুকুরটি দেখলে যে কারোর মন জুড়িয়ে যায়।1
ইসলামপুরের নবাব বাড়ি জরাজীর্ণ গেইট দিয়ে প্রবেশ করে কিছুটা সামনে আগালেই এই পুকুরের স্থান। ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের প্রতিষ্ঠাতা নবাব আব্দুল বারী। ১৮৮৬ সালে তিনি এই পুকুরটি নির্মাণ করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকে আছে এই পুকুরটি। পুকুরের আয়তনও বিশাল। পুকুরটির বর্তমান আয়তন প্রায় ছয় বিঘা। পুকুরের পাড়সহ ধরলে এর আয়তন হয় প্রায় আট বিঘা। তৈরির পর থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে এই পুকুরটি। সংস্কার করা হলেও পুকুরের আয়তনে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
পুকুরটি আয়তনে গোলাকার। পুকুরের চারপাশে রয়েছে নারিকেল গাছের সারি। অর্ধশতাধিক নারিকেল গাছে পরিপূর্ণ এই পুকুর। নিরাপত্তার স্বার্থে পুকুরের চারদিকে প্রায় চার ফুট উঁচু গ্রিল দিয়ে ঘেরা রয়েছে। বিশাল এই পুকুরে একটি মাত্র পাড় রয়েছে। সকাল ৭টায় পাড়ের গেইট খোলা হয় এবং সন্ধ্যা ৭টায় গেইট বন্ধ করে দেয়া হয়। সাবান ব্যবহার না করা এবং ময়লা আবর্জনা না ফেলার কারণে পুকুরের পানি অনেকটাই পরিষ্কার। এই বিশাল আকৃতির পুকুর ঢাকায় একটি মাত্র রয়েছে বলে জানায় পুকুর পরিচালনা কমিটি। স্থানীয় ছেলেরা পুকুরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। চাষ করা হয় বিভিন্ন জাতের মাছ। বছরের বিভিন্ন সময় টিকিট কেটে বড়শি দিয়ে পুকুরে মাছ ধরা যায়। নিরাপত্তার জন্য পুকুরের চারদিকেই রয়েছে তিন ফুট উঁচু দেয়াল। পানি পরিষ্কার রাখার জন্য এখানে কাপড় ধোয়া এবং সাবান দিয়ে গোসল করা নিষেধ। এতে পুকুরের পানি অনেক বেশি স্বচ্ছ। তবে সাবান দিয়ে গোসল করতে চাইলে পাশে একটি গোসলখানা আছে, সেখানে সাবান দিয়ে গোসল করা যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যারা এখানে গোসল করতে আসেন তাদের বেশিরভাগ পুরান ঢাকার তাঁতী বাজার এলাকার মানুষ। সেখানে পানি সংকট থাকার কারণে এখানে গোসল করতে আসেন।
এই বিশাল আয়তনের পুকুর ঢাকায় মাত্র একটি রয়েছে। এই পুকুরটি দেখার জন্য প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী আসে। পুকুরের পাশে মীম নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি তার স্বামীর সঙ্গে এই পুকুরটি দেখতে এসেছেন। এই পুকুরের নাম তিনি অনেক শুনেছেন। বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে এতদিন আসা হয়নি। তাই এবার তিনি পুকুরটি দেখতে এসেছেন। তিনি জানান, ঢাকায় এত বিশাল আকৃতির পুকুর থাকতে পারে সেটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
বর্তমানে এই পুকুরটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছে ‘মৌলভী খাজা আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’। এটি পরিচালনা করছেন নবাব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘নবাববাড়ী ট্যাংক কমিটি’। কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন ওয়াসিম উল্লাহ্। তিনি নবাব আব্দুল গনির বংশধর। তিনি এখন পুকুরটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন।
ওয়াসিম উল্লাহ জানান, এখানে দুইটি প্যাকেজের মাধ্যমে মাছ ধরা যায়। এর একটি হলো ফ্যামিলি প্যাকেজ। এই প্যাকেজ চার সপ্তাহের জন্য। প্রতি সপ্তাহে শুধু শুক্রবার মাছ ধরা যায়। এই প্যাকেজের মূল্য ছয় হাজার ৫০০ টাকা।
তিনি হলেন, অন্যটি হলো ওপেন প্যাকেজ। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতি এবং শুক্রবার এখানে মাছ ধরা যায়। এই প্যাকেজের মূল্য ১৫ হাজার টাকা। তিনি আরও জানান, রাজশাহী থেকে মাছ কিনে পুকুরে ছাড়া হয়। প্রতিটি মাছের ওজন থাকে দুই থেকে চার কেজি। পুকুরে রয়েছে দেশীয় জাতের মাছ। রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি।
ওয়াসিম উল্লাহ বলেন, ৩৫ বছর আগে মুরব্বিরা এই পুকুর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে দুই থেকে তিন বছরের জন্য এই পুকুরটি ইজারা নেয়া হয়। এই ইজারা দেয়া-নেয়া হয় নবাব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। ইজারা এবং প্যাকেজ থেকে যা আয় হয় তার ৫০ ভাগ ইজারাদার নিজে রেখে দেন। বাকি ৫০ ভাগ পুকুরের সংস্কারের জন্য রেখে দেয়া হয়।
‘পুকুর পাড়ে বসেই নবাব বাড়ি (আহসান মঞ্জিল) দেখা যায়। আমার বাপ-দাদারা এই পুরো এলাকার মালিকানায় ছিলেন। এখন প্রায় পুরোটাই দখল হয়ে গিয়েছে। শুধু দর্শনীয় স্থান বলতে নবাব বাড়ি আর পুকুরটি রয়েছে। নিজেকে নবাব পরিবারের সন্তান বলে গর্ববোধ করি’, বলেন ওয়াসিম উল্লাহ।

Leave a Reply