২৬ নভেম্বর সম্মেলন হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৫ নভেম্ববর, শনিবার: আসছে ২৬ নভেম্বর সম্মেলন হচ্ছে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির। এর মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন ও দল সক্রিয় হবে বলে আশা করছেন নেতাকর্মীরা। তবে কমিটি নিয়ে তাদের মধ্যে আছে নানা গুঞ্জন। কেউ কেউ বলছেন পুরনো কমিটির অধিকাংশ পদ বহাল রেখে সভাপতি পদের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হবে বেশি। ফলে সভাপতি পদ পেতে আগ্রহী নেতারা তৎপরতা চালাচ্ছেন জোরেশোরে।1
টাঙ্গাইলে জেলা বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ নতুন নয়। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হামিদুল হক মোহনের পদ হারানোর পর থেকে চলছে এই টানাপোড়েন। সেটি আরো বিস্তৃত হয় মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান ও পরে অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম সভাপতির দায়িত্বে আসার পর। এই সময়ে তিনটি ভিন্ন মতাদর্শে চলেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের পর গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদ পাওয়ার পর জেলা সভাপতি থেকে অব্যাহতি নেন আহমেদ আজম। ফলে পদটি খালি হলে সেখানে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় ফকির মাহবুব আনামকে (স্বপন ফকির)।
এ ছাড়া টাঙ্গাইলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আরো স্থান পান ভাইস চেয়ারম্যান পদে অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য লুৎফর রহমান খান আজাদ, পল্লী উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তী, শিশুবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদসহ জেলার ১৯ জন নেতা। জাতীয় সম্মেলনে গৃহীত ‘এক নেতার এক পদ নীতি’র কারণে এসব নেতা এখন আর জেলা কমিটিতে আসতে পারবেন না। আসতে চাইলে কেন্দ্রীয় পদ ছাড়তে হবে।
ফলে জেলা বিএনপির নতুন কমিটিতে সভাপতিসহ অন্যান্য শীর্ষ পদে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের জায়গা পাওয়ার। নতুন করে পুরো কমিটি ঢেলে সাজাতে ২৬ নভেম্বর সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা বিএনপি। ইতিমধ্যে ফকির মাহবুব আনামকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করে নতুন কমিটি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিন মতাদর্শের নেতাকর্মী নিয়ে নতুন কমিটি করা কতটা সম্ভব, তা এখন স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনার তুঙ্গে। ইতিমধ্যে সভাপতির জন্য জেলা বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হামিদুল হক মোহন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ শামসুল আলম তোফাসহ বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান সাংগাঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবালসহ বেশ কয়েকজন। পুরনো মুখই আসতে পারে নতুন সাজে
সভাপতির শূন্য পদটি পেতে মরিয়া প্রথম সারির নেতারা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কেউ চান অভিজ্ঞরা ফিরে আসুক, আবার কেউ চান তরুণদের হাতে নেতৃত্ব আসুক। আরেকটি অংশ চায় নতুন মুখ। যে-ই আসুক, সবার চাওয়া দলের কার্যক্রম যেন সক্রিয় হয়।
দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুরনো অধিকাংশ পদ ঠিক রেখে সভাপতির শূন্য পদটি পূরণ করে ঘোষণা হতে পারে নতুন কমিটি। সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ শামসুল আলম তোফা ও সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবালকে তাদের বর্তমান পদে বহাল রাখার কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে তারা দুজন যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে র্প্রাথী হবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে নতুন করে আলোচনায় আসছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হামিদুল হক মোহন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি আব্দুল আজিজ চান খাঁ জানান, কে সভাপতি হবেন এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে প্রার্থী হিসেবে হামিদুল হকের নামও আলোচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম তোফা বলেন, ‘সভাপতি নির্ধারণ করা কেন্দ্রের বিষয়। তবে আমি সভাপতি পদপ্রার্থী। কেন্দ্রীয় নেতারা আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলে আমি তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।’
সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘জেলা বিএনপির নতুন কমিটিতে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ শামসুল আলম তোফা ও সাবেক সভাপতি হামিদুল হক মোহন সভাপতি পদের জন্য চেষ্টা করছেন। আমি নিজে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছি।’ যেভাবে চলছে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপি
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির তিন সভাপতির তিন আমলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীরা তিন তরিকায় ভাগ হয়ে চলেছেন। তারা নিজেদের পদ বাঁচাতে কারো পক্ষে সাফাই গাইলেও অধিকাংশ নেতাকর্মীর মনেই ক্ষোভ রয়েছে এই তিন নেতার প্রতি। ফলে উপজেলা বিএনপির ছাত্রদল থেকে শুরু করে কৃষক বা তাঁতী দল পর্যন্ত সব সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এক যুগের পুরনো কমিটি দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। ২০১৫ সালের ১৭ জুলাই দেলদুয়ার উপজেলার ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন হয়েছে ১৩ বছর পর। ১৪ বছরেও হয়নি যুবদলের কমিটি।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম নিজ এলাকা বাসাইলেও দল গোছাতে পারেননি। আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে উপজেলা বিএনপি।
বাসাইল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এনামুল করিম অটল জানান, উপজেলা বিএনপিসহ অধিকাংশ অঙ্গসংগঠন আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। তবে নতুন কমিটি তৈরির কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি।
এদিকে যুবদলের কমিটির মেয়াদ ১০ বছর ও ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ নয় বছর পার হওয়ার পরও নতুন কমিটি তৈরি হয়নি।
বাসাইল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাকি হায়দার সোহেল জানান, কয়েকবার আহ্বায়ক কমিটি গঠন হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না। এদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের নিজ উপজেলাতেও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে দায়সারাভাবে চলছে দলের কার্যক্রম। এ অবস্থায় আন্দোলনের সময় টাঙ্গাইল বিএনপি তেমন কোনো কর্মকাণ্ড দেখাতে পারেনি।
তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, টাঙ্গাইলে বিএনপির রাজনীতি স্থবির হওয়ার মূল কারণ পুরনো কমিটি। নতুন কমিটি না হওয়ায় নতুন মুখ বেরোচ্ছে না। কার্যক্রমও সক্রিয় হচ্ছে না।
পারবেন তো হামিদুল হক মোহন জেলা বিএনপির প্রথম কমিটির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন হামিদুল হক মোহন। ওই কমিটি গঠনের সময় জেলার সাতজন এমপি মিলে মীর মাজেদুর রহমানকে সভাপতি ও গোলাম নুরুন্নবীকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সভাপতি হামিদুল হক মোহন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুস ছালাম পিন্টুর প্যানেল নির্বাচিত হয়। মোহনকে কেন্দ্রীয় বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত করেন জিয়াউর রহমান।
তবে দীর্ঘদিন জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মোহন কখনো এমপি পদে নির্বাচন করার সুযোগ পাননি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করলেও নিজ উপজেলা থেকে সমর্থন না পাওয়ায় প্রার্থী হতে পারেননি।
১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আসা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান মনিরুজ্জামান বুলবুল। সম্পাদক-সভাপতির সঙ্গে মতবিরোধ লেগেই থাকত। জাতীয় পার্টি থেকে আসা অধিকাংশ নেতাকর্মীকে নতুন কমিটিতে পদ দিয়েছিলেন মাহমুদুল হাসান। আর বিএনপির পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতবিরোধের শেষ পর্যায়ে বিএনপি থেকে ঝরে পড়েন জনপ্রিয় নেতা মনিরুজ্জামান বুলবুল।

সবশেষে জেলা বিএনপির সভাপতি হন অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান। সাধারণ সম্পাদক হন কৃষিবিদ শামসুল আলম তোফা। আইনি কাজ ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সময় দিতে বেশির ভাগ সময় আহমেদ আজমকে থাকতে হয় ঢাকায়। তার অনুপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় রাজনীতি থেকে দূরে থাকা হামিদুল হক মোহন সভাপতি হলে দলের কার্যক্রম কতটা সক্রিয় হবে তা এখন আলোচনায় আসছে।
হামিদুল হক মোহন বলেন, ‘আমি যত দিন জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলাম তত দিন নিয়মতান্ত্রিকভাবে দল চালানোর চেষ্টা করেছি। দলে কোনো অন্তঃকোন্দল ছিল না।’ তার নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে বলেন, ‘কাজ করার মতো জায়গা না থাকলে সক্রিয় থাকা যায় না।’ আবার সভাপতি পদ পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দলের শুরু থেকে বিএনপির সদস্য। দীর্ঘদিন সভাপতিও ছিলাম। ম্যাডাম যদি আমাকে আবার সভাপতি হিসেবে কাজের সুযোগ দেন তাহলে আমি দায়িত্ব নেব। আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগও পাব।’ তিনি সভাপতি হলে জেলা বিএনপি আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুরনো মুখ নতুন সাজে আসছে- এমনটা ঠিক নয় বলে মনে করেন জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফকির মাহবুব আনাম (স্বপন ফকির)। তিনি বলেন, ‘২৬ নভেম্বরের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার জেলা বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের সভাপতি-সম্পাদকদের ভোটে কমিটি গঠন হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে সেখানে।’
বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে ফকির মাহবুব বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করেছি, সবার আগ্রহও বেড়েছে। সম্মেলনের আগেই অঙ্গসংগঠনের নতুন কমিটি হবে।’ সভাপতি পদে নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

Leave a Reply