বড় অনিয়ম ছোট ঋণে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩ নভেম্ববর, বৃহস্পতিবার: আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের শেরপুরের শ্রীবরদী শাখা থেকে পাংখা নামের এক গ্রাহককে ১৮ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়। শ্রীবরদী শাখায় এ গ্রাহকের যে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। ঋণটি খেলাপি হয়ে পড়ায় আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ময়মনসিংহের আঞ্চলিক কার্যালয় এবং বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর তদন্ত করে দেখেছে, পাংখা নামে যে গ্রাহককে ঋণ দেওয়া হয়েছে, আসলে এ নামের কোনো লোক শ্রীবরদী এলাকায় নেই।1
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী আনসার প্লাটুনের সদস্য ছাড়া কেউ ঋণ পাবেন না। এমন কঠিন বিধান থাকা সত্ত্বেও ভুয়া নামে ঋণ দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ব্যাংকের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলেই এ ধরনের চার শতাধিক ভুয়া এবং অস্তিত্বহীন ঋণ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৩ লাখ টাকা। এ ঘটনার পর ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বগুড়া, সিলেট, ফরিদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল ও দিনাজপুরেও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এসব শাখায় ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে অনিয়মের অর্থের পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়বে ধারণা করা হচ্ছে। গত জুলাই মাসে ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল
পর্যন্ত খেলাপি ঋণের তদন্ত করে এ ধরনের প্রমাণ পেয়েছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক কার্যালয়ের অধীনে ছয়টি শাখায় চার ধরনের গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সরকার ব্যাংকটির মালিক। ফলে জনগণের করের অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাথমিক এ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ছোট ঋণ হলেও বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। এটিকে কোনোভাবেই গুরুত্বহীন ধরা ঠিক নয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রমাণ করে কর্মকর্তা পর্যায়ে দুর্নীতি বেড়েছে।
জানতে চাইলে আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের বোর্ড সচিব এবং অডিট ও পরিদর্শন বিভাগের প্রধান আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, ব্যাংক ঋণে কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে অন্য কোনো অনিয়ম থাকলেও ভুয়া নামে ঋণ দেওয়ার সুযোগ কম। কারণ, আনসার সদস্য ছাড়া এই ব্যাংক থেকে কেউ ঋণ নিতে পারে না। তবে অনেকে পেশাগত কারণে ঠিকানা পরিবর্তন করে থাকে। এ জন্য খুঁজে না পাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হবে।
আনসারের ১৬ হাজার সদস্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক। এর অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির ১৮টি আঞ্চলিক কার্যালয়সহ ২১৯টি শাখা রয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে ক্ষুদ্রঋণসহ ২৮ ধরনের ঋণ দিচ্ছে। এর মধ্যে কৃষিতে ৪১০ কোটি টাকা, আমানতের বিপরীতে ৬৭ কোটি টাকা এবং ব্যক্তিগত ঋণ দেওয়া হয়েছে ২৩ কোটি টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়েশা, আছমা, রাবেয়া, নাসরিন, বেদেনা, রুমিয়া, উরুনা, ছবেদা, ছাবরিন, ছমেলা, হোসনা, আসমা, মুনিরা, মাবিলা, আঞ্জুয়ারা, মোরশেদা, ফুলেছা, রোকেয়া, ঝরনা, মমতা, হালেমা, সাফিয়া, রহিমা, বিলকিস, জোসনা, পারুল, নাছিমা, শেফালী, রুমা, সাজেদা, রহিমা, জবেদাসহ এমন চার শতাধিক গ্রাহকের নামে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে ঋণ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেককে সর্বনিম্ন চার হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে।
এসব গ্রাহকের নথি পর্যালোচনা করে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর বলছে, একই ব্যক্তির নামে একাধিকবার ঋণ মঞ্জুর এবং বিতরণ করা হয়েছে। অনেক গ্রাহকের ক্ষেত্রে নাম ও সঠিক ঠিকানা পাওয়া যায়নি। দু’একটি গ্রাহকের নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া গেলেও ঋণ গ্রহণ করার বিষয়টি স্বীকার করেনি। এসব ঋণের টাকা আদায়কল্পে শাখা কর্তৃপক্ষের নিবিড় তদারকির অভাব রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তপন কুমার সাহা বলেন, বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের হিসেবে যে পরিমাণ অস্তিত্বহীন ঋণের কথা বলা হচ্ছে তা অনেকাংশে সত্য নয়। আনসার সদস্য না হলে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন করে ঋণ নিতে স্মার্টকার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে দু’একটি ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ব্যাংকের নিবিড় তদারকির কারণে নন পারফর্মিং লোন অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। এ কারণে মাত্র চার শতাংশ খেলাপি ঋণ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ পার হলেও এখনও হালনাগাদ কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্যিক তদন্তে আরও কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের শ্রীবরদী শাখায় ১০ লাখ টাকা, ঈশ্বরগঞ্জে ১৬ লাখ টাকা, কেন্দুয়ায় ১০ লাখ টাকা, ফুলবাড়িয়ায় ১৫ লাখ, মুক্তাগাছায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এছাড়া ভালুকা শাখায়ও অনিয়ম ধরা পড়েছে। কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়েছেন। পরে এসব গ্রাহকের কোনো প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়নি। সূত্র: সমকাল

Leave a Reply