দোহাজারীর “আঁধারে আলো” সংগঠন ৯৭০ ব্যাগ রক্তদান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে

মোঃ কামরুল ইসলাম মোস্তফা, চন্দনাইশ: সাহসী যাত্রার সারথী দোহাজারী’র স্বেচ্ছা রক্তদানকারী সেবা সংগঠন “আঁধারে আলো”র সদস্যরা বিনিময় ছাড়া স্বেচ্ছায় রক্তদান করে মানব সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে সংকটাপন্ন মানুষকে সহযোগিতা করার মহৎ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে “মুমূর্ষু জীবন-বিপন্ন মানবতা, চারদিক অন্ধকারে কালো, রক্ত দিয়ে আনবো সে প্রাণ, জ্বলবে- আঁধারে আলো” এই শ্লোগানে ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ৩ তরুণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৩৪ জন স্বেচ্ছাসেবী অদম্য তরুণকে নিয় গঠিত হওয়া “আঁধারে আলো”র বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১২০ জন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনটির সদস্যদের তারুণ্যদীপ্ত উদ্যম, একাগ্রতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ক্রমান্বয়ে সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।img_20161103_115221
শুরুটা অনেক দুঃসাধ্য হলেও ধীরলয়ে এগিয়ে চলছে অনাগত আগামীর গন্তব্যে। স্রোতের বিপরীতে চলমান অস্থিরতার রাহুগ্রাস যাঁদের ছুঁতে পারেনি ক্ষনিকের জন্যও সেসব সৃষ্টিশীল মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যুবশক্তির সম্মিলনীতে দোহাজারীর গন্ডি পেরিয়ে আজ চন্দনাইশ তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের অনেকের কাছেই দুর্দিনের বাতিঘর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে “আঁধারে আলো” নামক অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি।
অসহায় মানুষদের রক্তের প্রয়োজনে ডাক পাওয়া মাত্রই আর্তমানবতার আহবানে সাড়া দিয়ে “আঁধারে আলো”র রক্তদাতা সদস্যরা নিজ খরচে ছুটে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চন্দনাইশ বি.জি.সি ট্রাষ্ট, সাতকানিয়া উপজেলা কমপ্লেক্স, কেরানীহাট, আমিরাবাদ, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ এতদ্বঞ্চলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারী হাসপাতালে।
রক্তের প্রয়োজনে ফোনে ডাক পড়লে নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জরুরী কাজ ফেলে মুমূর্ষু প্রাণ বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিজের শরীরের মূল্যবান তাজা রক্ত অসহায় মুমূর্ষু রোগীদের দান করার মধ্যেই মানব জনমের পরম সার্থকতা খুঁজে ফেরেন “আঁধারে আলো”র সদস্যরা।
নিজের আত্মীয় কিংবা অনাত্মীয়, জাতি, ধর্ম, বর্ণ এটি বিবেচ্য বিষয় নয়, মানুষ হিসেবে মনুষ্যত্ববোধ উপলদ্ধি করে রক্তদানের মাধ্যমে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন “আঁধারে আলো”র সদস্যরা। নিজের শরীরের তাজা রক্ত অন্যের শিরায় বইছে, বিষয়টি ভেবেই তারা রোমাঞ্চিত এমনটাই জানালেন সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি মোঃ ইলিয়াছ হোসাইন।
তিনি বলেন, ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারী থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নয়শত সত্তর (৯৭০) ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করেছেন তারা। রক্ত গ্রহীতাদের মধ্যে অধিকাংশই সন্তান প্রসবকালীন প্রসূতি মা। তাছাড়া ব্লাড ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, থ্যালাসেমিয়া, রক্তশূন্যতাসহ বিভিন্ন অপারেশন রোগীদেরকে রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচানোর তরতাজা স্মৃতি সাহস যোগায় এগিয়ে যাবার, প্রেরণা হয়ে থাকে নতুনদের আহবানে। অনেকটা মানসিক দৃঢ়তাই লক্ষ্য পৌঁছাতে অন্তরালের প্রাণে সঞ্চার করছে জীবনী শক্তি। হয়তো এটাই না থামার মন্ত্র, এটাই বাঁচার উৎস। তাই শত বাঁধা বিপত্তি, সংগঠনের তহবিল সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও নিজ খরচে রোগীর নিকট পৌঁছে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি খন্দকার এস. এ মাহিন বলেন, “সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সরকারী/ বেসরকারী চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী ও শিক্ষক যেমন রয়েছে, তেমনি রিকসা চালক, রাজমিস্ত্রির মতো কঠোর পরিশ্রম করা সদস্যও রয়েছেন। রক্তের প্রয়োজনে ডাক পড়লেই যারা ছুটে যাচ্ছেন কাঙ্খিত গন্তব্যে।
সংগঠনটির সাবেক সভাপতি নেজাম উদ্দীন খোকা বলেন, দরিদ্র মানুষ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনতে যেখানে হিমশিম খান সেখানে রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলে ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া বিকল্প কোন পথ থাকে না। তাছাড়া একজন গর্ভবতী যখন সন্তান প্রসব করেন, তখন অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হলে রক্তের অভাবে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। রক্তের অভাবে যাতে অকালে কেউ মারা না যায় সে জন্য আমরা তিন বন্ধু উদ্যোগ নিয়ে অন্যান্য বন্ধুদের সমন্বয়ে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট রক্তদানকারী সংগঠনটি গড়ে তুলি। হাঁটি হাঁটি পা-পা করেই এই অবধি আসা। অনেক শুভাকাংখী, বন্ধু, পরিচিতজন সাহস যুগিয়েছে, কখনো কখনো সারথীও হয়েছে, সেটাই আমাদের মূলধন।
“আঁধারে আলো’র” সাবেক সভাপতি মোঃ ইয়াছিন আরাফাত বলেন, “রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয় এমন ধারণার কারণে প্রথম দিকে অনেকেই রক্ত দিতে অস্বীকৃতি জানাতো কিন্তু প্রথমবার রক্তদানের পর তাদের ভুল ভেঙ্গে যায় এবং তাদের দেখাদেখি অনেকেই রক্তদানে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সংগঠনটির অর্থ সম্পাদক শাহ্ আলম রুবেল জানান, তিনি সদস্য হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতবার রক্তদান করেছেন। তিনি ছাড়া সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে জিয়া আহমেদ, মুহিম বাদশা, ফরহাদুল ইসলাম, আবুল কালাম, সোহেল, আনছার, আক্কাস রহমান, জাকের হোসেন, আব্দু সালাম, ইব্রাহিম ইরান, ফেকাফুল ইসলাম মিশুক, সাজ্জাদ হোসেন রকি, অভি দাশ, আব্দুল হাফেজ, আতিকুর রহমান জিকু, সায়মন রহমান, সাদ্দাম হোসেন, নুরুল ইসলাম মিস্ত্রি সহ বেশিরভাগ সদস্যই ৫ বারের অধিক রক্তদান করেছেন।

চন্দনাইশ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও “আঁধারে আলো’র” অন্যতম উপদেষ্টা জাফর আলী হিরু বলেন, “আঁধারে আলো’র” মত রক্তদানকারী অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। রক্তপাত ঘটানোর চেয়ে রক্তদানের মূল্য অনেক বেশি। এটা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে উপলদ্ধি করেছি।
সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা ইউ.পি সদস্য এস. এম জামাল উদ্দীন, আলহাজ্ব মোঃ লোকমান হাকিম, ইঞ্জিনিয়ার জসীম উদ্দীন জনি ও আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুল গফুর রব্বানী প্রায় একই সুরে বলেন, “কোন ব্যক্তি যখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন কিংবা মুমূর্ষু স্বজনকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজনে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করেন, তখন মানুষ হিসেবে মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসা উচিৎ। “আঁধারে আলো’র” সাথে যুক্ত থাকতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করছেন তারা।
দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে “আঁধারে আলো’র” মত এক বা একাধিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করে দোহাজারী ইউ.পি চেয়ারম্যান আবদুল্লা আল নোমান বেগ বলেন, আঁধারে আলো সংগঠনের ১২০ জন তরুণের মানবিক এই মহৎ কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়, তাদের একাগ্রতা ও উদ্যোমের কাছে হার মেনেছে নানা বাঁধা ও প্রতিকূলতা। তাদের কারনেই দোহাজারী ইউনিয়নের প্রসূতি মায়েরা রক্তের প্রয়োজনে দুশ্চিন্তামুক্ত ও নির্ভয় থাকে।
নিজেদের তথ্য সমৃদ্ধ সফটওয়্যার, ওয়েব সাইট কিংবা ডাটাবেছ তৈরী করা গেলে রক্তদাতাদের পূর্ণ ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার, গ্রুপ ভিত্তিক তালিকা এবং কখন কোথায় ও একজন রক্তদাতা শেষবার কবে রক্ত দিয়েছেন তা খুব সহজেই সংরক্ষণ করা যাবে বলে মত দিয়েছেন “আঁধারে আলো” সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকে। তারা নিজেদের ওয়েবসাইট ও পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেছ তৈরীর কথা ভাবছেন বলেও এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

Leave a Reply