৩ দিনব্যাপী বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল সম্পন্ন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার: ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’র জিকির, নফল ইবাদত, শেষ রাতের তাহাজ্জুদ, সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলা ইজতিমায়ী জিকির, ওযু-গোসল-নামাযের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ, নামাযের জন্য সূরা মশক, মুসলমানদের জন্য জরুরি মসআলার শিক্ষা, পীর সাহেব চরমোনাইয়ের ৬টি, নায়েবে আমীরের ২টিসহ দেশের বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজ-নসীহত এবং সুধী, শ্রমিক ও ছাত্রসমাবেশসহ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রান্ড ময়দানে বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি চট্টগ্রাম জেলা আয়োজিত চরমোনাইয়ের নমুনায় তিন দিনব্যাপী বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল ও হালকায়ে জিকির।
মাহফিলের শেষদিনের বয়ানে হযরত মাওলানা মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) ভক্ত-মুরীদদের উদ্দেশ্যে বিশেষ নসীহতে বলেছেন, ‘ইসলাম পরিপূর্ণ, জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের আলোকে গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবকিছুকে আল্লাহর প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। মানুষের হক, ধন-সম্পদ আত্মসাৎ, সরকারি কর্মচারি হলে দুর্নীতি, চাকরির দায়িত্বে অবহেলা, ফাঁকিবাজি এবং ব্যবসায় ও বেচাবিক্রিতে ভেজার, ওজনে কম দেওয়া থেকে সতর্ক করে দিয়ে পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, আল্লাহর হক কান্নাকাটি আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দ্বারা মাফ পাওয়া যাবে, কিন্তু বান্দার হকে কোনো ক্ষমা নেই।
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, ‘প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে মনুষত্ব শেখাচ্ছে না। শিক্ষার দিক থেকে আমরা কতটা অধঃপতনে পৌঁছে গেছি তা শিক্ষামন্ত্রীর কথা থেকে প্রমাণিত। শিক্ষামন্ত্রী সহনশীল পর্যায়ে ঘুষ খেতে বলেছেন, কিন্তু ইসলামি শিক্ষা বলে ঘুষ মোটেও খাওয়া যাবে না, এটা পরিষ্কার হারাম। পীর সাহেব চরমোনাই মিয়ানমারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বার্মার নেত্রী অং সং সুচি ও মিয়ানমারের জেনারেলরা সকলেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। ওদের ধর্ম বৌদ্ধ, বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা হচ্ছে অহিংসা পরম ধর্ম। ধর্মের এই বাণী মিয়ানমারের জেনারেলরা ভুলে গিয়েছে, আধুনিক শিক্ষিত হয়ে, অস্ত্র-শস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার করেই আজকে রোহিঙ্গা মা-বোন, নারী-শিশুদেরকে আগুনে পুড়িয়ে ধর্ষন করে মানবাতিহাসের জঘন্যতম নজির সৃষ্টি করছে।’ ইসলামকে শান্তি-অহিংসার প্রকৃত ধর্ম উল্লেখ করে পীর সাহেব বলেন, ‘বাংলাদেশ ৯২ পার্সেন্ট মুসলমানের দেশ। মিয়ানমারের মুসলিম হত্যার প্রতিক্রিয়া যদি এ দেশের মুসলমান দেখাতো তা হলে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বই থাকতো না। কিন্তু ইসলাম সেই শিক্ষা দেয় না, আর আমরা ইসলামের এ মহান শিক্ষা ভুলিনি। এদেশের বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টান সকল মানুষের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রতিটি মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব।
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, রাজনীতিতে কেউ নিয়ে এসেছেন নৌকা, কেউ নিয়ে এসেছেন ধানের শীষ। ৪৫ বছরে যারা ক্ষমতায় গিয়েছেন তাদের অধিকাংশই দুর্নীত, সন্ত্রাসীদের লালন, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করেছেন। পীর সাহেব বলেন, ভোট শুধু একটি সিল মারার নাম নয়। ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের চুরি-দুর্নীতিরও সমর্থন করা হয়। কাল কিয়ামতের ময়দানে এই ভোটেরও হিসেব হবে উল্লেখ করে পীর সাহে বলেন, আজীবন নামায-রোজা ও আট-দশবার হজ করেও শেষবিচারের দিনে শুধুমাত্র দুর্নীতিবাজদেরকে সমর্থনের কারণে চুরি-ডাকাতির আসামী হিসেবে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
মাহফিলে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান কারী শায়খুল কুররা আল্লামা কারী আবদুর রউফ, বয়ান পেশ করেন হযরত আল্লামা নুরুল হুদা ফয়েজী, পীর সাহেব কারিমপুর, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সহকারী পরিচালক আল্লামা আবু তাহের নদভী, অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ, পীর সাহেব খুলনা, মুফতী হাবিবুর রহমান কাসেমী, প্রখ্যাত আলেমে দীন ও যুক্তিবাদী বক্তা আল্লামা আজীজুল হক আল-মাদানী, ড. বেলাল নুর আজীজ, ড. জসিম উদ্দীন নদভী, হযরত মাওলানা মুফতী সৈয়দ ইসহাক মুহাম্মদআবুল খায়র, নওমুসলিম মাওলানা সিরাজুল ইসলাম এবং উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মুফতী দেলাওয়ার হোসাইন সাকী, মাওলানা নুরুল আলম নাছিরী, মাওলানা সরওয়ার কামাল, মাওলানা মুশতাক আহমদ প্রমুখ।
এ দিকে আজ (রোববার) বাদ ফজর ইজতিমায়ী জিকির ও পীর সাহেব চরমোনাইয়ের সর্বশেষ বয়ানের পর মাহফিলের আখেরি মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় মুনাজাত পরিচালনা করেন হযরত পীর সাহেব হুজুর চরমোনাই। আখেরি মুনাজাত উপলক্ষ্যে মাহফিলে অবস্থানরত মুসল্লী ছাড়াও ভোর থেকে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার তওহীদী জনতার ঢল নামে। মুনাজাতে পীর সাহেব চরমোনাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিপীড়িত মুসলিম বিশেষত রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে সাহায্য কামানা করেন এবং দেশ, জাতি ও উম্মাহকে এক ও নেক হয়ে সমৃদ্ধ হতে দোয়া করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*