৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরের পর সর্বনিম্ন পানি পেয়েছে বাংলাদেশ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৫ মে: ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রথম বাংলাদেশ সর্বনিম্ন পানি পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধ পেরিয়ে এতো কম পানি আর কখনই বাংলাদেশের ভাগ্যে জোটেনি। এমনকি গঙ্গা চুক্তি যখন ছিল না; সেই সময়টাতে পানি নিয়ে এমন দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে।f
দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২১ থেকে ৩১ মার্চ ওই ১০ দিনে ভারত বাংলাদেশকে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি দিয়েছে। যা ছিল স্মরণকালের সর্বনিম্ন পানির রেকর্ড।
এদিকে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কেন এতো কম পানি পেল, এ নিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কিম্বা যৌথ নদী কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। ভারতের কাছে আপত্তি তোলা হয়নি- কেন বাংলাদেশকে এই শুষ্ক মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে কম পানি দেয়া হলো। যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) তথ্যানুযায়ী, ইতোপূর্বে ২০০৮ সালে ১১ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ওই ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন পানি পাওয়ার রেকর্ড ছিল ১৭ হাজার ৫১৯ কিউসেক। চলতি শুষ্ক মৌসুমে চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ মাত্র ৪ বার ৩৫ হাজার কিউসেক করে গঙ্গার পানি পেয়েছে। এছাড়া ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনওয়ারি হিসাবে প্রতিটিতে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
জেআরসি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত) প্রতি ১০ দিনওয়ারি হিসাবে ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পানি পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি পেয়েছে ৩১ হাজার ৩৯৪ কিউসেক, ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি ৩১ হাজার ১৪ কিউসেক। ১ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২৯ হাজার ৭৩৩ কিউসেক, ১১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২৮ হাজার ৮২০ কিউসেক, ২১ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পেয়েছে ২৬ হাজার ৮৬৫ কিউসেক পানি। মার্চের প্রথম ১০ দিনে অর্থাৎ ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত পেয়েছে ২৫ হাজার ৪১৯ কিউসেক, ১১ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ২১ থেকে ৩১ মার্চ এই ১০ দিনে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি। যা স্মরণকালে সর্বনিম্ন রেকর্ড। ১ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পানি পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক, ১১ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পেয়েছে ১৮ হাজার ২৮২ কিউসেক এবং ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেআরসি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এই চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই শুষ্ক মৌসুমে যেহারে গঙ্গার পানি বাংলাদেশ পেয়েছে, তা গঙ্গা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে জেআরসি’র সাবেক সদস্য মীর সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ভারতে এবার প্রচণ্ড খরা। এই পরিস্থিতিতে ফারাক্কা পয়েন্টে খুবই কম পানি জমা হয়েছে। যতটুকু পানি এসেছে সেটাই চুক্তি মোতাবেক ভাগ করে নিয়েছে উভয় দেশ। এদিকে, ফারাক্কা দিয়ে পানি না আসায় পদ্মা অববাহিকার সকল নদী মরা গাঙে পরিণত হয়েছে। বর্ষা দ্বারপ্রান্তে এসে গেলেও নদীতে সেভাবে পানি বাড়েনি। এখনো পদ্মা অববাহিকার নদীগুলোর যেদিকে চোখ যায় শুধু বালু আর বালু। পানি নিয়ে গত আট বছরের মধ্যে এমন দুর্যোগ আর কখনো দেখা দেয়নি। এই মরুময়তার জন্য পানি বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা বাঁধের ভয়াবহ প্রভাবকেই দায়ী করছেন।
আর যৌথ নদী কমিশন বাংলাদেশ (জেআরসি) জানায়, ১৯৯৬ সালে দু’দেশের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে সর্বনিম্ন পানি পাচ্ছে। যা চুক্তিপত্রের লঙ্ঘন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভারতকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তবে তারা বলছেন, ফারাক্কা পয়েন্টে পানি কম পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি শুরু হলে পানি বাড়বে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ও পানি বিশেষজ্ঞ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির ধারায় বলা আছে, ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেলে উভয় দেশ মিলে পানির প্রবাহ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ভারত এ বিষয়টিকে সব সময়ই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচিত এ বিষয়গুলো জোরালোভাবে ভারতের কাছে উপস্থাপন করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*