২ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক জলাভূমি দিবস

মো. আবুল হাসান/ খন রঞ্জন রায় : বিশ্বের নবীনতম শৃঙ্গমালা হিমালয়ের চূড়া হলো বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীর পানির উৎস। পর্বতের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীল এবং নদী-Charedikপ্রবাহের উৎসমুখের অতি উচ্চতার কারণে হিমালয় থেকে প্রবাহিত নদীসমূহ কেবল অতি দ্রুততার সঙ্গে পানি প্রবাহই নিশ্চিত করে না, সেই সঙ্গে ভেসে আসে প্রচুর পলিমাটি। যুগ যুগ ধরে এই পানিবাহিত পলি একটি ব-দ্বীপ গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। এই ব-দ্বীপই বর্তমান বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ কথাটি সামগ্রিক অর্থেই সত্য। বাংলাদেশের মানচিত্র নদীর কল্যাণেই সৃষ্টি। ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলা ভূখণ্ডের মাটি ও মানুষের সঙ্গে নদ-নদী ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের সভ্যতার jala-0ক্রমবিকাশ, যোগাযোগÑঅর্থনীতির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও মূল ভিত্তি হচ্ছে নদী নির্ভরতা। সাহিত্য, গান, নাটক, চলচ্চিত্রে নানাভাবে উঠে এসেছে নদীর প্রসঙ্গ। আজকের এই বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত শত-সহস্র বাঙালির কণ্ঠে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ‘পদ্মাÑমেঘনাÑযমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ এই স্লোগান। গৌতম ঘোষের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র চলচ্চিত্রায়নটি দেখে বাংলা সম্পর্কে আবেগাপ্লুত হতে হয়। নদী-নদীই সাংস্কৃতিক বাংলার বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের অংশ নদ-নদী বাদ দিয়ে সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের মনের ছবি এখানকার কবিরা চিরদিনই নদ-নদীকে অবলম্বন করে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছড়ায়, 00000গানে, কিংবদন্তিতে, কাব্যে, মহাকাব্যে, বাংলাদেশের রূপ নানাভাবে নদ-নদীর ছবি দিয়ে আঁকা। এখানকার সাধারণ মানুষের মনের জাগরণই রবীন্দ্রনাথের কাব্যনুভূতির প্রকাশ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে’ ফুটে উঠেছে। কবি জসিমুদ্দিনের ‘পদ্মা’ মায়াময়ী। প্রাচীন কাব্যে মনসার ভাসান অথবা চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যযাত্রা নদীপথের ছবি তুলে ধরে বাঙালির মনে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্ম নদীর মাঝি’, সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’, অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত’ নদীর জল, মাটি, পাড়, প্রবাহের সঙ্গে চারপাশের জীবন জীবিকা, সংগ্রামকে সংযুক্ত করেছে সফল সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে। ঐতিহ্য আর গৌরবের নদী ও নদীপথ আজ বিপন্ন। গত কয়েকবছর যাবৎ কিছু পরিবেশবাদী সংগঠনের উদ্যোগে নদী সংক্রান্ত দিবসগুলো পালিত হয় মাত্র। তরুণদের সংগঠন jala-1‘‘রিভারাইন পিপলস’ এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন নদী বিষয়ক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, প্রকাশনা, পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচারণা চালাচ্ছে। নদীনির্ভরশীলতা, নদী গুরুত্ব, নদী ঐতিহ্যে বিবেচনা করেÑ ভারতের জাতীয় নদী ‘গঙ্গা’। পাকিস্তানও সিন্ধু নদীকে ‘কওমি দরিয়া’ বা জাতীয় নদী ঘোষণা এবং প্রতিবছর ২৪ জানুয়ারি সিন্ধু দিবস পালন করে। বাংলাদেশের জীব-বৈচিত্র্য জাতীয় নির্ভর। গাছ পাখি ফুলফল অনেক কিছুই-দিবসকেন্দ্রীক। বাদ পড়েছে প্রকৃতি প্রদত্ত নদী। নদী এখনো জাতীয় হয়নি। বিশ্বের অন্যতম নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এদেশে নদীর সংখ্যা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান সহজে পাওয়া যায় না। তবে এদেশের ওপর দিয়ে সাতশ’র অধিক নদ-নদী, শাখা নদী ও উপনদী প্রবাহমান রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অনতিবিলম্বে সার্বজনীন jala-2সিদ্ধান্তে একটি নদীকে জাতীয় ঘোষণা করা নৈতিক দায়িত্ব। মানব সভ্যতার অগ্রগতি ভূমিকায় নদী খাল বিল ডোবার উজ্জ্বল উপস্থিতি অনস্বীকার্য। মিশরীয়, এসেরীয় বা সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে বিশেষ বিশেষ নদীর øেহচ্ছায়ায়। সম্পদশালী নগর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে করেছে উর্বর নদীমাতৃকার কোলে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম নগর বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সিন্ধুনদের অববাহিকায় এবং রাজস্থান ও গুজরাটের কয়েকটি অঞ্চলে। পূর্বে মেঘনা নদী, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, উত্তরে এগারো সিন্ধুর, দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা ও মধ্যখানে নরসিংদীর ওয়ারী বটেশ্বর নিয়ে এই অঞ্চলের নদীবলয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর প্রবল ভাঙনে প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে মানচিত্র। করালগ্রাসী ভাঙনের মুখে নদ-নদীতে চলে যাচ্ছে বতসভিটা, আবাদি জমিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা। অনেক কারণের মধ্যে jala-3অন্যতম কারণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, তীরবর্তী এলাকায় বর্জ্য পরিশোধনাগার ছাড়াই বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য অবলীলায় ফেলা হচ্ছে। এ ভাবেই অদূরদর্শী শিল্পায়ন ধ্বংস ডেকে আনছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নদী-নদীকে। একটি সমীক্ষায় জানা গেছে যে কলকারখানা ও অন্যান্য শিল্প থেকে প্রতি বছরে প্রায় ৩০-৫০ কোটি টন ভারী ধাতু, তরল বর্জ্য, বিষাক্ত ছাই এবং অন্যান্য উপজাত পদার্থ পরিবেশকে দূষিত করে। যে সব শিল্পে জৈব পদার্থ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেখানে সবচেয়ে অধিক পরিমাণে দূষণ ঘটে। বিশেষ করে খাদ্য সংক্রান্ত শিল্পগুলি। এই সব শিল্প উন্নত দেশগুলিতে শতকরা ৪০ ভাগ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ৫৪ শতাংশ দূষণ ঘটায়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীতে রেল, সড়ক, বিমানপথ প্রভৃতির দিকে বিশেষ ঝোঁক পড়ায় আমাদের দেশে নদীর নাব্যপথ চরমভাবে অবহেলিত হয়েছে। ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা। বাঁশ দিয়ে পানি মেপে ভয়াল মেঘনা পাড়ি দিতে হচ্ছে ছোট-বড় সব নৌযানকে। বাংলার সুয়েজখাল বলে পরিচিত খাশিয়াখালী চ্যানেলের নাব্যতা সংকটে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলা ছাড়াও খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরের সাথে সারা দেশের সরাসরি নৌযোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। গাবখান চ্যানেলেরও একই পরিণতি। এ দুটি চ্যানেলের মাধ্যমেই মংলা, খুলনা ও নওয়াপাড়া বন্দরসমূহের সাথে সারা দেশের নৌযোগাযোগ পরিচালিত হয়। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। নদী দেশের প্রাণশক্তি। বিশুদ্ধ রক্ত ও শিরা উপশিরায় বাধাহীন রক্ত প্রবাহ ছাড়া যেমন আমরা সুস্থ দেহ কল্পনা করতে পারিনা তেমনি বিশুদ্ধ পানি ও প্রতিবন্ধকতাহীন নদীর প্রবাহ ছাড়া বাস উপযোগী দেশ কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশের সব নদীই ভারত, নেপাল, মায়ানমার ও চীনের সাথে মিশে আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদীর প্রায় সবগুলোতেই উজানে পানি প্রত্যাহার এবং পানির অসম বন্টনের কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশ ভয়াবহভাবে পানি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির কবলে পড়ছে। পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার নদ-নদীগুলোতে অসংখ্য চর জেগেছে। নৌ চলাচল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। নৌপথের ব্যবস্থাপনার জন্য দেশে গত ৩০-৪০ বছরে তিন চারটি মহাপরিকল্পনা প্রণীত হলেও কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি। অনিয়ম ও দুর্নীতির গহ্বরে ঢুকে গেছে সব বড় বড় মহাপরিকল্পনা । নদ-নদীর নাব্যতা সংকট নিরসনে ড্রেজিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সংকট নিরসনের বদলে একের পর এক নৌপথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ৯০ দশকে ফ্রান্স ও জার্মানির কারিগরি সহায়তায় সরকার প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুলকান্দি রিভেটম্যান্ট টেষ্ট স্ট্রাকচারটি নির্মাণ করে। গত ৫ বছরে যমুনার বাম তীরের ভাঙন রোধে ৪১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছরমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করে। তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় গত দুই বছরে যমুনার ভয়াবহ ভাঙনে কুলকান্দি রিভেটম্যান্ট টেস্ট স্ট্রাকচারটির দুই-তৃতীয়াংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। ফসলি জমি যমুনার ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছরমেয়াদি তীর সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে প্রকল্পটি বর্ধিত করে ৪১৭ কোটিতে উন্নিত করা হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছর প্রকল্পের শুরুতে দেওয়ানগঞ্জের ফুটানি বাজার, ইসলামপুরের শসারিয়া বাড়ি, কুলকান্দির আটিয়ামারী এবং চিনাডুলির কদমতলী বাজার এলাকায় বালির বস্তা ডাম্পিং শুরু হয়। কিন্তু প্রকৃত কাজ কিছু হয়নি। এদিকে ভারতের টিম্বলো গ্র“পের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় সরকারের সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে মংলা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার্থে এবং মংলা বন্দর বাঁচিয়ে রাখতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রতিষ্ঠিত টিম্বলো গ্র“পের নির্বাহী পরিচালক গ্রীভেস প্রমোদ টিম্বলোর ও মবকের চেয়ারম্যানের মধ্যে ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিছু দিনের মধ্যে এ কাজ শুরু করার কথা। বিদেশীদের নির্ভরশীল হয়ে যেমন বাংলার নদী বাঁচানো সম্ভব নয়, তেমনি দেশীয় প্রযুক্তি ও জনসম্পৃকতার মাধ্যমে নদী রক্ষায় আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রয়োজন। নানান প্রতিকূলতা ও সমস্যা মোকাবিলা করেই মানবজীবন এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে নদী সমস্যার সমাধান করতেই হবে। নদ-নদীর প্রশস্ততাকে মুখ্য বিবেচনা না করে বরং নৌযান চলাচলের চ্যানেলগুলো যথাযথভাবে ড্রেজিং-এর মাধ্যমে প্রবাহমান রাখা গেলে দুকোটি মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদীর জল বা মাটির নিয়ন্ত্রণ বা পরিচর্যা করতে হলে জলপ্রবাহের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা চারিত্রিক গুণাবলীতে নিখঁত চিন্তা, গবেষণাধর্মী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। অথচ নদ-নদী খাল-বিল সম্পর্কীত অধ্যয়নের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। নদী বিজ্ঞানের লেজার, আল্ট্রাসনিক, আইসোটোপ ইত্যাদির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ মানদণ্ড নির্ণয় যন্ত্রপাতি কারখানা এদেশে তৈরি সম্ভব হয়নি। নদীশাসন, গতিপ্রকৃতি ও পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সংশ্লিষ্ট পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কর্মীবাহিনী সৃষ্টি করতে হবে। ইনস্টিটিউট অব রিভার টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি সন্নিবেশনের মাধ্যমে ঐতিহ্যের নদীপথের হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Leave a Reply

%d bloggers like this: