২০ সংখ্যালঘু পরিবারকে ভারতে চলে যাওয়ার হুমকি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১ ফেব্র“য়ারী: পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার শাঁখারিকাঠী গ্রামের ২০টি হিন্দু পরিবারকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে ভারত চলে যেতে বলেছেন নাজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নাজিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোশারেফ হোসেন খানের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়রা।
শুধু হুমকি নয়, ইতিমধ্যে ওই সব হিন্দু পরিবারের বাড়ি ঘরের পাশের ফাঁকাস্থানে কয়েকটি ঘর তুলে প্রায় ৭ একর জমি দখল করেছেন তারা।d
প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাংবাদিকদের কাছে দেয়া লিখিত আবেদনে এমনটিই দাবি করেছেন ভুক্তভোগী সংখ্যালঘু পরিবারগুলো।
তাদের দাবি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন খানের প্রভাবে এবং সহায়তায়ই তারা এ কাজ করছেন।
জানা গেছে, শাঁখারিকাঠী গ্রামের নাজিরপুর-দীর্ঘা সড়কের শাঁখারিকাঠী বাজারের পূর্ব পাশে প্রায় ৭ একর জমির উপরে পৈতৃক সূত্রে মালিক হয়ে বাড়ি-ঘর করে যুগ যুগ ধরে বসবাস করছেন সুকুমার মণ্ডল, গৌরাঙ্গ সুতার, দেবলাল মণ্ডল, সুশীল মণ্ডল, নিরঞ্জন মণ্ডল, সুখরঞ্জন মণ্ডল, শংকর ঢালী, নিত্যানন্দ হালদার, স্বপন ঢালী, সমীর ঢালী, দিপংকর ঢালী, মহানন্দ মৃধা, কালিপদ মৃধা, বিমল বড়াল ও ঠাকুর দাস মিস্ত্রীসহ ২০টি সংখ্যালঘু পরিবার।
একবছর আগে থেকে এসব বাড়িঘর ও স্থাপনার পূর্ব পাশে কালিগঙ্গা নদীর জেগে ওঠা চর ভূমিহীন পরিচয়ে দখল করে ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পৈতৃক রেকর্ডীয় সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারা শুরু করে নাজিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান মোশারেফ হোসেন খানের শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় মোখলেস মল্লিক, মজিবর মল্লিক, নুরুল ইসলাম মল্লিক, হারুন মল্লিক, ছালাম মল্লিক, লৎফর হাওলাদার, জিল্লুর মল্লিক সহ অনেকে।
সরকার দলের নেতার আত্মীয় হওয়ায় এসব দখলকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে নিরুপায় হয়ে তারা গত বছরের ২১ ডিসেম্বর তাদের ভিটেমাটি রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। এ সময়ের মধ্যে এসব পরিবারের সদস্যদের ওপরে নানা ধরনের অত্যাচার নিপীড়ন করে আসছে ভূমি দখলকারীরা। সম্প্রতি নাজিরপুর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া প্রায় ৭ একর সম্পত্তি হারাহারি মতে নিজ নিজ নামে মিউটেশন (নামজারি) করে জমির পর্চা করিয়ে নেয়।
এ ঘটনার পরে গত ২৭ জানুয়ারি বেলা ১১টায় নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তবিবর রহমান দখলকারীদের নিয়ে ভুক্তভোগী সংখ্যালঘুদের বাড়িতে উপস্থিত হন। এ সময় ভূমি দখলকারীরা ওই ২০টি হিন্দু পরিবারকে আগামী এক মাসের মধ্যে বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিতে বলা হয়। নিজেদের ভোগদখলীয় এবং পৈতৃক রেকর্ডীয় সম্পত্তি কেন ছাড়বো এবং বাড়ি-ঘর ছেড়ে কোথায় যাবো ভুক্তভোগীদের এমন প্রশ্নে নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতেই দখলকারীরা সম্পত্তির দখল ছেড়ে ভারত চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময়ের মধ্যে সম্পত্তি দখল না ছাড়লে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ারও হুমকি দেয় তারা।
তাদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় এমপি একেএমএ আউয়ালের কাছে পরিবারগুলো লিখিত অভিযোগ দিলেও রহস্যজনকভাবে তা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের বসতঘরের পাশ দিয়ে মাটি কেটে নতুন করে ছোট ছোট ঘর তুলে দখল করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা, এমপির কাছ থেকে প্রতিকার না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন। ভুক্তভোগী সুখরঞ্জন মণ্ডল বলেন ‘যুগ যুগ ধরে আমরা পৈতৃক এ সম্পত্তিতে বসবাস করে আসছি। জামায়াত-বিএনপির আমলে আমাদের ভিটেমাটি দখল করতে সাহস পায়নি কেউ, অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমাদের ভিটে মাটি ছাড়তে হচ্ছে।’
অভিযুক্ত মোখলেস মল্লিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা ভূমিহীন হিসেবে সরকারের কাছে বন্দোবস্ত নিয়ে সে জমিতে ঘরবাড়ি করছি।
এ বিষয়ে কথা হলে আওয়ামী লীগ নেতা মোশারেফ হোসেন খান বলেন, ‘কালীগঙ্গা নদীতে যাদের জমি ভেঙে গেছে তারাই ভূমিহীন হিসেবে নদী তীরের খাস জমি বন্দোবস্ত পেয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে হিন্দুদের কোনো ভয়ভীতি দেখানো বা ভারতে চলে যেতে বলার এবং দখলকারীদের সহায়তা করার অভিযোগ সঠিক নয়। তাছাড়া হিন্দুদের অনেক জমি নদীতে ভেঙ্গে গেছে।’
শাঁখারিকাঠী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান গাউস ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, হিন্দুরা যুগ যুগ ধরে ওই সম্পত্তি ভোগ দখল করছে। তাদের সম্পত্তি শাঁখারিকাঠী মৌজায়। আর ভূমহীন হিসেবে যারা দাবি করে হিন্দুদের জমি দখল করছে তাদের খাস জমি ডুমরিয়া মৌজায়। শুনেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন খান হিন্দুদের সম্পত্তি দখলকারীদের সহায়তা করছে।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তবিবুর রহমান বলেন, ‘হিন্দু মুসলিম বিরোধ যেন না হয় সেটা ঠেকাতে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং উভয় পক্ষকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা বলেছি।’ তার উপস্থিতিতে হিন্দুদের ভারত চলে যেতে বলা হয়নি বলেও দাবি করেন নির্বাহী অফিসার মো. তবিবুর রহমান। সূত্র: শীর্ষ নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*