২০১৪ সালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : ২০১৪ সালে অন্তত ৮০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষে বেশির ভাগ সময়ে ক্ষমতাসীন 4দলের অঙ্গ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগই জড়িত ছিল। তাছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় হলগুলোতে কর্মচারি ও শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে বলে মনে করছে দেশের বিশেষজ্ঞ মহল। এ কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের মধ্যে সহিংসতা বেড়েছে। ছাত্রদের নিজের মত করে রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্তি করাতে এ ধরনের সহিংসতা বছর জুড়ে দেশবাসিকে অবাক করেছে। বর্তমান সরকারের শাসনামলে নিজেদের মধ্যেই আধিপত্য বিস্তার  নিয়ে সংঘর্ষে মেতে উঠতে দেখা যায়। এ দৃশ্য এ বছরের জন্য নতুন নয়। এ চিত্র দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে গত দুই তিন যুগ ধরে। রাজনৈতিক সহিংসতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিনষ্ট করে শিক্ষা জীবনকে বাধার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চলতি বছর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে অনেক শিক্ষার্থী, আহত হয়েছে কয়েক’শ। 1ক্যাম্পাসে এ সহিংসতা ছাত্রদের শিক্ষা কার্যক্রম বিঘিœত করেছে। ফলে প্রতি বছরের মত এবারো সেশন জটে পড়ে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে গেছে। সাধারণ ছাত্রদের পড়াশোনা শেষ করতে আরো অতিরিক্ত সময় দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ঘোষণার প্রতিশ্র“তি দেয়া হলে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ হবে বলে মনে করেন দেশের বিশেষজ্ঞ মহল। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অসংখ্য সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এ সব সহিংসতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সহিংসতা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে যারা হতে পারত দেশের পরবর্তী কান্ডারী। তাছাড়া ডজন খানেক ছাত্র আহত হয়েছে ক্যাম্পাসের এ সহিংসতার কারণে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এ সহিংসতা ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, 3কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতার চিত্র দেখা যায় সমান তালে। ১ম বর্ষের দুইজন ছাত্রকে নিজেদের সাথে রাখতে গত ১১ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ছাত্রলীগের  দুই গ্র“পের সংঘর্ষে অন্তত ৮ জন আহত হয়। ঢাবিতে এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার চিত্র দেখা যায় ২০১৪ সালে। শুধু ঢাবিতে অন্তত ৬টি সংঘর্ষ সংগঠিত হয়েছে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। গত ১৩ ফেব্র“য়ারি আরিফুর রহমান নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী অপহৃত হয়। এজন্যে সূর্যসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মী তারিকুল ইসলামকে দায়ী করা হয়। এ ছাড়া ২৮ ফেব্র“য়ারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম অপহৃত হন। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২২ নভেম্বর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হলে ছাত্রলীগের দুই গ্র“পের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজন আহত হয়। 2গত ২২ আগষ্ট বিকেলের মধ্যে একই হলে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়। র‌্যাগ ডে পালন উপলক্ষ্যে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১২ মে অন্তত ৩ জন আহত হয় দুগ্র“পের সংঘর্ষে। দোকানের বকেয়া পাওনা দেয়াকে কেন্দ্র করে ৩ মার্চ আরকেটি সংঘর্ষ বাধে ক্ষমতাসীন দলের দুই গ্র“পের মধ্যে অন্তত ২৫ জন আহত হয়। ৬ এপ্রিল জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করে। এ ধরনের সংঘর্ষের জন্য জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি প্রায় ৪ মাস বন্ধ রাখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে ২১ নভেম্বর সিলেট শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দুই গ্র“পের বন্ধুক যুদ্ধে সুমন চন্দ্র দাশ নামে এক ছাত্র নিহত হয়। এ ঘটনার জন্য প্রশাসন অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পিছিয়ে ছিল না চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগ কর্মীরা। গত তিন বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা দেশবাসিকে ভাবিয়ে তুলেছিল। গত ১৩ জানুয়ারি শিবির ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে ১ জন মারা যায় তাছাড়া আরো ২৫ জন গুরুতর আহত হয়। গত ১৪ আগষ্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ শাখা ও ছাত্রশিবির সমর্থকরা আন্দোলনে থাকার ফলে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক সব কাজ বন্ধ রাখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। University১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস পালন উপলক্ষ্যে তাপস সরকার নামে দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র নিহত হয় ছাত্রলীগের দুগ্র“পের সংঘর্ষে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়য়ে গত ২ ফ্রেব্র“য়ারি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দু’গ্র“পের সংঘর্ষে ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। এ ছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ এপ্রিল রুস্তুম আলী আকন্দ নামে এক ছাত্র যিনি একই সঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, তিনি নিজের কক্ষে নিহত হন। গত ২৪ আগষ্ট কুষ্টিয়া ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আক্রমণে ছাত্রশিবিরের ২০ জন কর্মী আহত হয়। শিবির কর্মীরা গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে মিছিল করার সময় শিবিবের উপর এ আক্রমণ চালানো হয়েছিল। গত ১৪ জুলাই যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রলীগের এক কর্মী  নিহতের জন্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০-১২ ছাত্রলীগ কর্মী ফিশারিজ বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র শাদ ইবনে মমতাজকে খুন করে। ৪ জুন সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের তৌহিদ ইসলাম নামে ছাত্রলীগের একজন কর্মী বিদ্রোহীদের আঘাতে মৃত্যু বরণ করেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিংসতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এ্যমিরেটস ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় ক্যাম্পাসে ছাত্র সহিংসতা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কর্মীদের সংঘর্ষে জড়িয়ে দিচ্ছে। কর্মীরা কোন আদর্শের জন্য সংঘর্ষ করছে না বরং নিজের স্বার্থের জন্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগসাজসেই কর্মীরা এ ধরনের সংঘর্ষে নিজের যুক্ত করছে বলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন। ক্যাম্পাসের সহিংসতা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপরে। ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্বাচন না হওয়ার কারণেই এ ধরনের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে বলে তিনি মনে করছেন। তাছাড়া ক্যাম্পাসে কোন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম না থাকার কারণেও এ ধরনের সংঘর্ষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: