১২ মে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস

মো. আবুল হাসান সভাপতি ও খন রঞ্জন রায় মহাসচিব, ৬ মে ২০১৭, শনিবার: ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত মানবতার সেবায় নিয়োজিত যে মহৎ পেশাদার ব্যক্তি তিনি ‘নার্স’। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে চিকিৎসকের পাশাপাশি কোমল পরশ বুলিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তুলে নার্স। মহান ও আদর্শ পেশার দাবীও একমাত্র তাদেরই। ডাক্তাররা রোগের ভিত্তিতে প্রেসক্রিপশন করে। নার্স প্রেসক্রিপশনের নির্দেশ মোতাবেক অক্লান্ত পরিশ্রম ও শুশ্রƒষার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলে। হাসপাতালে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে যাদের অপলক দৃষ্টি কামনা করে রোগী, তিনিই নার্স। পৃথিবীর যেসব দেশের প্রতিটি নাগরিক জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নার্সদের সেবা পেয়ে থাকে, সেইসব দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী বোর্ড দেশের উপজেলায় পর্যন্ত নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।
বাংলাদেশে নার্সিং কাউন্সিলের উপর ডিপ্লোমা নার্সিং প্রশিক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত। নার্সিং কাউন্সিল গত ৪৬ বছরে দেশের চাহিদার পর্যাপ্ত সংখ্যক ও গুণগত মানের নার্স প্রশিক্ষণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নার্সিং কাউন্সিল সরকারিভাগে ৪১ টি ও বেসরকারিভাবে ৮টি নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে মাত্র। এখন আবার এর সাথে বিভ্রান্তকরভাবে যোগ করেছে মিডওয়াইফারি নার্স। কাকে মিডওয়াইফ বলে আর কাকে নার্স বলে  সে নিয়ে রয়েছে গণমানুষের ব্যাপক কৌতুহল।
এই ৪৯টি ইনস্টিটিউটে প্রতি বছর ২২১০ জন ছাত্রÑছাত্রী ভর্তির সুযোগ পায়। নার্সিং এ ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত জনবলের অভাবে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে  প্রশিক্ষণবিহীন মেয়েদের দিয়ে নার্সিং এর কাজ করানো হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে পত্রিকায় প্রতিদিন শিরোনাম হচ্ছে। প্রসবকালীন জটিলতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, এর কারণ প্রশিক্ষিত দক্ষ ও নার্স- এর অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স প্রয়োজন। সে হিসাবেও আমাদের দেশে নার্সের প্রয়োজন ১,৬৮,০০০ জন। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল পরিচালিত নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করা হয়। এদেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকমানের দেড় হাজার চিকিৎসক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছে। যাদের নিয়ে দেশ ও জাতি গর্ব বোধ করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিকমানের ডিপ্লোমা নার্সের অভাব রয়েছে। বেসরকারীভাবে পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্সিং স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সহযোগিতা করলে দ্রুত দেশে নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতা থাকার কারণে গুণগত মানসম্পন্ন নার্স তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্য দূরপ্রাচ্যসহ বহু দেশে দক্ষ নার্সের অভাব এবং চাহিদা রয়েছে। বিদেশে নার্স নিয়োগের জন্য প্রতিবছর রিক্রুটিং টিম বাংলাদেশে আসে। উচ্চমানসম্পন্ন ডিপ্লোমা নার্সের অভাবে লোভনীয় এই চাকুরীগুলো পূরণ করে ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও মিসর। বাংলাদেশ বঞ্চিত হয় জনশক্তি রফতানি আয় থেকে। ঢাকায় আমেরিকান সুপার স্পেশিয়ালিটি হাসপাতালের উদ্যোগে নার্সিং দক্ষতা নিয়ে একটি গোল টেবিল  আলোচনা করা হয়েছিল। তাতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ নার্স তৈরির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। দেশে চিকিৎসা পেশার মান উন্নত করতে হলে নার্সিং ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা আবশ্যক।
দেশের প্রতিটি গ্রামে ২ জন করে প্রশিক্ষিত নার্স প্রেরণ এবং হাসপাতাল-ক্লিনিকসমূহে আনুপাতিকহারে নার্স প্রদানে প্রয়োজনে প্রায় ৫ লক্ষ নার্স। বর্তমানে চালু ৪৯টি ইনস্টিটিউট থেকে এর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার নীতি আরো সহজতর করে উপজেলা পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি ঘটানো। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা।
বর্তমানে চলমান নার্সিং ও অতিসম্প্রতি মিডওয়াইফ নামধারী কাউন্সিলের মাধ্যমে এর সমাধা সম্ভব নয়। তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এর জন্য প্রতিটি প্রশাসনিক বিভাগে পৃথক ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে নার্সিং শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃত ব্যবস্থাই এই দিবস পালনের যথার্থ স্বার্থকতা বহন করবে। লেখক: ডিপ্লে¬ামা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*