স্থবির হয়ে পড়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: ২৮ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাল্টাপাল্টি আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম। এতে দীর্ঘায়িত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। কিন্তু সমস্যা সমাধানে নির্বিকার প্রশাসন।
ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, এক শিক্ষকের বাসায় হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা, গত বছরের ১ আগস্ট ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত খালিদ সাইফুল্লাহ হত্যার বিচার, শিক্ষক লাঞ্ছনায় অভিযুক্ত এম এম শরীফুল করীমকে সব পদ থেকে অব্যাহতিসহ ছয় দফা দাবিতে ১৯ জানুয়ারি ক্লাস বর্জন ও ২২ জানুয়ারি রবিবার থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আসছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
এদিকে রবিবার থেকে শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে নামেন ক্লাস-পরীক্ষা চালু, শিক্ষকের বাসায় হামলার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ ১১ দফা দাবিতে। প্রথম দুই দিন মানববন্ধন ও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয়ার মতো কর্মসূচিতে আন্দোলন সীমিত থাকলেও পরের দিন থেকে তা কঠোর হতে থাকে। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান ফটকে এবং বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে উপাচার্যসহ শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার মধ্যে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত জানানোর আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা তালা খুলে দেন।
তবে বৃহস্পতিবার শিক্ষক সমিতি বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না পেয়ে বিকেল পাঁচটার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ও সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, গত ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে নাজির ভিলার দ্বিতীয় তলায় তারিক হোসেনের বাসায় দরজা ভেঙে বেশ কজন মুখোশধারী লোক ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলার ঘটনা টের পেয়ে পাশের ফ্ল্যাট থেকে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আশিখা আক্তার ও তার শ্বশুর ছুটে এলে দুবৃর্ত্তরা আশিখা আক্তারের শ্বশুরকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। দুর্বৃত্তরা ওই শিক্ষকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায়।
হামলার ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তারিক হোসেন জানান, ‘কেন বা কারা আমার বাসায় হামলা করল তা আমি জানি না। ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা নেই।’
হামলার ঘটনায় কোনো মামলা করেননি ওই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমি কোন মামলা করব না। আমার বাসায় হামলার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জেনেছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, মামলা না হলে এ ব্যাপারে তারা কিছু করতে পারবেন না। তবে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
শিক্ষকদের আন্দোলনের বেড়াজালে পড়ে প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা ১১ দফা দাবির প্রসঙ্গ আনলেও সপ্তাহান্তে তারা শুধু ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতেই সোচ্চার ছিলেন। লাগাতার এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ২৪টি চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে বলে জানান উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী। এতে করে শিক্ষার্থীরা তীব্র সেশনজটের আশঙ্কায় আছেন।
আন্দোলনরত একাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী জানান, তারাও চান শিক্ষকের বাসায় হামলার ঘটনার বিচার হোক। কিন্তু শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ অন্য কোনো দাবি-দাওয়ার জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। শিক্ষকদের আন্দোলনের ফাঁদে পড়ে শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই সংকট নিরসন করতে পারে। শিক্ষকের বাসায় হামলার ঘটনায় প্রশাসন মামলা করুক এবং আমাদের অন্য দাবিগুলো মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলেই আমরা ক্লাসে ফিরে যাব।’
তবে শিক্ষক সমিতির নেতারা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন বলে অভিযোগ উপাচার্য অধ্যাপক মো. আলী আশরাফের। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক সমিতি শিক্ষক লাঞ্চনার বিচার চাইতে এসে আমার সামনে আঙুল তুলে টেবিল চাপড়িয়ে যেভাবে বিচার চেয়েছে, সেটা কতটুকু যৌক্তিক? আমি এর বিচার কার কাছে চাইব?’
এর পরও বিষয়টি নিয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি করে দিয়েছেন দাবি করে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষকের বাসায় হামলার বিষয়ে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। শিক্ষক সমিতির বাকি দাবিগুলো আগামী সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হবে বলে তাদের আশ্বস্ত করে আহ্বান জানিয়েছি ক্লাসে ফিরে যেতে।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: